রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের বহু বছর পরও কেন একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকদের বড় অংশ মানসিকভাবে স্বাধীন হতে পারে না; বরং অন্য দেশ বা বড় রাষ্ট্রের প্রতি অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, এই প্রশ্ন আমাদের অনেকের মনেই বারবার জেগে ওঠে। আরও কষ্টের বিষয় হলো, এরা অনেকেই মুখে স্বাধীনতার কথা বলে ধোঁয়া তোলেন, কিন্তু নিজেরাই জানেন না যে মানসিকভাবে তারা অন্যের দাসত্বে আটকে আছেন।
মানসিক উপনিবেশবাদ: একটি বাস্তবতা
এটি শুধু আবেগের বিষয় নয়; বরং মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার ক্ষেত্র। একাডেমিক পরিভাষায় এই প্রবণতাকে কলোনিয়াল মেন্টালিটি বা মানসিক উপনিবেশবাদ, কালচারাল হেজেমনি, ইন্টারনালাইজড ইনফিরিওরিটি কিংবা সফট পাওয়ার ডমিনেন্স হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ রাজনৈতিকভাবে, ভৌগোলিকভাবে ও সাংবিধানিকভাবে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন থেকেই যায়—আমরা সবাই কি সত্যিকার অর্থে মানসিকভাবে স্বাধীন হতে পেরেছি?
ঔপনিবেশিক মানসিকতার উত্তরাধিকার
ফ্রান্টজ ফ্যাননের 'ব্ল্যাক স্কিন হোয়াইট মাস্ক' গ্রন্থে এ বিষয়ে গভীর ধারণা পাওয়া যায়। ফ্যানন দেখিয়েছেন, কীভাবে উপনিবেশিত জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে একসময় উপনিবেশকারীদের চোখ দিয়েই নিজেকে দেখতে শুরু করে। এমনকি, একপর্যায়ে তারা উপনিবেশকারীদের মূল্যবোধকে নিজের ভেতর আত্মস্থ করে ফেলে এবং নিজেদের সংস্কৃতি ও পরিচয়কে নিকৃষ্ট বলে ভাবতে শুরু করে।
দুঃখের বিষয়, এই মানসিক কাঠামো রাজনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে যায় না; বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, ১৯৪৭-এর ভারত-পাকিস্তান সৃষ্টি, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং এমনকি সাম্প্রতিক ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান এই মানসিকতাকে সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেলতে পারেনি।
শিক্ষাব্যবস্থায় জ্ঞানের হত্যাকাণ্ড
আমাদের দেশের অনেকের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক মাদরাসাশিক্ষার প্রতি এক ধরনের অবজ্ঞা লক্ষ করা যায়। অথচ অনেকেই জানি না যে ইউরোপে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার অনেক কাঠামো গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের মাদরাসাগুলোর বড় ভূমিকা ছিল।
পর্তুগিজ সমাজবিজ্ঞানী বোয়াভেন্তুরা দে সোসা সান্তোস এই প্রেক্ষাপটে 'এপিস্টেমিসাইড' শব্দটি ব্যবহার করেছেন, যার অর্থ দাঁড়ায় নিজস্ব জ্ঞানব্যবস্থার নীরব হত্যাকাণ্ড। যখন পরিকল্পিতভাবে স্থানীয় জ্ঞানকে মুছে ফেলে তার জায়গায় একটি প্রভাবশালী জ্ঞানব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন ভিন্ন কোনো চিন্তার টিকে থাকার সুযোগ আর থাকে না।
গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য
বিশ্বায়নের যুগে এই মানসিক প্রভাব বিস্তারের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো গণমাধ্যম। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, বিনোদনশিল্প, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নির্দিষ্ট কিছু রাষ্ট্রের জীবনধারা, ভোগসংস্কৃতি এবং মূল্যবোধকে 'স্বাভাবিক' ও 'আদর্শ' হিসেবে উপস্থাপন করে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই চিত্র নতুন নয়। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়েও সমাজের একটি অংশ এখনো নিজেদের সংস্কৃতি ও জীবনধারাকে তুচ্ছ করে প্রতিবেশী দেশের সংস্কৃতি এবং বিনোদনকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে।
