ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সত্যজিৎ রায়ের পৈত্রিক বাড়িতে বসছে ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলা



সত্যজিৎ রায়ের পৈত্রিক বাড়িতে বসছে ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলা
ছবি : কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে সত্যজিৎ রায়ের পৈত্রিক বাড়িতে শুরু হচ্ছে ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলা

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর মসূয়া গ্রামে আবারও শুরু হচ্ছে প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলা। বাংলা সংস্কৃতি, ইতিহাস ও লোকজ ঐতিহ্যের অন্যতম এই মেলাকে ঘিরে ইতোমধ্যেই পুরো এলাকায় তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। প্রতিবছরের ধারাবাহিকতায় এবারও বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি নির্মাতা ও অস্কারজয়ী বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের পৈত্রিক বাড়ির মাঠে বসছে এই ঐতিহ্যের আসর।

উপজেলার মসূয়া ইউনিয়নের মসূয়া গ্রামে অবস্থিত রায় বাড়ির খোলা মাঠ ও পুকুর ঘাট এলাকাজুড়ে বুধবার (১৩ মে) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে তিনদিনব্যাপী বৈশাখী মেলা। তবে স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিক সময়সীমা তিনদিন হলেও মেলার আমেজ ও কার্যক্রম প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলে।

মঙ্গলবার সকাল থেকেই মেলা প্রাঙ্গণে মানুষের আনাগোনা বেড়ে গেছে। দূরদূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যেই দোকানপাট বসাতে শুরু করেছেন। কেউ দোকান সাজিয়ে পসরা নিয়ে বসেছেন, আবার কেউ শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, মেলার নির্ধারিত মাঠজুড়ে সারি সারি দোকান বসেছে। জায়গা সংকুলান না হওয়ায় অনেক ব্যবসায়ীকে আশপাশের জমিতেও দোকান বসাতে দেখা গেছে। মেলায় মাটির পুতুল, হাড়ি-পাতিল, খেলনা, তৈজসপত্র, কসমেটিকস, কাঠের তৈরি বিভিন্ন সামগ্রীসহ নানা ধরনের স্টল বসেছে। শিশু-কিশোরদের বিনোদনের জন্য নাগরদোলা, চরকি ও বিভিন্ন খেলনার আয়োজন এবার তুলনামূলক বেশি।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এবারের মেলা সর্বোচ্চ ৬ লাখ ৮৫ হাজার টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। গত বছর যার পরিমাণ ছিল ৭১ হাজার ৭০০ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রাজস্ব আয় প্রায় ৯ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে আগত দর্শনার্থীদের জন্য প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে একটি আধুনিক রেস্টহাউজ ব্যবহারের সুযোগও রাখা হয়েছে।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, জমিদার হরি কিশোর রায় চৌধুরীর সময় থেকে এই বৈশাখী মেলার প্রচলন শুরু হয়। শ্রী শ্রী কাল ভৈরবী পূজাকে কেন্দ্র করে এ মেলার সূচনা হয়েছিল। পরবর্তীতে এটি কিশোরগঞ্জ অঞ্চলের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী লোকজ মেলায় পরিণত হয়।

এই রায় বাড়িতেই ১৮৬০ সালে জন্মগ্রহণ করেন প্রখ্যাত শিশু সাহিত্যিক উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী এবং ১৮৮৭ সালে জন্ম নেন তার পুত্র, বিখ্যাত ছড়াকার সুকুমার রায়। দেশ বিভাগের আগে উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী সপরিবারে কলকাতায় চলে গেলে বাড়িটি উত্তরাধিকারশূন্য হয়ে পড়ে। বর্তমানে এটি সরকারের রাজস্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।

সম্প্রতি বাড়ির ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি স্থাপনা ও পুকুর ঘাট সংস্কার করা হয়েছে, ফলে ঐতিহাসিক এ স্থাপনার সৌন্দর্য অনেকটাই বেড়েছে। স্থানীয়দের আশা, সংস্কারের ফলে এবার মেলা আরও বেশি জাঁকজমকপূর্ণ হবে এবং দর্শনার্থীদের উপস্থিতিও বাড়বে।

মেলা আয়োজক কমিটির সদস্য ও স্থানীয় বিএনপি নেতা বিল্লাল বলেন, “এবারের মেলাকে আরও আকর্ষণীয় ও জমজমাট করতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। এটি জেলার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী মেলা হওয়ায় একটি কমিটির মাধ্যমে সুষ্ঠুভাবে আয়োজন পরিচালনা করা হচ্ছে।”

কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা আফরোজ মারলিজ বলেন, “মেলার সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য ইজারাদারকে একটি কমিটির মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সার্বিক সহযোগিতা করবে এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।”

ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও বিনোদনের এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হওয়া কটিয়াদীর এই বৈশাখী মেলা এখন শুধু একটি উৎসব নয়, বরং জেলার ইতিহাস ও লোকজ সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় বহন করছে।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


