পাট ও পাটজাত পণ্য, চা ও চামড়াজাত দ্রব্য, চিংড়ি এবং তৈরি পোশাক শিল্প দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে। পোশাকের পর চামড়া শিল্প দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত হলেও এই খাত থেকে আয়ের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে খুবই কম। যেখানে পোশাক শিল্প থেকে বছরে প্রায় ৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হয়, সেখানে চামড়া খাতের আয় মাত্র প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষ জনশক্তির অভাব চামড়া শিল্পের বিকাশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ চামড়া শিল্প বাংলাদেশের একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ও গুরুত্বপূর্ণ খাত। সম্মিলিত উদ্যোগে এই খাতকে শুধু টিকিয়ে রাখাই নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য নতুনভাবে জাগিয়ে তোলা প্রয়োজন।
মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়ায় বাংলাদেশে প্রতি বছর পবিত্র ঈদুল আজহায় বিপুলসংখ্যক গরু, ছাগল, ভেড়া ও মহিষ কোরবানি দেওয়া হয়। পাশাপাশি সারা বছরই পশুর মাংসের বাণিজ্য চলমান থাকে। ফলে চামড়ার উৎপাদন ও সরবরাহ ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও আবহাওয়া গবাদিপশু পালনের জন্য অত্যন্ত অনুকূল হওয়ায় বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় এ দেশের চামড়ার গুণগত মান উন্নত বলে মনে করা হয়। এসব কারণ চামড়া শিল্প বিকাশে নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত খুলে দিচ্ছে।
রাষ্ট্র ও শিল্পপতিরা যদি ইতিবাচক ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসেন, তাহলে গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্য দিয়ে একটি সমৃদ্ধ নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এই লক্ষ্য সামনে রেখে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠন এবং গ্রামীণ বেকার জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক মুক্তির উদ্দেশ্যে সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার কালীগঞ্জ গ্রামের কৃতী সন্তান শিল্পপতি মো. মনওয়ারুল ইসলাম ২০১৭ সালে চরঘাটিনা ও এনায়েতপুর এলাকায় ফুলজোড় নদীর তীরঘেঁষে ১৩ বিঘা জমির ওপর স্থাপন করেন ১০০ শতাংশ রপ্তানিমুখী কারখানা ‘এম অ্যান্ড এম ট্রাভেলিং গুডস বিডি লিমিটেড’।
এই কারখানায় প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত প্রায় ১০০ জন পুরুষ ও ৪০০ জন নারী শ্রমিক কাজ করেন। শ্রমিকদের বেশিরভাগই পার্শ্ববর্তী গ্রাম ও উপজেলা থেকে এসে কাজ শেষে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যান।
কারখানাটি উল্লাপাড়া পৌরসভাধীন হলেও ঘাটিনা মূল পাকা রাস্তা থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। দীর্ঘদিন ধরে এই সংযোগ সড়কটি কাঁচা অবস্থায় রয়েছে। অথচ এই রাস্তা দিয়েই প্রতিদিন চরঘাটিনা গ্রামের সাধারণ মানুষ এবং প্রায় ৫০০ জন শ্রমিক চলাচল করেন। পাশাপাশি কারখানাটি শতভাগ রপ্তানিমুখী হওয়ায় প্রতি মাসে ফিটা, উলওয়ার্থ, জেসন, এম অ্যান্ড এস, টেস্কো, আমেরিকান, পেপকো, মাল্টিলাইনসহ বিভিন্ন বিদেশি ক্রেতা পরিদর্শনে আসেন। এ অবস্থায় শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত সড়কটি পাকা করার দাবি জানিয়েছেন।
কারখানায় উৎপাদিত চামড়ার ব্যাগ, ভ্রমণ সামগ্রী, চামড়ার জুতা ও বিভিন্ন অ্যাক্সেসরিজ চীন, জাপান, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, তুরস্ক, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে।
কারখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শ্রমিকদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা এলএফএমইএবি-এর নীতিমালা অনুসরণ করে প্রদান করা হয়। তবে কর্মরত শ্রমিকরা জানান, কারখানার উৎপাদন ও উন্নতি বাড়লে তাদের বেতন আরও বাড়ানো হলে তারা উপকৃত হবেন।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কারখানার পাশেই ফুলজোড় নদীর তীরবর্তী এলাকায় প্রচুর খাস জমি রয়েছে। শহরের নিকটবর্তী ও নদীতীরবর্তী এই স্থানে সরকারিভাবে একটি শিশু পার্ক নির্মাণ করা হলে শিশুদের বিনোদনের পাশাপাশি শিক্ষামূলক বিকাশ ঘটবে। একই সঙ্গে এলাকাটি পরিচিতি পাবে এবং উল্লাপাড়া উপজেলার সামগ্রিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে বলে তারা মনে করেন।

বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ জানুয়ারি ২০২৬
