ঢাকা    বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সিলেট বিআরটিএ অফিস যেন এক দুর্নীতি মহোৎসবের: ভুক্তভোগীরা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চাইছেন



সিলেট বিআরটিএ অফিস যেন এক দুর্নীতি মহোৎসবের: ভুক্তভোগীরা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চাইছেন
ছবি : সংগৃহীত

সিলেটের বিআরটিএ অফিসকে ঘিরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও দালালচক্রের এক জটিল বাস্তবতার অভিযোগ উঠে এসেছে, যা এখন সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অফিসটিতে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যেখানে অসাধু কর্মকর্তা ও দালালদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক সেবা পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে মোটরযান পরিদর্শক মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে পরিচালিত এই চক্রের বিরুদ্ধে ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ এগোয় না বলেই দাবি করছেন ভুক্তভোগীরা।

সম্প্রতি দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ দাবি, লার্নার বাতিল এবং লাইসেন্স পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসে। এ বিষয়ে এক ভুক্তভোগী জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে বলা হয়, জকিগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা মো. নুরুল ইসলাম নুরু নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ভাইভা ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় অংশ নেন। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ এই চালক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও তার লার্নারে ‘ড্রাম ট্রাক’ উল্লেখ থাকাকে কেন্দ্র করে কর্মকর্তারা তাকে ওই যানবাহনেই পরীক্ষা দিতে চাপ দেন। পরে তিনি ছোট গাড়ি দিয়ে পরীক্ষা সম্পন্ন করলে ক্ষিপ্ত হয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তার লার্নার কার্ড কেটে বাতিল করে দেন। পরবর্তীতে ঘুষ হিসেবে ১০ হাজার টাকা দাবি করা হলে তিনি তা দিতে অস্বীকৃতি জানান, যার ফলে তার লার্নার স্থায়ীভাবে বাতিল করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

একই দিনে অদক্ষ চালকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে পাস করিয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৩৫০ জন পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে গড়ে তিন হাজার টাকা করে আদায় করা হয়, যা থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ লেনদেন হয়।

অফিসের ভেতরে ও বাইরে দালালচক্রের প্রভাব এতটাই বিস্তৃত যে, সাধারণ মানুষের জন্য সরাসরি সেবা নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। গাড়ির মালিকানা পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কাজেও দালালদের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই পুরো প্রক্রিয়াটি একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারী সরাসরি জড়িত।

আরও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ হলো, এই দুর্নীতির তথ্য যাতে গণমাধ্যমে প্রকাশ না পায়, সে জন্য সাংবাদিকদের একটি তালিকা তৈরি করে ‘কোটা’ পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু সাংবাদিককে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সংখ্যক ‘মার্কার ফাইল’ সুবিধা দেওয়া হয় এবং প্রতি সপ্তাহে তাদের মধ্যে ঘুষের অর্থ বণ্টন করা হয়। এর মাধ্যমে দুর্নীতির খবর চাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সিলেটের জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম দায়িত্ব গ্রহণের পর একাধিকবার অভিযান চালিয়ে অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছেন এবং কিছু শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নিয়েছেন। তবে রহস্যজনক কারণে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। প্রশাসনের উপস্থিতি টের পেলেই দালালরা সরে পড়ে, আবার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই তারা আগের অবস্থায় ফিরে আসে।

দীর্ঘদিন ধরে একই স্থানে কর্মরত কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী এই সিন্ডিকেটের মূল শক্তি হিসেবে কাজ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন হয় এবং তারা পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করেন। অতীতে দুর্নীতি দমন কমিশন অভিযান চালিয়ে নগদ অর্থ, ব্ল্যাঙ্ক চেকসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করলেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।

এছাড়া জানা গেছে, অফিসের বাইরে নির্দিষ্ট কিছু স্থানে নিয়মিত ‘ঘুষের হাট’ বসে, যেখানে নিরাপদে লেনদেন সম্পন্ন করা হয়। এতে করে অফিসের ভেতরে সরাসরি প্রমাণ এড়ানো সম্ভব হয় এবং পুরো প্রক্রিয়াটি আরও গোপনীয়ভাবে পরিচালিত হয়।

সব মিলিয়ে, সিলেট বিআরটিএ অফিসে গড়ে ওঠা এই দুর্নীতির চক্র সাধারণ মানুষের জন্য এক দুঃসহ বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। সেবাগ্রহীতারা প্রতিনিয়ত হয়রানি ও আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন, আর প্রশাসনের বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ সত্ত্বেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান এখনো অধরাই রয়ে গেছে।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬


