ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

পুরনো ঢাকায় রমজান উদযাপন: হাবিবুর রহমানের লেখায় রমজানের রঙিন চিত্র


নিজস্ব প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

পুরনো ঢাকায় রমজান উদযাপন: হাবিবুর রহমানের লেখায় রমজানের রঙিন চিত্র

এখনই প্রতিবেডনটি তৈরি করছি।


পুরনো ঢাকায় রমজান উদযাপন: হাবিবুর রহমানের লেখায় রমজানের রঙিন চিত্র

'ঢাকা পাচাস বারাস প্যাহলে' ঢাকার ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও প্রামাণ্য গ্রন্থ। লিখেছেন বরেণ্য চিকিৎসক, সাহিত্যিক ও ইতিহাসবিদ হেকিম হাবিবুর রহমান। এই গ্রন্থে লেখক নিজের দেখা উনিশ শতকের শেষ অংশ ও বিশ শতকের প্রথম অর্ধে ঢাকার সমাজ সংস্কৃতি এবং নাগরিক জীবনের বহুমাত্রিক রূপ তুলে ধরেছেন। তাঁর রচনায় বিশদভাবে উঠে এসেছে পুরনো ঢাকায় রমজান ও রমজানকেন্দ্রিক বিভিন্ন উৎসব এবং উদযাপনের বৈচিত্র্যময় আয়োজনের কথা।

রমজানের প্রস্তুতি

শাবান মাসের ২০ তারিখের পর থেকে জোরেশোরে রমজানের প্রস্তুতি শুরু হতো। মসজিদে মুসল্লিদের আধিক্য বাড়ত। মসজিদগুলো চুনকাম ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হতো। অভিজাত লোকেরা ঘরবাড়ি নতুন করে সাজাতেন। গরিব-শরিবরা চিকন মাটির লেপ দিয়ে ঘর ঝকঝকে করে ফেলতেন। বালুমাটির নতুন সুরাই, সুগন্ধি, পরিষ্কার করা ছোলাবুট— সবই প্রস্তুত রাখা হতো। ২৭ শাবানে মাটির নতুন পাতিলে মুগ ডালের বীজ ভিজিয়ে অঙ্কুরিত করা হতো প্রথম রোজার ইফতারের জন্য।

চাঁদ দেখা ও তারাবি

চানরাত থেকেই ঘরে ঘরে ফারাস বিছানোর আয়োজন শুরু হতো। বড় কাটরা, আহসান মঞ্জিল, ছোট কাটরা ও হোসেনী দালানের ছাদে লোকজন জড়ো হতেন চাঁদ দেখতে। শৌখিন লোকেরা নৌকায় মাঝনদীতে গিয়ে চাঁদ দেখতেন। চাঁদ দেখা গেলে বন্দুকের গুলি ও তোপধ্বনি হতো, একে অপরকে মোবারকবাদ জানানো হতো।

মসজিদের জন্য হাফেজ আগে থেকেই মনোনীত থাকতেন। ঝাড় ফানুস পরিষ্কার করে মোমবাতি লাগানো হতো। খতম তারাবির চেয়ে সুরা তারাবির প্রচলন বেশি ছিল, কারণ শহরে হাফেজদের সংখ্যা কম ছিল। তাঁদের খুব সম্মান ও মর্যাদা দেওয়া হতো। খতমের পর কালোজিরা ও শব্‌-এর মধ্যে দম করানো হতো এবং মিষ্টান্ন, শিরবেরেঞ্জ ও পোলাও বিতরণ করা হতো।

সাহরির আয়োজন

তারাবির পর পুরুষেরা ঘুমিয়ে যেতেন ও যুবকেরা গল্পগুজব করে সাহরি পর্যন্ত জেগে থাকতেন। 'সাহরিওয়ালা' লণ্ঠন ও লাঠি নিয়ে দরজায় দরজায় ডাক দিতেন— 'রোজদারো উঠ্‌ঠো, সাহরি খাও, ওয়াক্ত হো গ্যয়া।' ঢাকার বাসিন্দারা সাহরিতে গরম খাবার খেতেন। ভাত টাটকা রান্না করা হতো ও তরকারি দিনেই রান্না করে রাখা হতো।

