ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

রাষ্ট্রপতির বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার: বঙ্গভবনে বন্দিদশা, ষড়যন্ত্র ও দৃঢ় প্রতিরোধের অজানা অধ্যায়


নিজস্ব প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

রাষ্ট্রপতির বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার: বঙ্গভবনে বন্দিদশা, ষড়যন্ত্র ও দৃঢ় প্রতিরোধের অজানা অধ্যায়

দেড় বছরের নীরবতা ভেঙে অবশেষে মুখ খুললেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। গত শুক্রবার (২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) রাতে বঙ্গভবনে কালের কণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক হায়দার আলী ও বিশেষ প্রতিনিধি জয়নাল আবেদীনকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বঙ্গভবনে তার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝড়ের বিবরণ তুলে ধরেন।

ষড়যন্ত্র ও বঙ্গভবন ঘেরাও

রাষ্ট্রপতি জানান, গত দেড় বছরে তাকে সাংবিধানিকভাবে সরিয়ে দেওয়ার একাধিক পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তার ভাষায়, দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট ও সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরির বহু পাঁয়তারা হয়েছে, কিন্তু তিনি দৃঢ়চিত্তে প্রতিটি ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করেছেন।

২০২৪ সালের ২২ অক্টোবর বঙ্গভবন ঘেরাওয়ের রাতটিকে তিনি "বিভীষিকাময়" হিসেবে বর্ণনা করেন। সেই রাতে বিভিন্ন নামে ও পরিচয়ে একাধিক গোষ্ঠী রাষ্ট্রপতির অপসারণ দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাও করে। সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশন তিন স্তরে নিরাপত্তা মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সেই রাত ২টা-৩টা পর্যন্ত বিক্ষোভকারীরা অবস্থান করে এবং বিভিন্ন স্থানে সমাবেশ করে রাষ্ট্রপতির অপসারণ দাবি তোলে।

তিনি জানান, রাত ১২টার দিকে তৎকালীন তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম ফোন করে জানান যে বিক্ষোভকারীরা তাদের দলের কেউ নয় এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।

সাবেক প্রধান বিচারপতিকে বসানোর চক্রান্ত

রাষ্ট্রপতি আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন যে, অন্তর্বর্তী সরকার নিজেই একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকে অসাংবিধানিক উপায়ে তার স্থলে বসানোর পরিকল্পনা করেছিল। সরকারের একজন উপদেষ্টা ওই বিচারপতির সঙ্গে ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকও করেন। তবে ওই বিচারপতি সাংবিধানিক বৈধতার প্রশ্নে অনড় থেকে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। ফলে সরকারের সেই উদ্যোগও ব্যর্থ হয়।

বিএনপি ও সশস্ত্র বাহিনীর অকুণ্ঠ সমর্থন

কঠিন সময়ে কে পাশে ছিলেন জানতে চাইলে রাষ্ট্রপতি নির্দ্বিধায় বিএনপির নাম নেন। তিনি বলেন, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার বিষয়ে তাকে স্পষ্ট আশ্বাস দিয়েছিলেন। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রথমে কৌতূহল থাকলেও ধীরে ধীরে বুঝতে পেরেছেন তিনি অত্যন্ত আন্তরিক মানুষ। সশস্ত্র বাহিনীর তিন প্রধানও তাকে মনোবল দিয়েছেন এবং যেকোনো অসাংবিধানিক পদক্ষেপ রোধ করার অঙ্গীকার করেছেন।

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সম্পর্কহীনতা

রাষ্ট্রপতি জানান, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দেড় বছরে একবারও তার সঙ্গে দেখা করেননি এবং ১৪ থেকে ১৫টি বিদেশ সফরের পরও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী কোনো তথ্য জানাননি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত সর্বশেষ চুক্তির বিষয়েও তাকে কিছু জানানো হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বিদেশ সফর আটকে দেওয়া ও ছবি নামানো

রাষ্ট্রপতি অভিযোগ করেন যে, কসোভোতে একটি আন্তর্জাতিক সমাবেশে এবং কাতারের আমিরের আমন্ত্রণে একটি সম্মেলনে তার অংশগ্রহণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কৌশলে আটকে দেওয়া হয়। বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের হাইকমিশন ও কনস্যুলেটে বহু বছরের রীতি ভেঙে এক রাতের মধ্যে তার ছবি নামিয়ে ফেলা হয়। একজন উপদেষ্টার নির্দেশেই এই কাজ করা হয় বলে তিনি দাবি করেন।

প্রেস উইং শূন্য করে দেওয়া

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নবনির্বাচিত কমিটির সঙ্গে স্বাভাবিক সৌজন্য সাক্ষাৎকার বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং ক্ষুব্ধ হয়ে বঙ্গভবনের প্রেস সেক্রেটারি, ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি, অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রেস সেক্রেটারিসহ ৩০ বছর ধরে কর্মরত দুজন ফটোগ্রাফারকেও প্রত্যাহার করে নেয়। এরপর থেকে রাষ্ট্রপতি কার্যালয় থেকে কোনো প্রেস রিলিজ পর্যন্ত দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না বলে তিনি জানান। ক্যাবিনেট সেক্রেটারি, প্রিন্সিপাল সেক্রেটারিসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বারবার ফোন করেও কোনো সাড়া পাননি।

রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন জানান, এত প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন এবং বলেছিলেন, প্রয়োজনে রক্ত ঝরুক—কিন্তু সংবিধান রক্ষায় তিনি আপোষ করবেন না।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