ওরিয়েন্টালিজম ও সাংস্কৃতিক বয়ান
অ্যাডওয়ার্ড সাইদের ওরিয়েন্টালিজম বইয়ে দেখা যায়, প্রভাবশালী সংস্কৃতি অন্যকে 'অনুন্নত' করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব তৈরি করে এবং এই দৃষ্টিভঙ্গি রাজনৈতিক স্বাধীনতার পরও মানুষের চিন্তাজগতে টিকে থাকে।
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) কয়েকজন সদস্যের ক্ষেত্রে হিজাব পরিধানকে কেন্দ্র করে যে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি ও সমালোচনার কথা আলোচিত হয়েছে, তা শুধু ব্যক্তিগত অসহিষ্ণুতার উদাহরণ নয়। বরং এটি সেই গভীরভাবে প্রোথিত মানসিক আধিপত্যেরই প্রকাশ।
সমাধানের পথ
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা দরকার যে, অন্য দেশ থেকে ভালো কিছু শেখা, প্রযুক্তি গ্রহণ করা বা ভালো উদাহরণ অনুসরণ করা মানসিক দাসত্ব নয়। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা চীন পশ্চিমা জ্ঞান ও প্রযুক্তি গ্রহণ করেছে, কিন্তু নিজের আত্মবিশ্বাস বিসর্জন না দিয়ে বরং নিজেদের সংস্কৃতি ও পরিচয়কে আরো শক্তিশালী করেছে।
মানসিক পরাধীনতা কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; এটি একটি ঐতিহাসিক এবং কাঠামোগত সমস্যা। আর কাঠামোগত সমস্যার সমাধানও হতে হবে কাঠামোগত—শিক্ষা সংস্কারের মাধ্যমে নিজের ইতিহাস এবং সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দেওয়া, গবেষণার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা বাড়ানো এবং সর্বোপরি নিজের চোখে নিজেকে দেখার সাহস জাগানো।
বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত অগ্রগতির পথে দৃশ্যমানভাবে এগিয়ে চলেছে। কিন্তু মানসিক আত্মবিশ্বাস ছাড়া এ অগ্রগতি টেকসই হবে না। একটি দেশ তখনই সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হয়ে ওঠে, যখন সে নিজের সংস্কৃতি ও পরিচয়কে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ধারণ করতে পারে, অন্য কারোর মানদণ্ডে নিজেকে মাপার প্রয়োজন ছাড়াই।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের বহু বছর পরও কেন একটি স্বাধীন দেশের নাগরিকদের বড় অংশ মানসিকভাবে স্বাধীন হতে পারে না; বরং অন্য দেশ বা বড় রাষ্ট্রের প্রতি অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, এই প্রশ্ন আমাদের অনেকের মনেই বারবার জেগে ওঠে। আরও কষ্টের বিষয় হলো, এরা অনেকেই মুখে স্বাধীনতার কথা বলে ধোঁয়া তোলেন, কিন্তু নিজেরাই জানেন না যে মানসিকভাবে তারা অন্যের দাসত্বে আটকে আছেন।
মানসিক উপনিবেশবাদ: একটি বাস্তবতা
এটি শুধু আবেগের বিষয় নয়; বরং মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার ক্ষেত্র। একাডেমিক পরিভাষায় এই প্রবণতাকে কলোনিয়াল মেন্টালিটি বা মানসিক উপনিবেশবাদ, কালচারাল হেজেমনি, ইন্টারনালাইজড ইনফিরিওরিটি কিংবা সফট পাওয়ার ডমিনেন্স হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ রাজনৈতিকভাবে, ভৌগোলিকভাবে ও সাংবিধানিকভাবে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও, স্বাধীনতার ৫৪ বছর পরও একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন থেকেই যায়—আমরা সবাই কি সত্যিকার অর্থে মানসিকভাবে স্বাধীন হতে পেরেছি?
