বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে ভূ-তাত্ত্বিক অস্থিরতা বৃদ্ধির ফলে চলতি ফেব্রুয়ারি মাসে রেকর্ড ১১ বার কেঁপে উঠেছে দেশ। সর্বশেষ গতকাল শুক্রবার ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, দুপুর ১টা ৫২ মিনিট ২৯ সেকেন্ডে ৫ দশমিক ৪ মাত্রার একটি মাঝারি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। সাতক্ষীরার আশাশুনি এলাকায় উৎপন্ন এই কম্পন রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মাসে এ নিয়ে মোট ১০টি আলাদা ঘটনায় ১১ বার কম্পন অনুভূত হলো।
আবহাওয়াবিদ ফারজানা সুলতানার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গতকালের ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৪, যা মাঝারি শ্রেণির। এর আগে ১ ফেব্রুয়ারি সিলেটে ৩ মাত্রার কম্পন দিয়ে এই মাসের ভূ-তাত্ত্বিক অস্থিরতা শুরু হয়। এরপর ৩ ফেব্রুয়ারি সাতক্ষীরার কলারোয়ায় ৪ দশমিক ১ মাত্রা এবং একই দিনে মিয়ানমারে ৫ দশমিক ৯ ও ৫ দশমিক ২ মাত্রার দুটি কম্পনের প্রভাব বাংলাদেশে পড়ে। ৯, ১০, ১৯ ও ২৫ ফেব্রুয়ারি যথাক্রমে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও মিয়ানমার সীমান্তে আরও বেশ কয়েকটি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়। ২৬ ফেব্রুয়ারি ভারতের সিকিমে হওয়া ৩ দশমিক ৭ মাত্রার কম্পনটিও দেশের উত্তরাঞ্চলে অনুভূত হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত বছরের নভেম্বর মাস থেকেই দেশে ভূমিকম্পের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ২১ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে নরসিংদীর মাধবদীতে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার এক শক্তিশালী ভূমিকম্পে ১০ জন প্রাণ হারান এবং আহত হন অন্তত ছয় শতাধিক মানুষ। এরপর থেকেই ভূতত্ত্ববিদরা বড় ধরনের কোনো দুর্যোগের পূর্বাভাস দিয়ে আসছেন। তাদের মতে, বাংলাদেশ ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় ভৌগোলিকভাবেই দেশটি উচ্চ ভূমিকম্প ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও জলবায়ু সহনশীলতা বিভাগের অধ্যাপক ড. জিল্লুর রহমান এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চল ভৌগোলিকভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকলেও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ঢাকাকে নিয়ে শঙ্কা সবচেয়ে বেশি। তার মতে, রাজধানীর ঘনবসতি এবং দুর্বল ভবন কাঠামো মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পকেও ভয়াবহ মৃত্যুফাঁদে পরিণত করতে পারে। তিনি দেশের অভ্যন্তরে ছোট ছোট অজ্ঞাত ফল্ট লাইনগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে ভবন নির্মাণে কঠোর নজরদারির তাগিদ দেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি (সিডিএমপি) ও জাইকার এক যৌথ জরিপের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকায় যদি ৭ মাত্রার কোনো ভূমিকম্প আঘাত হানে, তবে প্রায় ৭২ হাজার ভবন তাৎক্ষণিকভাবে ধসে পড়তে পারে। এতে ঢাকা শহর অন্তত ৭ কোটি টন কংক্রিটের স্তূপে পরিণত হবে। এছাড়া চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, বন্দর নগরীর প্রায় ৮০ শতাংশ ভবনই কোনো না কোনোভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। রাজউকের পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকার ২১ লাখ ভবনের মধ্যে ৬ লাখ ভবনই বহুতল এবং এগুলোর বড় অংশই ভূমিকম্প সহনশীল নয়।
ভূমিকম্পের ঝুঁকি বিবেচনায় আবহাওয়া অধিদপ্তর সমগ্র দেশকে তিনটি প্রধান জোনে ভাগ করেছে। এর মধ্যে জোন-১ বা উচ্চ ঝুঁকির আওতায় রয়েছে সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের ৯টি জেলা। এছাড়া টাঙ্গাইল, গাজীপুর, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি এই জোনের অন্তর্ভুক্ত। মাঝারি ঝুঁকির জোন-২ এ রয়েছে ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকা। অন্যদিকে খুলনা, যশোর ও বরিশাল অঞ্চলকে তুলনামূলক কম ঝুঁকির বা জোন-৩ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ভূ-তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশের চারপাশে মোট পাঁচটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের উৎস বা ‘ফল্ট লাইন’ সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে মিয়ানমার থেকে নোয়াখালী, নোয়াখালী থেকে সিলেট এবং সিলেট থেকে ভারত পর্যন্ত তিনটি প্রধান প্লেট বাউন্ডারি রয়েছে। পাশাপাশি ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের ডাউকি ফল্ট এবং মধুপুর ফল্টকে বড় ধরনের বিপদের কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। এই পরিস্থিতিতে জরুরি ভিত্তিতে পুরনো ভবন সংস্কার এবং নতুন ভবন নির্মাণে ভূমিকম্প প্রতিরোধক কোড কঠোরভাবে অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে ভূ-তাত্ত্বিক অস্থিরতা বৃদ্ধির ফলে চলতি ফেব্রুয়ারি মাসে রেকর্ড ১১ বার কেঁপে উঠেছে দেশ। সর্বশেষ গতকাল শুক্রবার ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, দুপুর ১টা ৫২ মিনিট ২৯ সেকেন্ডে ৫ দশমিক ৪ মাত্রার একটি মাঝারি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। সাতক্ষীরার আশাশুনি এলাকায় উৎপন্ন এই কম্পন রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মাসে এ নিয়ে মোট ১০টি আলাদা ঘটনায় ১১ বার কম্পন অনুভূত হলো।
