ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে অনিশ্চয়তা: বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে তীব্র বিরোধ


নিজস্ব প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে অনিশ্চয়তা: বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে তীব্র বিরোধ

নতুন সরকারের যাত্রা শুরুর প্রথম দিনেই সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের মধ্যে প্রকাশ্য মতবিরোধ দেখা দিয়েছে, যা শপথ গ্রহণ, সাংবিধানিক ব্যাখ্যা, গণভোটের ম্যান্ডেট ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে কেন্দ্র করে জটিল সমীকরণ তৈরি করেছে।

গতকাল মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) সংসদ সচিবালয় একই দিনে দুটি পৃথক শপথের আয়োজন করে— একটি সংসদ সদস্য হিসেবে, অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। বিএনপির নবনির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। স্বতন্ত্র সাতজন সদস্যও একই পথ অনুসরণ করেন। অপরদিকে জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস ও ইসলামী আন্দোলনের ৭৮ জন সদস্য উভয় শপথই গ্রহণ করেন। শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন।

বিএনপির যুক্তি স্পষ্ট— সংবিধানে এখনো পরিষদের বিধান সংযোজিত হয়নি। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পরিষদ সংবিধানে ধারণ না হওয়া পর্যন্ত এবং কে শপথ পড়াবেন সে সংক্রান্ত বিধান না থাকা পর্যন্ত পরিষদের শপথ গ্রহণ সম্ভব নয়। সংসদে প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই পরিষদের সদস্যদের শপথ নেওয়ার বিধান করা যেতে পারে বলে তিনি জানান।

প্রতীকী একটি দৃশ্যও নজর কাড়ে— সংসদ সদস্যের শপথপত্র ছিল সাদা কাগজে, আর পরিষদের শপথপত্র নীল কাগজে। বিএনপির সদস্যরা নীল কাগজটি চেয়ারে রেখেই কক্ষ ত্যাগ করেন।

বিরোধী জোটের দাবি, গত ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে ৬৮ শতাংশ ভোটার 'হ্যাঁ' ভোট দেওয়ায় পরিষদ গঠন ও শপথ গ্রহণ বাধ্যতামূলক। 'জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ' অনুযায়ী, 'হ্যাঁ' জয়ী হলে নবনির্বাচিত এমপিরা ১৮০ কার্যদিবসের জন্য পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন এবং ৩০ দিনের মধ্যে পরিষদের সভা আহ্বান করতে হবে।

জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের জানান, জোটের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে দুটি শপথই নেওয়া হবে। তিনি বলেন, বিএনপি পরিষদের শপথ না নিয়ে জুলাই আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে এবং গণভোটের রায়কে অসম্মান করেছে।

এনসিপি বিএনপির অবস্থানের প্রতিবাদে সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান বয়কট করে। দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া অভিযোগ করেন, গণভোটে জনরায়ের সঙ্গে প্রতারণা করে সরকার শপথ নিচ্ছে।

এদিকে গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের হয়েছে। জামায়াতের একাধিক নেতার সন্দেহ, এতে বিএনপির সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। ফলে রাজনৈতিক বিরোধ এখন আইনি পরিসরেও বিস্তৃত হয়েছে।

জুলাই সনদে মোট ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে ১৩টিতে বিএনপির 'নোট অব ডিসেন্ট' এবং সাতটিতে জামায়াতের আপত্তি ছিল। বিএনপির অবস্থান ছিল— যেসব প্রস্তাবে তারা আপত্তি জানিয়েছে, নির্বাচনে জয়ী হলে সেগুলো নিজেদের মতানুসারে বাস্তবায়ন করবে। অন্যদিকে জামায়াত-এনসিপি জোট চেয়েছে সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন।

আদেশের ১০(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, পরিষদের কোরাম হবে ৬০ সদস্যের উপস্থিতিতে। বর্তমানে জামায়াত জোটসহ ৭৮ জন সদস্য শপথ নিয়েছেন। বিএনপি যোগ না দিলেও কোরাম পূরণ সম্ভব— তবে রাজনৈতিক বৈধতা ও সর্বদলীয় অংশগ্রহণের প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

সাবেক ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, জনগণের সার্বভৌম অভিপ্রায়ে জারি হওয়া আদেশ গণভোটে অনুমোদিত হয়েছে। শপথ না নেওয়ার মাধ্যমে অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা তৈরি হয়েছে।

পরিষদের সভা ৩০ দিনের মধ্যে আহ্বানের বিধান রয়েছে। বিএনপি যদি অবস্থান অপরিবর্তিত রাখে, তবে পরিষদ একতরফাভাবে এগোবে কি না— সেই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে রাজনৈতিক উত্তরণ সহযোগিতামূলক হবে নাকি সংঘাতময়।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে অনিশ্চয়তা: বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে তীব্র বিরোধ