সত্যজিৎ রায়ের পৈত্রিক বাড়িতে বসছে ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলা

প্রকাশের তারিখ : ১২ মে ২০২৬

featured Image

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর মসূয়া গ্রামে আবারও শুরু হচ্ছে প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী মেলা। বাংলা সংস্কৃতি, ইতিহাস ও লোকজ ঐতিহ্যের অন্যতম এই মেলাকে ঘিরে ইতোমধ্যেই পুরো এলাকায় তৈরি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ। প্রতিবছরের ধারাবাহিকতায় এবারও বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি নির্মাতা ও অস্কারজয়ী বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের পৈত্রিক বাড়ির মাঠে বসছে এই ঐতিহ্যের আসর।

উপজেলার মসূয়া ইউনিয়নের মসূয়া গ্রামে অবস্থিত রায় বাড়ির খোলা মাঠ ও পুকুর ঘাট এলাকাজুড়ে বুধবার (১৩ মে) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে তিনদিনব্যাপী বৈশাখী মেলা। তবে স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিক সময়সীমা তিনদিন হলেও মেলার আমেজ ও কার্যক্রম প্রায় এক সপ্তাহ ধরে চলে।

মঙ্গলবার সকাল থেকেই মেলা প্রাঙ্গণে মানুষের আনাগোনা বেড়ে গেছে। দূরদূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যেই দোকানপাট বসাতে শুরু করেছেন। কেউ দোকান সাজিয়ে পসরা নিয়ে বসেছেন, আবার কেউ শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, মেলার নির্ধারিত মাঠজুড়ে সারি সারি দোকান বসেছে। জায়গা সংকুলান না হওয়ায় অনেক ব্যবসায়ীকে আশপাশের জমিতেও দোকান বসাতে দেখা গেছে। মেলায় মাটির পুতুল, হাড়ি-পাতিল, খেলনা, তৈজসপত্র, কসমেটিকস, কাঠের তৈরি বিভিন্ন সামগ্রীসহ নানা ধরনের স্টল বসেছে। শিশু-কিশোরদের বিনোদনের জন্য নাগরদোলা, চরকি ও বিভিন্ন খেলনার আয়োজন এবার তুলনামূলক বেশি।

উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, এবারের মেলা সর্বোচ্চ ৬ লাখ ৮৫ হাজার টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। গত বছর যার পরিমাণ ছিল ৭১ হাজার ৭০০ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে রাজস্ব আয় প্রায় ৯ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। দূর-দূরান্ত থেকে আগত দর্শনার্থীদের জন্য প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে একটি আধুনিক রেস্টহাউজ ব্যবহারের সুযোগও রাখা হয়েছে।

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, জমিদার হরি কিশোর রায় চৌধুরীর সময় থেকে এই বৈশাখী মেলার প্রচলন শুরু হয়। শ্রী শ্রী কাল ভৈরবী পূজাকে কেন্দ্র করে এ মেলার সূচনা হয়েছিল। পরবর্তীতে এটি কিশোরগঞ্জ অঞ্চলের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী লোকজ মেলায় পরিণত হয়।

এই রায় বাড়িতেই ১৮৬০ সালে জন্মগ্রহণ করেন প্রখ্যাত শিশু সাহিত্যিক উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী এবং ১৮৮৭ সালে জন্ম নেন তার পুত্র, বিখ্যাত ছড়াকার সুকুমার রায়। দেশ বিভাগের আগে উপেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী সপরিবারে কলকাতায় চলে গেলে বাড়িটি উত্তরাধিকারশূন্য হয়ে পড়ে। বর্তমানে এটি সরকারের রাজস্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।

সম্প্রতি বাড়ির ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি স্থাপনা ও পুকুর ঘাট সংস্কার করা হয়েছে, ফলে ঐতিহাসিক এ স্থাপনার সৌন্দর্য অনেকটাই বেড়েছে। স্থানীয়দের আশা, সংস্কারের ফলে এবার মেলা আরও বেশি জাঁকজমকপূর্ণ হবে এবং দর্শনার্থীদের উপস্থিতিও বাড়বে।

মেলা আয়োজক কমিটির সদস্য ও স্থানীয় বিএনপি নেতা বিল্লাল বলেন, “এবারের মেলাকে আরও আকর্ষণীয় ও জমজমাট করতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। এটি জেলার অন্যতম ঐতিহ্যবাহী মেলা হওয়ায় একটি কমিটির মাধ্যমে সুষ্ঠুভাবে আয়োজন পরিচালনা করা হচ্ছে।”

কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা আফরোজ মারলিজ বলেন, “মেলার সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার জন্য ইজারাদারকে একটি কমিটির মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সার্বিক সহযোগিতা করবে এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।”

ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও বিনোদনের এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হওয়া কটিয়াদীর এই বৈশাখী মেলা এখন শুধু একটি উৎসব নয়, বরং জেলার ইতিহাস ও লোকজ সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় বহন করছে।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