মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাতের রেশ ৪ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও আছড়ে পড়তে শুরু করেছে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, এই যুদ্ধের প্রভাব কোনো সাময়িক ঝড় নয়, বরং এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর এক ভয়াবহ ‘ভূমিকম্পের’ মতো আঘাত হানতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, এই সংকটের তীব্রতা ও স্থায়িত্বই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতি কতটা গভীর হবে। তার মতে, মূলত তিনটি প্রধান পথে এই প্রভাব অর্থনীতিকে পর্যুদস্ত করবে: জ্বালানি, ডলার সংকট এবং বাণিজ্য ও রেমিট্যান্স।
১. জ্বালানি সংকট ও তেলের উচ্চমূল্য
যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হুহু করে বাড়ছে। গত বছর প্রতি ব্যারেল তেলের দাম যেখানে ৭২ ডলার ছিল, বর্তমানে তা ১১৯ ডলারে ঠেকেছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ: ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় জ্বালানির ৯৫% আমদানি করে, যার বড় অংশই এই রুট দিয়ে আসে।
রেশনিং ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ: জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকার দেশজুড়ে তেল রেশনিং শুরু করেছে এবং বিদ্যুৎ ব্যবহার কমাতে সব বিশ্ববিদ্যালয় সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
২. আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি
জ্বালানির দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে পরিবহন ও কৃষি সেচের ওপর। ফলে নিত্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসেই খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে চরম সংকটে ফেলেছে।
৩. রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ
বাংলাদেশের প্রায় ৮৬ লাখ প্রবাসী মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত, যার অর্ধেকই সৌদি আরবে।
কর্মসংস্থান ঝুঁকি: যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়তে পারে, যা প্রবাসীদের কর্মসংস্থান ও দেশে পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
রিজার্ভের ওপর চাপ: উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানির কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হবে। এতে ডলারের বিপরীতে টাকার মান আরও কমে যেতে পারে।
৪. বাণিজ্য ও শিল্প উৎপাদন
তৈরি পোশাক খাত: জাহাজ ভাড়া ও বীমা প্রিমিয়াম বেড়ে যাওয়ায় তৈরি পোশাকের উৎপাদন ও রপ্তানি খরচ ৩০-৩৫% বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সার কারখানা বন্ধ: গ্যাস সংকটের কারণে দেশের পাঁচটি সরকারি সার কারখানার মধ্যে চারটিই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এটি ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে।
প্রয়োজনীয় জরুরি পরিকল্পনা
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের একটি ‘কন্টিনজেন্সি প্ল্যান’ বা জরুরি পরিকল্পনা থাকা জরুরি। বিশ্বব্যাংক বা ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের মতো সংস্থাগুলো থেকে দ্রুত বাজেট সহায়তা বা আমদানির জন্য বিশেষ ঋণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, সরকার উদ্ভূত পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের কাজ চলছে।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাতের রেশ ৪ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও আছড়ে পড়তে শুরু করেছে। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, এই যুদ্ধের প্রভাব কোনো সাময়িক ঝড় নয়, বরং এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর এক ভয়াবহ ‘ভূমিকম্পের’ মতো আঘাত হানতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, এই সংকটের তীব্রতা ও স্থায়িত্বই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতি কতটা গভীর হবে। তার মতে, মূলত তিনটি প্রধান পথে এই প্রভাব অর্থনীতিকে পর্যুদস্ত করবে: জ্বালানি, ডলার সংকট এবং বাণিজ্য ও রেমিট্যান্স।
১. জ্বালানি সংকট ও তেলের উচ্চমূল্য
যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম হুহু করে বাড়ছে। গত বছর প্রতি ব্যারেল তেলের দাম যেখানে ৭২ ডলার ছিল, বর্তমানে তা ১১৯ ডলারে ঠেকেছে।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ: ইরান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ায় জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ তার প্রয়োজনীয় জ্বালানির ৯৫% আমদানি করে, যার বড় অংশই এই রুট দিয়ে আসে।
রেশনিং ও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ: জ্বালানি সাশ্রয়ে সরকার দেশজুড়ে তেল রেশনিং শুরু করেছে এবং বিদ্যুৎ ব্যবহার কমাতে সব বিশ্ববিদ্যালয় সাময়িক বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
২. আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি
জ্বালানির দাম বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে পরিবহন ও কৃষি সেচের ওপর। ফলে নিত্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসেই খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে চরম সংকটে ফেলেছে।
৩. রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ
বাংলাদেশের প্রায় ৮৬ লাখ প্রবাসী মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত, যার অর্ধেকই সৌদি আরবে।
কর্মসংস্থান ঝুঁকি: যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়তে পারে, যা প্রবাসীদের কর্মসংস্থান ও দেশে পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
রিজার্ভের ওপর চাপ: উচ্চমূল্যে জ্বালানি আমদানির কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হবে। এতে ডলারের বিপরীতে টাকার মান আরও কমে যেতে পারে।
৪. বাণিজ্য ও শিল্প উৎপাদন
তৈরি পোশাক খাত: জাহাজ ভাড়া ও বীমা প্রিমিয়াম বেড়ে যাওয়ায় তৈরি পোশাকের উৎপাদন ও রপ্তানি খরচ ৩০-৩৫% বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সার কারখানা বন্ধ: গ্যাস সংকটের কারণে দেশের পাঁচটি সরকারি সার কারখানার মধ্যে চারটিই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এটি ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদনে বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে।
প্রয়োজনীয় জরুরি পরিকল্পনা
সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের একটি ‘কন্টিনজেন্সি প্ল্যান’ বা জরুরি পরিকল্পনা থাকা জরুরি। বিশ্বব্যাংক বা ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের মতো সংস্থাগুলো থেকে দ্রুত বাজেট সহায়তা বা আমদানির জন্য বিশেষ ঋণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, সরকার উদ্ভূত পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের কাজ চলছে।

আপনার মতামত লিখুন