মোঃ রিপন শেখ ভাঙ্গা (ফরিদপুর) প্রতিনিধি:
যে বয়সে একজন বৃদ্ধার থাকার কথা আপন ঘরের নিরাপদ চার দেয়ালের ভেতর, সন্তান-স্বজনের পাশে বসে শেষ জীবনটা একটু শান্তিতে কাটানোর কথা—সেই বয়সে ৭০ বছরের খাদিজা বেগমের হাতে ছোনের বোঝা।
সকালে ঘুম থেকে উঠে তার সামনে থাকে না রান্নাঘরে সাজানো খাবার, থাকে না নিজের ঘরে ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তা। ক্ষুধার তাড়নায় তাকে বের হতে হয় রেললাইনের পাশ থেকে ছোন কুড়িয়ে আনতে। কারণ, বয়স ৭০ হলেও ক্ষুধার কাছে বয়সের কোনো মূল্য নেই।
ফরিদপুরের ভাঙ্গা পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের আতাদী গ্রামের বাসিন্দা খাদিজা বেগম। তিনি মৃত শেখ রমজানের স্ত্রী। নিজের কোনো ঘর নেই, নেই জমি-জমা। নেই নিয়মিত কোনো আয়। এমনকি সরকারি বয়স্ক ভাতা কিংবা বিধবা ভাতাও পান না তিনি।
রেললাইনের পাশ থেকে ছোন সংগ্রহ করে তা বিক্রি করেই কোনো রকমে দিন কাটান খাদিজা। এক মণ ছোন সংগ্রহ করতে তার প্রায় এক মাস লেগে যায়। সেই ছোন বিক্রি করে হাতে আসে মাত্র প্রায় এক হাজার টাকা।
এক হাজার টাকা দিয়ে কি এক মাসের খাবার চলে?
চলে না।
তাই কখনো এক বেলা খাবার জোটে, আবার কখনো খাবার ছাড়াই কাটাতে হয় দিন। পেটের ক্ষুধা আর জীবনের অসহায়ত্ব নিয়েই দিনের পর দিন চলছে তার বেঁচে থাকার লড়াই।
বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছে। তবুও থামেনি তার পথচলা। মাথায় কিংবা হাতে ছোনের বোঝা নিয়ে রেললাইনের পাশ দিয়ে হাঁটতে হয় তাকে।
যে হাতে এখন নাতি-নাতনিদের মাথায় স্নেহের পরশ দেওয়ার কথা, সেই হাতেই আজ জীবিকার জন্য ছোন কুড়াতে হয়।
স্থানীয়রা জানান, খাদিজা বেগমের এক ছেলে ও দুই মেয়ে। ছেলে ভ্যান চালিয়ে নিজের সংসার চালান। বড় মেয়ে অনেক আগে মারা গেছেন। অপর মেয়ের স্বামীও প্রায় দুই বছর আগে মারা গেছেন। ওই মেয়ের রয়েছে ৪ জন কন্যা সন্তান।
নিজের থাকার মতো একটি ঘর না থাকায় অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েই দিন কাটছে খাদিজার।
জীবনের এতটা পথ পেরিয়ে এসে খাদিজার চাওয়া খুব বেশি কিছু নয়। তিনি চান না বড় বাড়ি, চান না বিলাসী জীবন। তার চাওয়া শুধু একটি ছোট নিরাপদ ঘর, দুবেলা খাবার আর জীবনের শেষ দিনগুলো একটু শান্তিতে কাটানোর সুযোগ।
একটি ঘর হয়তো অনেকের কাছে সামান্য ব্যাপার। কিন্তু খাদিজার কাছে সেই ঘরই হতে পারে পুরো পৃথিবী। বৃষ্টির রাতে যেখানে মাথার ওপর ছাদ থাকবে, শীতের রাতে থাকবে একটু উষ্ণতা, আর রাত হলে থাকবে নিশ্চিন্তে ঘুমানোর জায়গা।
স্থানীয়দের দাবি, সরকারি সহায়তার আওতায় দ্রুত খাদিজা বেগমকে বয়স্ক বা বিধবা ভাতা এবং একটি নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হোক। পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদেরও তার পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
খাদিজা হয়তো কারও কাছে সাহায্যের জন্য হাত বাড়াতে পারেন না। কিন্তু তার নুয়ে পড়া শরীর, রেললাইনের পাশ থেকে কুড়িয়ে আনা ছোনের বোঝা আর অনিশ্চিত জীবনের গল্পটাই যেন নীরবে সাহায্যের আবেদন জানাচ্ছে।
একজন ৭০ বছরের বৃদ্ধার জীবনের শেষ সময়ে যদি নিজের একটি ঘর না থাকে, খাবারের নিশ্চয়তা না থাকে—তাহলে আমাদের সমাজের মানবিকতার জায়গাটি কোথায়?
