পৃথিবীর প্রচলিত অর্থব্যবস্থায় দুর্বল ও অক্ষম মানুষের জন্য যে সম্পদের ব্যবস্থা রয়েছে, তা কেবলই বিত্তশালীদের ঐচ্ছিক করুণার উপর নির্ভরশীল। কিন্তু ইসলামই একমাত্র বিধান, যেখানে অক্ষমতার কারণে উৎপাদনে যুক্ত হতে না পারা দরিদ্র মানুষদের হাতে সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ বাধ্যতামূলকভাবে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তার নামই জাকাত। জাকাত ফরজ হওয়ার সাথে সাথে সম্পদশালীরা গরিবদের কাছে ঋণী হয়ে যান এবং সেই ঋণ পরিশোধ না করা পর্যন্ত তারা দায়মুক্ত হন না।
বাংলাদেশের বিত্তশালী মুসলিমরা জাকাত দিয়ে থাকেন ঠিকই, কিন্তু এর সুষ্ঠু প্রাতিষ্ঠানিক ও সরকারি ব্যবস্থাপনার অভাবে জাকাত দারিদ্র্যবিমোচনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। উল্টো জাকাত নিতে আসা ভিড়ে পদদলনে দেশে স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় তিন শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে চতুর্দশ জাকাত ফেয়ার উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বাংলাদেশে সুষ্ঠুভাবে জাকাত আদায় করা গেলে বছরে এক লাখ কোটি টাকা জাকাত সংগ্রহ করা সম্ভব। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে ব্যাংকে জমাকৃত অর্থের হিসাবে কোটিপতির সংখ্যা এখন ১ লাখ ২৮ হাজারেরও বেশি। দৈনিক বণিকবার্তায় প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শীর্ষ ৩০ হাজারের বেশি ধনাঢ্য ব্যক্তির সম্পদ থেকে একাই প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা জাকাত আসতে পারে। বাকি ৯৭ হাজার কোটিপতির কাছ থেকে আসতে পারে আরও ১২ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এগুলো কেবল ব্যাংকে জমাকৃত অর্থের হিসাব। ব্যাংকের বাইরে অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির কাছে থাকা সম্পদ এবং ব্যবসায়িক পণ্যের জাকাত যোগ করলে মোট সংগ্রহ এক লাখ কোটি টাকা অনায়াসে ছাড়িয়ে যাবে।
এই বিশাল পরিমাণ জাকাত সুষ্ঠু পরিকল্পনায় পাঁচ বছরের মধ্যে দেশ থেকে দারিদ্র্য সমূলে উৎপাটন করতে সক্ষম বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ভূমিহীন পরিবারের সংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ, যাতে গড়ে ৪.১৯ জন সদস্য রয়েছেন। বছরে মাত্র ৮০ হাজার কোটি টাকা জাকাত আদায় হলেও প্রথম বছরেই এই ১৬ লাখ পরিবারকে পাঁচ লাখ টাকা করে প্রদান করা যাবে। সেই অর্থ দিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসার মূলধন, পশু পালন, সেলাই মেশিন, ভ্যান বা কৃষি সহায়তার মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরি করে পরিবারগুলোকে দারিদ্র্যসীমার উপরে নিয়ে আসা সম্ভব হবে। দ্বিতীয় বছর থেকে জাকাতের অর্থ ঋণগ্রস্ত কৃষক, মূলধনহীন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং পিছিয়ে পড়া অন্যান্য পরিবারের কাছে পৌঁছানো যাবে। এভাবে চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ৬৪ লাখেরও বেশি পরিবারকে দারিদ্র্যমুক্ত করা সম্ভব হবে এবং ক্রমান্বয়ে জাকাতদাতার সংখ্যা বাড়তে থাকবে, গ্রহীতার সংখ্যা কমতে থাকবে।
এ বিষয়ে আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, যারা পৃথিবীতে ক্ষমতা পেলে নামায কায়েম করবে, জাকাত আদায় করবে এবং মানুষকে সৎকাজের আদেশ দেবে ও অন্যায় থেকে বিরত রাখবে (সুরা হজ: ৪১)। এই আয়াতের আলোকে পরীক্ষিত আমানতদার আলেমদের তত্ত্বাবধানে একটি স্বতন্ত্র ও বিশ্বস্ত সরকারি জাকাত বোর্ড গঠন করা ইসলামী সরকারের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। জাকাত সংগ্রহ ও বিতরণকে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজড করে অনিয়মের সব পথ বন্ধ করতে হবে। প্রতিবছর কতজনকে দারিদ্র্যমুক্ত করা গেল তার স্বচ্ছ প্রতিবেদন জনগণের সামনে তুলে ধরা হলে জাকাতদাতার সংখ্যাও ক্রমাগত বাড়বে। সরকারি জাকাত তহবিলে প্রদত্ত অর্থে কর রেয়াতের বিদ্যমান সুবিধার পাশাপাশি বড় পরিমাণ জাকাতদাতাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি ও পুরস্কার দেওয়ার ব্যবস্থা করলে এই উদ্যোগ আরও গতি পাবে।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ মার্চ ২০২৬