পাট ও পাটজাত পণ্য, চা ও চামড়াজাত দ্রব্য, চিংড়ি এবং তৈরি পোশাক শিল্প দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে। পোশাকের পর চামড়া শিল্প দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত হলেও এই খাত থেকে আয়ের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে খুবই কম। যেখানে পোশাক শিল্প থেকে বছরে প্রায় ৩৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হয়, সেখানে চামড়া খাতের আয় মাত্র প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষ জনশক্তির অভাব চামড়া শিল্পের বিকাশে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ চামড়া শিল্প বাংলাদেশের একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ও গুরুত্বপূর্ণ খাত। সম্মিলিত উদ্যোগে এই খাতকে শুধু টিকিয়ে রাখাই নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য নতুনভাবে জাগিয়ে তোলা প্রয়োজন।
মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়ায় বাংলাদেশে প্রতি বছর পবিত্র ঈদুল আজহায় বিপুলসংখ্যক গরু, ছাগল, ভেড়া ও মহিষ কোরবানি দেওয়া হয়। পাশাপাশি সারা বছরই পশুর মাংসের বাণিজ্য চলমান থাকে। ফলে চামড়ার উৎপাদন ও সরবরাহ ক্রমেই বাড়ছে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও আবহাওয়া গবাদিপশু পালনের জন্য অত্যন্ত অনুকূল হওয়ায় বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় এ দেশের চামড়ার গুণগত মান উন্নত বলে মনে করা হয়। এসব কারণ চামড়া শিল্প বিকাশে নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত খুলে দিচ্ছে।
রাষ্ট্র ও শিল্পপতিরা যদি ইতিবাচক ভূমিকা নিয়ে এগিয়ে আসেন, তাহলে গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের মধ্য দিয়ে একটি সমৃদ্ধ নতুন বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এই লক্ষ্য সামনে রেখে শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গঠন এবং গ্রামীণ বেকার জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক মুক্তির উদ্দেশ্যে সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার কালীগঞ্জ গ্রামের কৃতী সন্তান শিল্পপতি মো. মনওয়ারুল ইসলাম ২০১৭ সালে চরঘাটিনা ও এনায়েতপুর এলাকায় ফুলজোড় নদীর তীরঘেঁষে ১৩ বিঘা জমির ওপর স্থাপন করেন ১০০ শতাংশ রপ্তানিমুখী কারখানা ‘এম অ্যান্ড এম ট্রাভেলিং গুডস বিডি লিমিটেড’।
এই কারখানায় প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৫টা পর্যন্ত প্রায় ১০০ জন পুরুষ ও ৪০০ জন নারী শ্রমিক কাজ করেন। শ্রমিকদের বেশিরভাগই পার্শ্ববর্তী গ্রাম ও উপজেলা থেকে এসে কাজ শেষে নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যান।
কারখানাটি উল্লাপাড়া পৌরসভাধীন হলেও ঘাটিনা মূল পাকা রাস্তা থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। দীর্ঘদিন ধরে এই সংযোগ সড়কটি কাঁচা অবস্থায় রয়েছে। অথচ এই রাস্তা দিয়েই প্রতিদিন চরঘাটিনা গ্রামের সাধারণ মানুষ এবং প্রায় ৫০০ জন শ্রমিক চলাচল করেন। পাশাপাশি কারখানাটি শতভাগ রপ্তানিমুখী হওয়ায় প্রতি মাসে ফিটা, উলওয়ার্থ, জেসন, এম অ্যান্ড এস, টেস্কো, আমেরিকান, পেপকো, মাল্টিলাইনসহ বিভিন্ন বিদেশি ক্রেতা পরিদর্শনে আসেন। এ অবস্থায় শ্রমিক ও স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত সড়কটি পাকা করার দাবি জানিয়েছেন।
কারখানায় উৎপাদিত চামড়ার ব্যাগ, ভ্রমণ সামগ্রী, চামড়ার জুতা ও বিভিন্ন অ্যাক্সেসরিজ চীন, জাপান, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, তুরস্ক, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে।
কারখানা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শ্রমিকদের বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা এলএফএমইএবি-এর নীতিমালা অনুসরণ করে প্রদান করা হয়। তবে কর্মরত শ্রমিকরা জানান, কারখানার উৎপাদন ও উন্নতি বাড়লে তাদের বেতন আরও বাড়ানো হলে তারা উপকৃত হবেন।
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কারখানার পাশেই ফুলজোড় নদীর তীরবর্তী এলাকায় প্রচুর খাস জমি রয়েছে। শহরের নিকটবর্তী ও নদীতীরবর্তী এই স্থানে সরকারিভাবে একটি শিশু পার্ক নির্মাণ করা হলে শিশুদের বিনোদনের পাশাপাশি শিক্ষামূলক বিকাশ ঘটবে। একই সঙ্গে এলাকাটি পরিচিতি পাবে এবং উল্লাপাড়া উপজেলার সামগ্রিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে বলে তারা মনে করেন।

আপনার মতামত লিখুন