প্রকাশের তারিখ : ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

featured Image

নতুন সরকারের যাত্রা শুরুর প্রথম দিনেই সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটের মধ্যে প্রকাশ্য মতবিরোধ দেখা দিয়েছে, যা শপথ গ্রহণ, সাংবিধানিক ব্যাখ্যা, গণভোটের ম্যান্ডেট ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে কেন্দ্র করে জটিল সমীকরণ তৈরি করেছে।

গতকাল মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) সংসদ সচিবালয় একই দিনে দুটি পৃথক শপথের আয়োজন করে— একটি সংসদ সদস্য হিসেবে, অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। বিএনপির নবনির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। স্বতন্ত্র সাতজন সদস্যও একই পথ অনুসরণ করেন। অপরদিকে জামায়াত, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস ও ইসলামী আন্দোলনের ৭৮ জন সদস্য উভয় শপথই গ্রহণ করেন। শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন।

বিএনপির যুক্তি স্পষ্ট— সংবিধানে এখনো পরিষদের বিধান সংযোজিত হয়নি। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, পরিষদ সংবিধানে ধারণ না হওয়া পর্যন্ত এবং কে শপথ পড়াবেন সে সংক্রান্ত বিধান না থাকা পর্যন্ত পরিষদের শপথ গ্রহণ সম্ভব নয়। সংসদে প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই পরিষদের সদস্যদের শপথ নেওয়ার বিধান করা যেতে পারে বলে তিনি জানান।

প্রতীকী একটি দৃশ্যও নজর কাড়ে— সংসদ সদস্যের শপথপত্র ছিল সাদা কাগজে, আর পরিষদের শপথপত্র নীল কাগজে। বিএনপির সদস্যরা নীল কাগজটি চেয়ারে রেখেই কক্ষ ত্যাগ করেন।

বিরোধী জোটের দাবি, গত ১২ ফেব্রুয়ারি সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে ৬৮ শতাংশ ভোটার 'হ্যাঁ' ভোট দেওয়ায় পরিষদ গঠন ও শপথ গ্রহণ বাধ্যতামূলক। 'জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ' অনুযায়ী, 'হ্যাঁ' জয়ী হলে নবনির্বাচিত এমপিরা ১৮০ কার্যদিবসের জন্য পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেবেন এবং ৩০ দিনের মধ্যে পরিষদের সভা আহ্বান করতে হবে।

জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের জানান, জোটের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে দুটি শপথই নেওয়া হবে। তিনি বলেন, বিএনপি পরিষদের শপথ না নিয়ে জুলাই আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে এবং গণভোটের রায়কে অসম্মান করেছে।

এনসিপি বিএনপির অবস্থানের প্রতিবাদে সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার শপথ অনুষ্ঠান বয়কট করে। দলটির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া অভিযোগ করেন, গণভোটে জনরায়ের সঙ্গে প্রতারণা করে সরকার শপথ নিচ্ছে।

এদিকে গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের হয়েছে। জামায়াতের একাধিক নেতার সন্দেহ, এতে বিএনপির সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে। ফলে রাজনৈতিক বিরোধ এখন আইনি পরিসরেও বিস্তৃত হয়েছে।

জুলাই সনদে মোট ৪৮টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে ১৩টিতে বিএনপির 'নোট অব ডিসেন্ট' এবং সাতটিতে জামায়াতের আপত্তি ছিল। বিএনপির অবস্থান ছিল— যেসব প্রস্তাবে তারা আপত্তি জানিয়েছে, নির্বাচনে জয়ী হলে সেগুলো নিজেদের মতানুসারে বাস্তবায়ন করবে। অন্যদিকে জামায়াত-এনসিপি জোট চেয়েছে সনদের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন।

আদেশের ১০(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, পরিষদের কোরাম হবে ৬০ সদস্যের উপস্থিতিতে। বর্তমানে জামায়াত জোটসহ ৭৮ জন সদস্য শপথ নিয়েছেন। বিএনপি যোগ না দিলেও কোরাম পূরণ সম্ভব— তবে রাজনৈতিক বৈধতা ও সর্বদলীয় অংশগ্রহণের প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

সাবেক ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, জনগণের সার্বভৌম অভিপ্রায়ে জারি হওয়া আদেশ গণভোটে অনুমোদিত হয়েছে। শপথ না নেওয়ার মাধ্যমে অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা তৈরি হয়েছে।

পরিষদের সভা ৩০ দিনের মধ্যে আহ্বানের বিধান রয়েছে। বিএনপি যদি অবস্থান অপরিবর্তিত রাখে, তবে পরিষদ একতরফাভাবে এগোবে কি না— সেই সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে রাজনৈতিক উত্তরণ সহযোগিতামূলক হবে নাকি সংঘাতময়।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