ইফতারের সমারোহ

মাগরিবের আজানের পর প্রথমে জমজমের পানি শরবতে মিশিয়ে পান করা হতো, তারপর খেজুর। ঢাকায় ফালুদা, সুগন্ধি তোকমার শরবত, বেলের শরবত প্রচলিত ছিল। ইফতারে থাকত কোফতা, মুড়ির ভর্তা, তেলে ভাজা পনির, ফুলুরি, সমুসা, কাবাব ও নানা ধরনের ভাজাপোড়া।

রমজানে বিশেষভাবে পাওয়া যেত পুদিনা, টাটকা ক্ষীরা, শিঙাড়া (পানিফল), চীনা আলু জাতীয় শাক। আখ টুকরো করে গোলাপ বা কেওড়ার পানিতে ভিজিয়ে ইফতারে পরিবেশন করা হতো।

চকের ইফতার বাজার

রমজান মাসে চকবাজারে ইফতারের দোকান বসত। ধনী-দরিদ্র সবাই এখান থেকে ইফতার কিনতেন। গোলাবি ওখরা রমজান ছাড়া অন্য সময় পাওয়া যেত না। আলাউদ্দিন হালওয়াই লক্ষ্ণৌ থেকে এসে চকবাজারে দোকান খুলেছিলেন, যেখানে একমাত্র নিমকপারা, সমুসা ও লক্ষ্ণৌ শীরমাল পাওয়া যেত।

সামাজিক রীতি

রমজান মাসে দাওয়াত দেওয়া ঢাকার রীতির বিরুদ্ধে ছিল। তবে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের কাছে খাবার পাঠানোর রেওয়াজ ছিল। বাচ্চারা আট (ছেলে) ও ছয় (মেয়ে) বছর বয়স থেকে রোজা রাখত। আত্মীয়স্বজন তাদের জন্য ইফতার ও নগদ সালামি নিয়ে আসতেন।

সচ্ছল ব্যক্তিরা মসজিদে ইফতার সামগ্রী পাঠাতেন। রমজানের প্রথম ১০ দিনের মধ্যে জাকাতের হিসাব করে শাড়ি ও নগদ টাকা বিতরণ করা হতো। ২০ রোজাকে বিশেষ পবিত্র মনে করা হতো এবং সেদিন বাচ্চাদের প্রথম রোজার ব্যবস্থা করা হতো।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


পুরনো ঢাকায় রমজান উদযাপন: হাবিবুর রহমানের লেখায় রমজানের রঙিন চিত্র

প্রকাশের তারিখ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

featured Image

এখনই প্রতিবেডনটি তৈরি করছি।


পুরনো ঢাকায় রমজান উদযাপন: হাবিবুর রহমানের লেখায় রমজানের রঙিন চিত্র

'ঢাকা পাচাস বারাস প্যাহলে' ঢাকার ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও প্রামাণ্য গ্রন্থ। লিখেছেন বরেণ্য চিকিৎসক, সাহিত্যিক ও ইতিহাসবিদ হেকিম হাবিবুর রহমান। এই গ্রন্থে লেখক নিজের দেখা উনিশ শতকের শেষ অংশ ও বিশ শতকের প্রথম অর্ধে ঢাকার সমাজ সংস্কৃতি এবং নাগরিক জীবনের বহুমাত্রিক রূপ তুলে ধরেছেন। তাঁর রচনায় বিশদভাবে উঠে এসেছে পুরনো ঢাকায় রমজান ও রমজানকেন্দ্রিক বিভিন্ন উৎসব এবং উদযাপনের বৈচিত্র্যময় আয়োজনের কথা।

রমজানের প্রস্তুতি

শাবান মাসের ২০ তারিখের পর থেকে জোরেশোরে রমজানের প্রস্তুতি শুরু হতো। মসজিদে মুসল্লিদের আধিক্য বাড়ত। মসজিদগুলো চুনকাম ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হতো। অভিজাত লোকেরা ঘরবাড়ি নতুন করে সাজাতেন। গরিব-শরিবরা চিকন মাটির লেপ দিয়ে ঘর ঝকঝকে করে ফেলতেন। বালুমাটির নতুন সুরাই, সুগন্ধি, পরিষ্কার করা ছোলাবুট— সবই প্রস্তুত রাখা হতো। ২৭ শাবানে মাটির নতুন পাতিলে মুগ ডালের বীজ ভিজিয়ে অঙ্কুরিত করা হতো প্রথম রোজার ইফতারের জন্য।

