ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

অসহনীয় যানজটে স্থবির ঢাকা


জাতীয় ডেস্ক
জাতীয় ডেস্ক
প্রকাশ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬

অসহনীয় যানজটে স্থবির ঢাকা

ঢাকা শহর এখন কার্যত একটি স্থবির নগরীতে পরিণত হয়েছে, যেখানে যানজট মানুষের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক গতিকে সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত করছে। ৪০০ বছরের পুরনো এই রাজধানীতে জনসংখ্যা ও যানবাহনের চাপ এতটাই বেড়েছে যে, অনেক ক্ষেত্রে গাড়ির গতি মানুষের হাঁটার গতির চেয়েও কমে গেছে।

রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে প্রতিদিন হাজারো মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকছেন যানজটে। নগরবাসীর অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, ৫ থেকে ৬ মিনিটের দূরত্ব অতিক্রম করতে এখন ২ থেকে ৩ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লেগে যাচ্ছে। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে বাস বা ব্যক্তিগত যানবাহনের পরিবর্তে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।

ট্রাফিক পুলিশের তথ্যমতে, ঢাকায় বর্তমানে সড়কের ধারণক্ষমতার তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বেশি যানবাহন চলাচল করছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি নেই। বরং মূল সমস্যা হচ্ছে সীমিত সড়ক অবকাঠামো ও অতিরিক্ত চাপ।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেড় দশক আগে ঢাকার যানবাহনের গড় গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২১ কিলোমিটার, যা এখন নেমে এসেছে ৫ কিলোমিটারের নিচে। অর্থাৎ, শহরের বহু এলাকায় গাড়ির গতি মানুষের স্বাভাবিক হাঁটার গতিরও নিচে নেমে গেছে।

বছরের পর বছর ধরে ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং বিআরটি প্রকল্পসহ নানা অবকাঠামো উন্নয়ন হলেও যানজট পরিস্থিতির কোনো কার্যকর উন্নতি হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব প্রকল্পে দেড় লক্ষ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধুমাত্র অবকাঠামো নির্মাণ দিয়ে এই সংকট সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত নীতিমালা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং শক্তিশালী ব্যবস্থাপনা কাঠামো। একই সঙ্গে পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা জরুরি।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকার ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে বিকেন্দ্রীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে কর্মসংস্থান ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে না পারলে রাজধানীর জনসংখ্যা ও যানবাহনের চাপ কমানো সম্ভব নয়।

ঢাকার যানজটের কারণে প্রতিদিন বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা যায়, কর্মঘণ্টা, জ্বালানি, পরিবেশ ও দুর্ঘটনা মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১৫২ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়, যা বছরে ৫৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বর্তমানে এই ক্ষতির পরিমাণ ৭০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ঢাকার নদী ও খাল পুনরুদ্ধার করে নৌপথ সম্প্রসারণ করা গেলে সড়কের চাপ অন্তত ৩০ শতাংশ কমানো সম্ভব। পাশাপাশি কমিউটার ট্রেন চালু এবং ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সরকারের পক্ষ থেকে ফুটপাত দখলমুক্ত করা ও অবৈধ যানবাহন নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে এর কার্যকারিতা সীমিত বলে অভিযোগ রয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ঢাকার যানজট শুধু একটি পরিবহন সমস্যা নয়, বরং এটি অর্থনীতি, পরিবেশ ও জনজীবনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে। নগরবাসীর প্রত্যাশা—দীর্ঘমেয়াদী ও কার্যকর পরিকল্পনার মাধ্যমে এই স্থবির শহরকে আবার সচল করা।

বিষয় : ঢাকা

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


অসহনীয় যানজটে স্থবির ঢাকা

প্রকাশের তারিখ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

ঢাকা শহর এখন কার্যত একটি স্থবির নগরীতে পরিণত হয়েছে, যেখানে যানজট মানুষের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক গতিকে সম্পূর্ণভাবে ব্যাহত করছে। ৪০০ বছরের পুরনো এই রাজধানীতে জনসংখ্যা ও যানবাহনের চাপ এতটাই বেড়েছে যে, অনেক ক্ষেত্রে গাড়ির গতি মানুষের হাঁটার গতির চেয়েও কমে গেছে।

রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোতে প্রতিদিন হাজারো মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকছেন যানজটে। নগরবাসীর অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, ৫ থেকে ৬ মিনিটের দূরত্ব অতিক্রম করতে এখন ২ থেকে ৩ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লেগে যাচ্ছে। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে বাস বা ব্যক্তিগত যানবাহনের পরিবর্তে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন।

ট্রাফিক পুলিশের তথ্যমতে, ঢাকায় বর্তমানে সড়কের ধারণক্ষমতার তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বেশি যানবাহন চলাচল করছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি নেই। বরং মূল সমস্যা হচ্ছে সীমিত সড়ক অবকাঠামো ও অতিরিক্ত চাপ।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেড় দশক আগে ঢাকার যানবাহনের গড় গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২১ কিলোমিটার, যা এখন নেমে এসেছে ৫ কিলোমিটারের নিচে। অর্থাৎ, শহরের বহু এলাকায় গাড়ির গতি মানুষের স্বাভাবিক হাঁটার গতিরও নিচে নেমে গেছে।

বছরের পর বছর ধরে ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং বিআরটি প্রকল্পসহ নানা অবকাঠামো উন্নয়ন হলেও যানজট পরিস্থিতির কোনো কার্যকর উন্নতি হয়নি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব প্রকল্পে দেড় লক্ষ কোটি টাকার বেশি ব্যয় হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধুমাত্র অবকাঠামো নির্মাণ দিয়ে এই সংকট সমাধান সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত নীতিমালা, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং শক্তিশালী ব্যবস্থাপনা কাঠামো। একই সঙ্গে পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা জরুরি।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ঢাকার ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে বিকেন্দ্রীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোতে কর্মসংস্থান ও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে না পারলে রাজধানীর জনসংখ্যা ও যানবাহনের চাপ কমানো সম্ভব নয়।

ঢাকার যানজটের কারণে প্রতিদিন বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে। বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা যায়, কর্মঘণ্টা, জ্বালানি, পরিবেশ ও দুর্ঘটনা মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ১৫২ কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হয়, যা বছরে ৫৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। বর্তমানে এই ক্ষতির পরিমাণ ৭০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, ঢাকার নদী ও খাল পুনরুদ্ধার করে নৌপথ সম্প্রসারণ করা গেলে সড়কের চাপ অন্তত ৩০ শতাংশ কমানো সম্ভব। পাশাপাশি কমিউটার ট্রেন চালু এবং ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সরকারের পক্ষ থেকে ফুটপাত দখলমুক্ত করা ও অবৈধ যানবাহন নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হলেও মাঠপর্যায়ে এর কার্যকারিতা সীমিত বলে অভিযোগ রয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ঢাকার যানজট শুধু একটি পরিবহন সমস্যা নয়, বরং এটি অর্থনীতি, পরিবেশ ও জনজীবনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে। নগরবাসীর প্রত্যাশা—দীর্ঘমেয়াদী ও কার্যকর পরিকল্পনার মাধ্যমে এই স্থবির শহরকে আবার সচল করা।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