রাষ্ট্রপতির বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার: বঙ্গভবনে বন্দিদশা, ষড়যন্ত্র ও দৃঢ় প্রতিরোধের অজানা অধ্যায়

প্রকাশের তারিখ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

featured Image

দেড় বছরের নীরবতা ভেঙে অবশেষে মুখ খুললেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। গত শুক্রবার (২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) রাতে বঙ্গভবনে কালের কণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক হায়দার আলী ও বিশেষ প্রতিনিধি জয়নাল আবেদীনকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বঙ্গভবনে তার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝড়ের বিবরণ তুলে ধরেন।

ষড়যন্ত্র ও বঙ্গভবন ঘেরাও

রাষ্ট্রপতি জানান, গত দেড় বছরে তাকে সাংবিধানিকভাবে সরিয়ে দেওয়ার একাধিক পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তার ভাষায়, দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা নষ্ট ও সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরির বহু পাঁয়তারা হয়েছে, কিন্তু তিনি দৃঢ়চিত্তে প্রতিটি ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করেছেন।

২০২৪ সালের ২২ অক্টোবর বঙ্গভবন ঘেরাওয়ের রাতটিকে তিনি "বিভীষিকাময়" হিসেবে বর্ণনা করেন। সেই রাতে বিভিন্ন নামে ও পরিচয়ে একাধিক গোষ্ঠী রাষ্ট্রপতির অপসারণ দাবিতে বঙ্গভবন ঘেরাও করে। সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশন তিন স্তরে নিরাপত্তা মোতায়েন করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সেই রাত ২টা-৩টা পর্যন্ত বিক্ষোভকারীরা অবস্থান করে এবং বিভিন্ন স্থানে সমাবেশ করে রাষ্ট্রপতির অপসারণ দাবি তোলে।

তিনি জানান, রাত ১২টার দিকে তৎকালীন তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম ফোন করে জানান যে বিক্ষোভকারীরা তাদের দলের কেউ নয় এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে।

সাবেক প্রধান বিচারপতিকে বসানোর চক্রান্ত

রাষ্ট্রপতি আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেন যে, অন্তর্বর্তী সরকার নিজেই একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকে অসাংবিধানিক উপায়ে তার স্থলে বসানোর পরিকল্পনা করেছিল। সরকারের একজন উপদেষ্টা ওই বিচারপতির সঙ্গে ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকও করেন। তবে ওই বিচারপতি সাংবিধানিক বৈধতার প্রশ্নে অনড় থেকে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। ফলে সরকারের সেই উদ্যোগও ব্যর্থ হয়।

বিএনপি ও সশস্ত্র বাহিনীর অকুণ্ঠ সমর্থন

কঠিন সময়ে কে পাশে ছিলেন জানতে চাইলে রাষ্ট্রপতি নির্দ্বিধায় বিএনপির নাম নেন। তিনি বলেন, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার বিষয়ে তাকে স্পষ্ট আশ্বাস দিয়েছিলেন। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান সম্পর্কে তিনি বলেন, প্রথমে কৌতূহল থাকলেও ধীরে ধীরে বুঝতে পেরেছেন তিনি অত্যন্ত আন্তরিক মানুষ। সশস্ত্র বাহিনীর তিন প্রধানও তাকে মনোবল দিয়েছেন এবং যেকোনো অসাংবিধানিক পদক্ষেপ রোধ করার অঙ্গীকার করেছেন।

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সম্পর্কহীনতা

রাষ্ট্রপতি জানান, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দেড় বছরে একবারও তার সঙ্গে দেখা করেননি এবং ১৪ থেকে ১৫টি বিদেশ সফরের পরও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী কোনো তথ্য জানাননি। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত সর্বশেষ চুক্তির বিষয়েও তাকে কিছু জানানো হয়নি বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বিদেশ সফর আটকে দেওয়া ও ছবি নামানো

রাষ্ট্রপতি অভিযোগ করেন যে, কসোভোতে একটি আন্তর্জাতিক সমাবেশে এবং কাতারের আমিরের আমন্ত্রণে একটি সম্মেলনে তার অংশগ্রহণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কৌশলে আটকে দেওয়া হয়। বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের হাইকমিশন ও কনস্যুলেটে বহু বছরের রীতি ভেঙে এক রাতের মধ্যে তার ছবি নামিয়ে ফেলা হয়। একজন উপদেষ্টার নির্দেশেই এই কাজ করা হয় বলে তিনি দাবি করেন।

প্রেস উইং শূন্য করে দেওয়া

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নবনির্বাচিত কমিটির সঙ্গে স্বাভাবিক সৌজন্য সাক্ষাৎকার বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং ক্ষুব্ধ হয়ে বঙ্গভবনের প্রেস সেক্রেটারি, ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি, অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রেস সেক্রেটারিসহ ৩০ বছর ধরে কর্মরত দুজন ফটোগ্রাফারকেও প্রত্যাহার করে নেয়। এরপর থেকে রাষ্ট্রপতি কার্যালয় থেকে কোনো প্রেস রিলিজ পর্যন্ত দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না বলে তিনি জানান। ক্যাবিনেট সেক্রেটারি, প্রিন্সিপাল সেক্রেটারিসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বারবার ফোন করেও কোনো সাড়া পাননি।

রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন জানান, এত প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন এবং বলেছিলেন, প্রয়োজনে রক্ত ঝরুক—কিন্তু সংবিধান রক্ষায় তিনি আপোষ করবেন না।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