চাঁদ দেখা ও তারাবি

চানরাত থেকেই ঘরে ঘরে ফারাস বিছানোর আয়োজন শুরু হতো। বড় কাটরা, আহসান মঞ্জিল, ছোট কাটরা ও হোসেনী দালানের ছাদে লোকজন জড়ো হতেন চাঁদ দেখতে। শৌখিন লোকেরা নৌকায় মাঝনদীতে গিয়ে চাঁদ দেখতেন। চাঁদ দেখা গেলে বন্দুকের গুলি ও তোপধ্বনি হতো, একে অপরকে মোবারকবাদ জানানো হতো।

মসজিদের জন্য হাফেজ আগে থেকেই মনোনীত থাকতেন। ঝাড় ফানুস পরিষ্কার করে মোমবাতি লাগানো হতো। খতম তারাবির চেয়ে সুরা তারাবির প্রচলন বেশি ছিল, কারণ শহরে হাফেজদের সংখ্যা কম ছিল। তাঁদের খুব সম্মান ও মর্যাদা দেওয়া হতো। খতমের পর কালোজিরা ও শব্‌-এর মধ্যে দম করানো হতো এবং মিষ্টান্ন, শিরবেরেঞ্জ ও পোলাও বিতরণ করা হতো।

সাহরির আয়োজন

তারাবির পর পুরুষেরা ঘুমিয়ে যেতেন ও যুবকেরা গল্পগুজব করে সাহরি পর্যন্ত জেগে থাকতেন। 'সাহরিওয়ালা' লণ্ঠন ও লাঠি নিয়ে দরজায় দরজায় ডাক দিতেন— 'রোজদারো উঠ্‌ঠো, সাহরি খাও, ওয়াক্ত হো গ্যয়া।' ঢাকার বাসিন্দারা সাহরিতে গরম খাবার খেতেন। ভাত টাটকা রান্না করা হতো ও তরকারি দিনেই রান্না করে রাখা হতো।

ইফতারের সমারোহ

মাগরিবের আজানের পর প্রথমে জমজমের পানি শরবতে মিশিয়ে পান করা হতো, তারপর খেজুর। ঢাকায় ফালুদা, সুগন্ধি তোকমার শরবত, বেলের শরবত প্রচলিত ছিল। ইফতারে থাকত কোফতা, মুড়ির ভর্তা, তেলে ভাজা পনির, ফুলুরি, সমুসা, কাবাব ও নানা ধরনের ভাজাপোড়া।

রমজানে বিশেষভাবে পাওয়া যেত পুদিনা, টাটকা ক্ষীরা, শিঙাড়া (পানিফল), চীনা আলু জাতীয় শাক। আখ টুকরো করে গোলাপ বা কেওড়ার পানিতে ভিজিয়ে ইফতারে পরিবেশন করা হতো।

চকের ইফতার বাজার

রমজান মাসে চকবাজারে ইফতারের দোকান বসত। ধনী-দরিদ্র সবাই এখান থেকে ইফতার কিনতেন। গোলাবি ওখরা রমজান ছাড়া অন্য সময় পাওয়া যেত না। আলাউদ্দিন হালওয়াই লক্ষ্ণৌ থেকে এসে চকবাজারে দোকান খুলেছিলেন, যেখানে একমাত্র নিমকপারা, সমুসা ও লক্ষ্ণৌ শীরমাল পাওয়া যেত।

সামাজিক রীতি

রমজান মাসে দাওয়াত দেওয়া ঢাকার রীতির বিরুদ্ধে ছিল। তবে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুবান্ধবের কাছে খাবার পাঠানোর রেওয়াজ ছিল। বাচ্চারা আট (ছেলে) ও ছয় (মেয়ে) বছর বয়স থেকে রোজা রাখত। আত্মীয়স্বজন তাদের জন্য ইফতার ও নগদ সালামি নিয়ে আসতেন।

সচ্ছল ব্যক্তিরা মসজিদে ইফতার সামগ্রী পাঠাতেন। রমজানের প্রথম ১০ দিনের মধ্যে জাকাতের হিসাব করে শাড়ি ও নগদ টাকা বিতরণ করা হতো। ২০ রোজাকে বিশেষ পবিত্র মনে করা হতো এবং সেদিন বাচ্চাদের প্রথম রোজার ব্যবস্থা করা হতো।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