ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী: সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে বিএনপি-জামায়াত দ্বন্দ্বে উত্তপ্ত রাজপথ


নিজস্ব প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী: সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে বিএনপি-জামায়াত দ্বন্দ্বে উত্তপ্ত রাজপথ

জুলাই বিপ্লবের চেতনা সমুন্নত রাখতে প্রস্তাবিত ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত গণভোটে বিপুল ব্যবধানে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের পক্ষে জনগণের এই রায় সত্ত্বেও এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে নবনির্বাচিত সরকারি দল বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের মধ্যে তীব্র মতভেদ দেখা দিয়েছে। এই বিরোধের জেরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচন-পরবর্তী বড় ধরনের সংঘাতের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মঙ্গলবার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করলেও বিএনপি ও তার মিত্ররা ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অস্বীকার করেছেন। এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যা রাষ্ট্রের সংস্কার প্রক্রিয়াকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

জুলাই সনদ ও বিরোধের প্রেক্ষাপট ২০২৪ সালের রক্তক্ষয়ী ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের জুলাই মাসে এই ‘জুলাই সনদ’ প্রণয়ন করে। এতে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমাবদ্ধ করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং ৩৫০ সদস্যের জাতীয় সংসদের পাশাপাশি ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি ‘উচ্চকক্ষ’ গঠনের প্রস্তাবসহ ৮০টিরও বেশি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে।

নির্বাচনের আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সনদের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানালেও এখন এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে কৌশলী অবস্থান নিয়েছে বিএনপি। বিশেষ করে ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠনের ক্ষেত্রে ‘আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি’ নিয়ে দলটির ঘোর আপত্তি রয়েছে। বিএনপির আশঙ্কা, এই পদ্ধতি কার্যকর হলে বড় দলগুলোর সংসদীয় আধিপত্য খর্ব হতে পারে।

শপথ নিয়ে নাটকীয়তা মঙ্গলবার নবনির্বাচিত এমপিদের দুটি পৃথক শপথ নেওয়ার কথা ছিল—একটি সংবিধান রক্ষার এবং দ্বিতীয়টি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের। বিএনপি এমপিরা কেবল প্রথম শপথটি নিলেও দ্বিতীয়টি বর্জন করেন। এর বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি (NCP) উভয় শপথ গ্রহণ করে। বর্তমানে দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্য দ্বিতীয় শপথ না নেওয়ায় সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন প্রক্রিয়া থমকে গেছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, এই পরিষদ এখনো সংবিধানের অংশ নয়। তিনি বলেন, “নির্বাচিত সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত হলেই এটি বৈধতা পাবে।” অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল মন্তব্য করেছেন যে, প্রধান দলগুলো সংস্কারের মূল বিষয়ে একমত থাকলেও উচ্চকক্ষ গঠনের পদ্ধতি নিয়ে বিরোধই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশ্লেষকদের অভিমত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক খন্দকার তাহমিদ রেজওয়ানের মতে, গণভোটে জয়ী হওয়ার পর বিএনপি রাজনৈতিকভাবে সংস্কার বাস্তবায়নে বাধ্য। তবে তারা সম্ভবত সংস্কার পরিষদের পরিবর্তে সরাসরি সংসদের মাধ্যমে আইন প্রণয়ন করে সংস্কার করতে চায়। জামায়াত ও তার মিত্ররা দ্রুত সনদ বাস্তবায়নে চাপ দিলেও সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিএনপিই নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় রয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সংস্কারের সময়সীমা এবং পদ্ধতি নিয়ে এই অচলাবস্থা দ্রুত নিরসন না হলে রাজপথে বিএনপি ও জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যকার বিরোধ আরও সহিংস রূপ নিতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী: সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে বিএনপি-জামায়াত দ্বন্দ্বে উত্তপ্ত রাজপথ

প্রকাশের তারিখ : ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

featured Image

জুলাই বিপ্লবের চেতনা সমুন্নত রাখতে প্রস্তাবিত ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত গণভোটে বিপুল ব্যবধানে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের পক্ষে জনগণের এই রায় সত্ত্বেও এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে নবনির্বাচিত সরকারি দল বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের মধ্যে তীব্র মতভেদ দেখা দিয়েছে। এই বিরোধের জেরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচন-পরবর্তী বড় ধরনের সংঘাতের শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মঙ্গলবার নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করলেও বিএনপি ও তার মিত্ররা ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অস্বীকার করেছেন। এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে, যা রাষ্ট্রের সংস্কার প্রক্রিয়াকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।

জুলাই সনদ ও বিরোধের প্রেক্ষাপট ২০২৪ সালের রক্তক্ষয়ী ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের জুলাই মাসে এই ‘জুলাই সনদ’ প্রণয়ন করে। এতে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমাবদ্ধ করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং ৩৫০ সদস্যের জাতীয় সংসদের পাশাপাশি ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি ‘উচ্চকক্ষ’ গঠনের প্রস্তাবসহ ৮০টিরও বেশি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে।

নির্বাচনের আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই সনদের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানালেও এখন এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে কৌশলী অবস্থান নিয়েছে বিএনপি। বিশেষ করে ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠনের ক্ষেত্রে ‘আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি’ নিয়ে দলটির ঘোর আপত্তি রয়েছে। বিএনপির আশঙ্কা, এই পদ্ধতি কার্যকর হলে বড় দলগুলোর সংসদীয় আধিপত্য খর্ব হতে পারে।

শপথ নিয়ে নাটকীয়তা মঙ্গলবার নবনির্বাচিত এমপিদের দুটি পৃথক শপথ নেওয়ার কথা ছিল—একটি সংবিধান রক্ষার এবং দ্বিতীয়টি জুলাই সনদ বাস্তবায়নের। বিএনপি এমপিরা কেবল প্রথম শপথটি নিলেও দ্বিতীয়টি বর্জন করেন। এর বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপি (NCP) উভয় শপথ গ্রহণ করে। বর্তমানে দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্য দ্বিতীয় শপথ না নেওয়ায় সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন প্রক্রিয়া থমকে গেছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, এই পরিষদ এখনো সংবিধানের অংশ নয়। তিনি বলেন, “নির্বাচিত সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত হলেই এটি বৈধতা পাবে।” অন্যদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুল মন্তব্য করেছেন যে, প্রধান দলগুলো সংস্কারের মূল বিষয়ে একমত থাকলেও উচ্চকক্ষ গঠনের পদ্ধতি নিয়ে বিরোধই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

বিশ্লেষকদের অভিমত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক খন্দকার তাহমিদ রেজওয়ানের মতে, গণভোটে জয়ী হওয়ার পর বিএনপি রাজনৈতিকভাবে সংস্কার বাস্তবায়নে বাধ্য। তবে তারা সম্ভবত সংস্কার পরিষদের পরিবর্তে সরাসরি সংসদের মাধ্যমে আইন প্রণয়ন করে সংস্কার করতে চায়। জামায়াত ও তার মিত্ররা দ্রুত সনদ বাস্তবায়নে চাপ দিলেও সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিএনপিই নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় রয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সংস্কারের সময়সীমা এবং পদ্ধতি নিয়ে এই অচলাবস্থা দ্রুত নিরসন না হলে রাজপথে বিএনপি ও জামায়াত-নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যকার বিরোধ আরও সহিংস রূপ নিতে পারে।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