পৃথিবীর প্রচলিত অর্থব্যবস্থায় দুর্বল ও অক্ষম মানুষের জন্য যে সম্পদের ব্যবস্থা রয়েছে, তা কেবলই বিত্তশালীদের ঐচ্ছিক করুণার উপর নির্ভরশীল। কিন্তু ইসলামই একমাত্র বিধান, যেখানে অক্ষমতার কারণে উৎপাদনে যুক্ত হতে না পারা দরিদ্র মানুষদের হাতে সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ বাধ্যতামূলকভাবে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তার নামই জাকাত। জাকাত ফরজ হওয়ার সাথে সাথে সম্পদশালীরা গরিবদের কাছে ঋণী হয়ে যান এবং সেই ঋণ পরিশোধ না করা পর্যন্ত তারা দায়মুক্ত হন না।
বাংলাদেশের বিত্তশালী মুসলিমরা জাকাত দিয়ে থাকেন ঠিকই, কিন্তু এর সুষ্ঠু প্রাতিষ্ঠানিক ও সরকারি ব্যবস্থাপনার অভাবে জাকাত দারিদ্র্যবিমোচনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। উল্টো জাকাত নিতে আসা ভিড়ে পদদলনে দেশে স্বাধীনতার পর থেকে প্রায় তিন শতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।
চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে চতুর্দশ জাকাত ফেয়ার উপলক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বাংলাদেশে সুষ্ঠুভাবে জাকাত আদায় করা গেলে বছরে এক লাখ কোটি টাকা জাকাত সংগ্রহ করা সম্ভব। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে ব্যাংকে জমাকৃত অর্থের হিসাবে কোটিপতির সংখ্যা এখন ১ লাখ ২৮ হাজারেরও বেশি। দৈনিক বণিকবার্তায় প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শীর্ষ ৩০ হাজারের বেশি ধনাঢ্য ব্যক্তির সম্পদ থেকে একাই প্রায় ৩৪ হাজার কোটি টাকা জাকাত আসতে পারে। বাকি ৯৭ হাজার কোটিপতির কাছ থেকে আসতে পারে আরও ১২ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এগুলো কেবল ব্যাংকে জমাকৃত অর্থের হিসাব। ব্যাংকের বাইরে অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির কাছে থাকা সম্পদ এবং ব্যবসায়িক পণ্যের জাকাত যোগ করলে মোট সংগ্রহ এক লাখ কোটি টাকা অনায়াসে ছাড়িয়ে যাবে।
এই বিশাল পরিমাণ জাকাত সুষ্ঠু পরিকল্পনায় পাঁচ বছরের মধ্যে দেশ থেকে দারিদ্র্য সমূলে উৎপাটন করতে সক্ষম বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ভূমিহীন পরিবারের সংখ্যা প্রায় ১৬ লাখ, যাতে গড়ে ৪.১৯ জন সদস্য রয়েছেন। বছরে মাত্র ৮০ হাজার কোটি টাকা জাকাত আদায় হলেও প্রথম বছরেই এই ১৬ লাখ পরিবারকে পাঁচ লাখ টাকা করে প্রদান করা যাবে। সেই অর্থ দিয়ে ক্ষুদ্র ব্যবসার মূলধন, পশু পালন, সেলাই মেশিন, ভ্যান বা কৃষি সহায়তার মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরি করে পরিবারগুলোকে দারিদ্র্যসীমার উপরে নিয়ে আসা সম্ভব হবে। দ্বিতীয় বছর থেকে জাকাতের অর্থ ঋণগ্রস্ত কৃষক, মূলধনহীন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং পিছিয়ে পড়া অন্যান্য পরিবারের কাছে পৌঁছানো যাবে। এভাবে চার থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে ৬৪ লাখেরও বেশি পরিবারকে দারিদ্র্যমুক্ত করা সম্ভব হবে এবং ক্রমান্বয়ে জাকাতদাতার সংখ্যা বাড়তে থাকবে, গ্রহীতার সংখ্যা কমতে থাকবে।
এ বিষয়ে আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, যারা পৃথিবীতে ক্ষমতা পেলে নামায কায়েম করবে, জাকাত আদায় করবে এবং মানুষকে সৎকাজের আদেশ দেবে ও অন্যায় থেকে বিরত রাখবে (সুরা হজ: ৪১)। এই আয়াতের আলোকে পরীক্ষিত আমানতদার আলেমদের তত্ত্বাবধানে একটি স্বতন্ত্র ও বিশ্বস্ত সরকারি জাকাত বোর্ড গঠন করা ইসলামী সরকারের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। জাকাত সংগ্রহ ও বিতরণকে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজড করে অনিয়মের সব পথ বন্ধ করতে হবে। প্রতিবছর কতজনকে দারিদ্র্যমুক্ত করা গেল তার স্বচ্ছ প্রতিবেদন জনগণের সামনে তুলে ধরা হলে জাকাতদাতার সংখ্যাও ক্রমাগত বাড়বে। সরকারি জাকাত তহবিলে প্রদত্ত অর্থে কর রেয়াতের বিদ্যমান সুবিধার পাশাপাশি বড় পরিমাণ জাকাতদাতাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি ও পুরস্কার দেওয়ার ব্যবস্থা করলে এই উদ্যোগ আরও গতি পাবে।

আপনার মতামত লিখুন