জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দুই বছর পার হলেও আন্দোলন-সংক্রান্ত মামলার ভয় ও আইনি অনিশ্চয়তা এখনো অনেক তরুণ–তরুণীর জীবনে স্থায়ী চাপ হিসেবে রয়ে গেছে। সেই প্রেক্ষাপটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে আয়োজিত আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির ১৯তম সভায় অবশেষে দায়মুক্তির নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত কেবল জুলাই যোদ্ধাদের জন্য আইনি সুরক্ষার পথই খুলে দিচ্ছে না, বরং সরকারের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতারও একটি সূচক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সভাপতি হিসেবে বৈঠকে নেতৃত্ব দেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী। তিনি জানান যে আন্দোলনের সময়কার বিশেষ পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত ঘটনাবলীর জন্য দায়মুক্তি প্রদানে সরকার নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশের নির্বাচন ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি মাথায় রেখে আইনি সুরক্ষার একটি সুস্পষ্ট কাঠামো প্রয়োজন। সেই অনুযায়ী আইন মন্ত্রণালয়কে দ্রুত দায়মুক্তির খসড়া অধ্যাদেশ প্রস্তুত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তার ভাষায়, “আইনশৃঙ্খলা দৃঢ় না হলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না—আর আইনি অনিশ্চয়তায় থাকা হাজারো তরুণের ভবিষ্যৎও অন্ধকারে থাকবে।”
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র সচিবসহ নিরাপত্তা ও প্রশাসনের বিভিন্ন শাখার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। বৈঠকে জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত মামলা, গ্রেপ্তার ও তদন্ত প্রক্রিয়া নিয়ে পর্যালোচনা করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে তাহরিমা জান্নাত সুরভী ও ছাত্রনেতা মাহদী হাসানের গ্রেপ্তার-জামিন বিতর্ক আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায়। উপদেষ্টারা মনে করেন, এই ধরনের গ্রেপ্তার আইনি অস্থিতিশীলতা বাড়ায় এবং সেই প্রেক্ষাপটই দায়মুক্তির দাবি আরও শক্তিশালী করেছে।
বৈঠকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজমের পূর্ববর্তী বক্তব্যও গুরুত্ব দিয়ে আলোচনায় আসে। তিনি এর আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, জুলাই আন্দোলনে আহতরা ‘জুলাই যোদ্ধা’ এবং নিহতরা ‘জুলাই শহীদ’ হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি পাবেন এবং তাদের পুনর্বাসন ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে আলাদা বিভাগ চালু করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, আহত যোদ্ধাদের চিকিৎসা, ভাতা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে, যা দায়মুক্তির সিদ্ধান্তের সাথে সমন্বিতভাবে কাজ করবে।
এদিকে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল আন্দোলন-সংক্রান্ত আইনি জটিলতা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে মন্তব্য করে আসছেন। তিনি বলেন, “আইনি স্বচ্ছতা ছাড়া পরিস্থিতি স্থিতিশীল হবে না। দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে সরকারের উচিত আন্দোলনে যুক্ত নিরীহ নাগরিকদের আইনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।” তার এই অবস্থানও দায়মুক্তির উদ্যোগকে আরও বেগবান করেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
সভায় অংশ নেওয়া উপদেষ্টারা এও ইঙ্গিত দিয়েছেন যে দায়মুক্তি অধ্যাদেশটি ১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধাদের দায়মুক্তি আইন বা অন্যান্য দেশের গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী আইনি কাঠামো থেকে অনুপ্রাণিত হতে পারে। তাদের মতে, রাজনৈতিক অস্থিরতার পর রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো নাগরিকদের বিরুদ্ধে দায়মুক্তি প্রদান করে একটি নিরবচ্ছিন্ন ও সমঝোতাপূর্ণ ভবিষ্যৎ তৈরি করা।
সব মিলিয়ে আজকের এই বৈঠক জুলাই যোদ্ধাদের জন্য একটি বড় অগ্রগতি। অধ্যাদেশের খসড়া আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই প্রস্তুত হলে এটি দেশের রাজনৈতিক ও আইনি প্রেক্ষাপটে একটি নতুন অধ্যায় সূচনা করতে পারে, যা হাজারো আন্দোলনকারী তরুণের ভবিষ্যৎকে স্থায়ীভাবে বদলে দেবে।
আপনার মতামত লিখুন