ঔপনিবেশিক মানসিকতার উত্তরাধিকার
ফ্রান্টজ ফ্যাননের 'ব্ল্যাক স্কিন হোয়াইট মাস্ক' গ্রন্থে এ বিষয়ে গভীর ধারণা পাওয়া যায়। ফ্যানন দেখিয়েছেন, কীভাবে উপনিবেশিত জনগোষ্ঠী ধীরে ধীরে একসময় উপনিবেশকারীদের চোখ দিয়েই নিজেকে দেখতে শুরু করে। এমনকি, একপর্যায়ে তারা উপনিবেশকারীদের মূল্যবোধকে নিজের ভেতর আত্মস্থ করে ফেলে এবং নিজেদের সংস্কৃতি ও পরিচয়কে নিকৃষ্ট বলে ভাবতে শুরু করে।
দুঃখের বিষয়, এই মানসিক কাঠামো রাজনৈতিক স্বাধীনতার সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে যায় না; বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে থাকে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, ১৯৪৭-এর ভারত-পাকিস্তান সৃষ্টি, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং এমনকি সাম্প্রতিক ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান এই মানসিকতাকে সম্পূর্ণরূপে মুছে ফেলতে পারেনি।
শিক্ষাব্যবস্থায় জ্ঞানের হত্যাকাণ্ড
আমাদের দেশের অনেকের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক মাদরাসাশিক্ষার প্রতি এক ধরনের অবজ্ঞা লক্ষ করা যায়। অথচ অনেকেই জানি না যে ইউরোপে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার অনেক কাঠামো গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের মাদরাসাগুলোর বড় ভূমিকা ছিল।
পর্তুগিজ সমাজবিজ্ঞানী বোয়াভেন্তুরা দে সোসা সান্তোস এই প্রেক্ষাপটে 'এপিস্টেমিসাইড' শব্দটি ব্যবহার করেছেন, যার অর্থ দাঁড়ায় নিজস্ব জ্ঞানব্যবস্থার নীরব হত্যাকাণ্ড। যখন পরিকল্পিতভাবে স্থানীয় জ্ঞানকে মুছে ফেলে তার জায়গায় একটি প্রভাবশালী জ্ঞানব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হয়, তখন ভিন্ন কোনো চিন্তার টিকে থাকার সুযোগ আর থাকে না।
গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য
বিশ্বায়নের যুগে এই মানসিক প্রভাব বিস্তারের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো গণমাধ্যম। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম, বিনোদনশিল্প, ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নির্দিষ্ট কিছু রাষ্ট্রের জীবনধারা, ভোগসংস্কৃতি এবং মূল্যবোধকে 'স্বাভাবিক' ও 'আদর্শ' হিসেবে উপস্থাপন করে।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই চিত্র নতুন নয়। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়েও সমাজের একটি অংশ এখনো নিজেদের সংস্কৃতি ও জীবনধারাকে তুচ্ছ করে প্রতিবেশী দেশের সংস্কৃতি এবং বিনোদনকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে।
ওরিয়েন্টালিজম ও সাংস্কৃতিক বয়ান
অ্যাডওয়ার্ড সাইদের ওরিয়েন্টালিজম বইয়ে দেখা যায়, প্রভাবশালী সংস্কৃতি অন্যকে 'অনুন্নত' করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব তৈরি করে এবং এই দৃষ্টিভঙ্গি রাজনৈতিক স্বাধীনতার পরও মানুষের চিন্তাজগতে টিকে থাকে।
সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) কয়েকজন সদস্যের ক্ষেত্রে হিজাব পরিধানকে কেন্দ্র করে যে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি ও সমালোচনার কথা আলোচিত হয়েছে, তা শুধু ব্যক্তিগত অসহিষ্ণুতার উদাহরণ নয়। বরং এটি সেই গভীরভাবে প্রোথিত মানসিক আধিপত্যেরই প্রকাশ।
সমাধানের পথ
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা দরকার যে, অন্য দেশ থেকে ভালো কিছু শেখা, প্রযুক্তি গ্রহণ করা বা ভালো উদাহরণ অনুসরণ করা মানসিক দাসত্ব নয়। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া কিংবা চীন পশ্চিমা জ্ঞান ও প্রযুক্তি গ্রহণ করেছে, কিন্তু নিজের আত্মবিশ্বাস বিসর্জন না দিয়ে বরং নিজেদের সংস্কৃতি ও পরিচয়কে আরো শক্তিশালী করেছে।
মানসিক পরাধীনতা কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; এটি একটি ঐতিহাসিক এবং কাঠামোগত সমস্যা। আর কাঠামোগত সমস্যার সমাধানও হতে হবে কাঠামোগত—শিক্ষা সংস্কারের মাধ্যমে নিজের ইতিহাস এবং সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দেওয়া, গবেষণার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, গণমাধ্যমের দায়িত্বশীলতা বাড়ানো এবং সর্বোপরি নিজের চোখে নিজেকে দেখার সাহস জাগানো।
বাংলাদেশ আজ অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত অগ্রগতির পথে দৃশ্যমানভাবে এগিয়ে চলেছে। কিন্তু মানসিক আত্মবিশ্বাস ছাড়া এ অগ্রগতি টেকসই হবে না। একটি দেশ তখনই সত্যিকার অর্থে স্বাধীন হয়ে ওঠে, যখন সে নিজের সংস্কৃতি ও পরিচয়কে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ধারণ করতে পারে, অন্য কারোর মানদণ্ডে নিজেকে মাপার প্রয়োজন ছাড়াই।

আপনার মতামত লিখুন