সিলেট বিআরটিএ অফিস যেন এক দুর্নীতি মহোৎসবের: ভুক্তভোগীরা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চাইছেন

প্রকাশের তারিখ : ০৭ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

সিলেটের বিআরটিএ অফিসকে ঘিরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও দালালচক্রের এক জটিল বাস্তবতার অভিযোগ উঠে এসেছে, যা এখন সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, অফিসটিতে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যেখানে অসাধু কর্মকর্তা ও দালালদের দৌরাত্ম্যে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক সেবা পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে মোটরযান পরিদর্শক মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে পরিচালিত এই চক্রের বিরুদ্ধে ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ এগোয় না বলেই দাবি করছেন ভুক্তভোগীরা।

সম্প্রতি দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ঘুষ দাবি, লার্নার বাতিল এবং লাইসেন্স পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ উঠে আসে। এ বিষয়ে এক ভুক্তভোগী জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগে বলা হয়, জকিগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা মো. নুরুল ইসলাম নুরু নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ভাইভা ও ব্যবহারিক পরীক্ষায় অংশ নেন। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ এই চালক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও তার লার্নারে ‘ড্রাম ট্রাক’ উল্লেখ থাকাকে কেন্দ্র করে কর্মকর্তারা তাকে ওই যানবাহনেই পরীক্ষা দিতে চাপ দেন। পরে তিনি ছোট গাড়ি দিয়ে পরীক্ষা সম্পন্ন করলে ক্ষিপ্ত হয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তার লার্নার কার্ড কেটে বাতিল করে দেন। পরবর্তীতে ঘুষ হিসেবে ১০ হাজার টাকা দাবি করা হলে তিনি তা দিতে অস্বীকৃতি জানান, যার ফলে তার লার্নার স্থায়ীভাবে বাতিল করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

একই দিনে অদক্ষ চালকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে পাস করিয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৩৫০ জন পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে গড়ে তিন হাজার টাকা করে আদায় করা হয়, যা থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ লেনদেন হয়।

অফিসের ভেতরে ও বাইরে দালালচক্রের প্রভাব এতটাই বিস্তৃত যে, সাধারণ মানুষের জন্য সরাসরি সেবা নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। গাড়ির মালিকানা পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কাজেও দালালদের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এই পুরো প্রক্রিয়াটি একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারী সরাসরি জড়িত।

আরও চাঞ্চল্যকর অভিযোগ হলো, এই দুর্নীতির তথ্য যাতে গণমাধ্যমে প্রকাশ না পায়, সে জন্য সাংবাদিকদের একটি তালিকা তৈরি করে ‘কোটা’ পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু সাংবাদিককে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সংখ্যক ‘মার্কার ফাইল’ সুবিধা দেওয়া হয় এবং প্রতি সপ্তাহে তাদের মধ্যে ঘুষের অর্থ বণ্টন করা হয়। এর মাধ্যমে দুর্নীতির খবর চাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সিলেটের জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম দায়িত্ব গ্রহণের পর একাধিকবার অভিযান চালিয়ে অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছেন এবং কিছু শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নিয়েছেন। তবে রহস্যজনক কারণে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। প্রশাসনের উপস্থিতি টের পেলেই দালালরা সরে পড়ে, আবার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই তারা আগের অবস্থায় ফিরে আসে।

দীর্ঘদিন ধরে একই স্থানে কর্মরত কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী এই সিন্ডিকেটের মূল শক্তি হিসেবে কাজ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন হয় এবং তারা পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করেন। অতীতে দুর্নীতি দমন কমিশন অভিযান চালিয়ে নগদ অর্থ, ব্ল্যাঙ্ক চেকসহ বিভিন্ন আলামত উদ্ধার করলেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।

এছাড়া জানা গেছে, অফিসের বাইরে নির্দিষ্ট কিছু স্থানে নিয়মিত ‘ঘুষের হাট’ বসে, যেখানে নিরাপদে লেনদেন সম্পন্ন করা হয়। এতে করে অফিসের ভেতরে সরাসরি প্রমাণ এড়ানো সম্ভব হয় এবং পুরো প্রক্রিয়াটি আরও গোপনীয়ভাবে পরিচালিত হয়।

সব মিলিয়ে, সিলেট বিআরটিএ অফিসে গড়ে ওঠা এই দুর্নীতির চক্র সাধারণ মানুষের জন্য এক দুঃসহ বাস্তবতায় পরিণত হয়েছে। সেবাগ্রহীতারা প্রতিনিয়ত হয়রানি ও আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন, আর প্রশাসনের বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ সত্ত্বেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান এখনো অধরাই রয়ে গেছে।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০২৪১০৯১৭৩০
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: 01711-070054

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