আবহাওয়াবিদ ফারজানা সুলতানার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গতকালের ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৪, যা মাঝারি শ্রেণির। এর আগে ১ ফেব্রুয়ারি সিলেটে ৩ মাত্রার কম্পন দিয়ে এই মাসের ভূ-তাত্ত্বিক অস্থিরতা শুরু হয়। এরপর ৩ ফেব্রুয়ারি সাতক্ষীরার কলারোয়ায় ৪ দশমিক ১ মাত্রা এবং একই দিনে মিয়ানমারে ৫ দশমিক ৯ ও ৫ দশমিক ২ মাত্রার দুটি কম্পনের প্রভাব বাংলাদেশে পড়ে। ৯, ১০, ১৯ ও ২৫ ফেব্রুয়ারি যথাক্রমে সিলেট, সুনামগঞ্জ ও মিয়ানমার সীমান্তে আরও বেশ কয়েকটি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়। ২৬ ফেব্রুয়ারি ভারতের সিকিমে হওয়া ৩ দশমিক ৭ মাত্রার কম্পনটিও দেশের উত্তরাঞ্চলে অনুভূত হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গত বছরের নভেম্বর মাস থেকেই দেশে ভূমিকম্পের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। ২১ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে নরসিংদীর মাধবদীতে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার এক শক্তিশালী ভূমিকম্পে ১০ জন প্রাণ হারান এবং আহত হন অন্তত ছয় শতাধিক মানুষ। এরপর থেকেই ভূতত্ত্ববিদরা বড় ধরনের কোনো দুর্যোগের পূর্বাভাস দিয়ে আসছেন। তাদের মতে, বাংলাদেশ ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় ভৌগোলিকভাবেই দেশটি উচ্চ ভূমিকম্প ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও জলবায়ু সহনশীলতা বিভাগের অধ্যাপক ড. জিল্লুর রহমান এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, দেশের উত্তর ও পূর্বাঞ্চল ভৌগোলিকভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকলেও অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে ঢাকাকে নিয়ে শঙ্কা সবচেয়ে বেশি। তার মতে, রাজধানীর ঘনবসতি এবং দুর্বল ভবন কাঠামো মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পকেও ভয়াবহ মৃত্যুফাঁদে পরিণত করতে পারে। তিনি দেশের অভ্যন্তরে ছোট ছোট অজ্ঞাত ফল্ট লাইনগুলো দ্রুত চিহ্নিত করে ভবন নির্মাণে কঠোর নজরদারির তাগিদ দেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচি (সিডিএমপি) ও জাইকার এক যৌথ জরিপের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকায় যদি ৭ মাত্রার কোনো ভূমিকম্প আঘাত হানে, তবে প্রায় ৭২ হাজার ভবন তাৎক্ষণিকভাবে ধসে পড়তে পারে। এতে ঢাকা শহর অন্তত ৭ কোটি টন কংক্রিটের স্তূপে পরিণত হবে। এছাড়া চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, বন্দর নগরীর প্রায় ৮০ শতাংশ ভবনই কোনো না কোনোভাবে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। রাজউকের পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকার ২১ লাখ ভবনের মধ্যে ৬ লাখ ভবনই বহুতল এবং এগুলোর বড় অংশই ভূমিকম্প সহনশীল নয়।
ভূমিকম্পের ঝুঁকি বিবেচনায় আবহাওয়া অধিদপ্তর সমগ্র দেশকে তিনটি প্রধান জোনে ভাগ করেছে। এর মধ্যে জোন-১ বা উচ্চ ঝুঁকির আওতায় রয়েছে সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের ৯টি জেলা। এছাড়া টাঙ্গাইল, গাজীপুর, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি এই জোনের অন্তর্ভুক্ত। মাঝারি ঝুঁকির জোন-২ এ রয়েছে ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকা। অন্যদিকে খুলনা, যশোর ও বরিশাল অঞ্চলকে তুলনামূলক কম ঝুঁকির বা জোন-৩ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ভূ-তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশের চারপাশে মোট পাঁচটি শক্তিশালী ভূমিকম্পের উৎস বা ‘ফল্ট লাইন’ সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে মিয়ানমার থেকে নোয়াখালী, নোয়াখালী থেকে সিলেট এবং সিলেট থেকে ভারত পর্যন্ত তিনটি প্রধান প্লেট বাউন্ডারি রয়েছে। পাশাপাশি ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের ডাউকি ফল্ট এবং মধুপুর ফল্টকে বড় ধরনের বিপদের কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। এই পরিস্থিতিতে জরুরি ভিত্তিতে পুরনো ভবন সংস্কার এবং নতুন ভবন নির্মাণে ভূমিকম্প প্রতিরোধক কোড কঠোরভাবে অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।

আপনার মতামত লিখুন