খাদিজার চোখের জল হয়তো শুকিয়ে যাবে। কিন্তু তার জীবনের এই কষ্টের গল্প যেন আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করতেই থাকবে—
“জীবনের শেষ বয়সে এসেও কি একটু আশ্রয় পাওয়ার অধিকার তার নেই।

বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মোঃ রিপন শেখ ভাঙ্গা (ফরিদপুর) প্রতিনিধি:
যে বয়সে একজন বৃদ্ধার থাকার কথা আপন ঘরের নিরাপদ চার দেয়ালের ভেতর, সন্তান-স্বজনের পাশে বসে শেষ জীবনটা একটু শান্তিতে কাটানোর কথা—সেই বয়সে ৭০ বছরের খাদিজা বেগমের হাতে ছোনের বোঝা।
সকালে ঘুম থেকে উঠে তার সামনে থাকে না রান্নাঘরে সাজানো খাবার, থাকে না নিজের ঘরে ফিরে যাওয়ার নিশ্চয়তা। ক্ষুধার তাড়নায় তাকে বের হতে হয় রেললাইনের পাশ থেকে ছোন কুড়িয়ে আনতে। কারণ, বয়স ৭০ হলেও ক্ষুধার কাছে বয়সের কোনো মূল্য নেই।
ফরিদপুরের ভাঙ্গা পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের আতাদী গ্রামের বাসিন্দা খাদিজা বেগম। তিনি মৃত শেখ রমজানের স্ত্রী। নিজের কোনো ঘর নেই, নেই জমি-জমা। নেই নিয়মিত কোনো আয়। এমনকি সরকারি বয়স্ক ভাতা কিংবা বিধবা ভাতাও পান না তিনি।
রেললাইনের পাশ থেকে ছোন সংগ্রহ করে তা বিক্রি করেই কোনো রকমে দিন কাটান খাদিজা। এক মণ ছোন সংগ্রহ করতে তার প্রায় এক মাস লেগে যায়। সেই ছোন বিক্রি করে হাতে আসে মাত্র প্রায় এক হাজার টাকা।
এক হাজার টাকা দিয়ে কি এক মাসের খাবার চলে?
চলে না।
তাই কখনো এক বেলা খাবার জোটে, আবার কখনো খাবার ছাড়াই কাটাতে হয় দিন। পেটের ক্ষুধা আর জীবনের অসহায়ত্ব নিয়েই দিনের পর দিন চলছে তার বেঁচে থাকার লড়াই।
বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছে। তবুও থামেনি তার পথচলা। মাথায় কিংবা হাতে ছোনের বোঝা নিয়ে রেললাইনের পাশ দিয়ে হাঁটতে হয় তাকে।
যে হাতে এখন নাতি-নাতনিদের মাথায় স্নেহের পরশ দেওয়ার কথা, সেই হাতেই আজ জীবিকার জন্য ছোন কুড়াতে হয়।
স্থানীয়রা জানান, খাদিজা বেগমের এক ছেলে ও দুই মেয়ে। ছেলে ভ্যান চালিয়ে নিজের সংসার চালান। বড় মেয়ে অনেক আগে মারা গেছেন। অপর মেয়ের স্বামীও প্রায় দুই বছর আগে মারা গেছেন। ওই মেয়ের রয়েছে ৪ জন কন্যা সন্তান।
নিজের থাকার মতো একটি ঘর না থাকায় অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েই দিন কাটছে খাদিজার।
জীবনের এতটা পথ পেরিয়ে এসে খাদিজার চাওয়া খুব বেশি কিছু নয়। তিনি চান না বড় বাড়ি, চান না বিলাসী জীবন। তার চাওয়া শুধু একটি ছোট নিরাপদ ঘর, দুবেলা খাবার আর জীবনের শেষ দিনগুলো একটু শান্তিতে কাটানোর সুযোগ।
একটি ঘর হয়তো অনেকের কাছে সামান্য ব্যাপার। কিন্তু খাদিজার কাছে সেই ঘরই হতে পারে পুরো পৃথিবী। বৃষ্টির রাতে যেখানে মাথার ওপর ছাদ থাকবে, শীতের রাতে থাকবে একটু উষ্ণতা, আর রাত হলে থাকবে নিশ্চিন্তে ঘুমানোর জায়গা।
স্থানীয়দের দাবি, সরকারি সহায়তার আওতায় দ্রুত খাদিজা বেগমকে বয়স্ক বা বিধবা ভাতা এবং একটি নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হোক। পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদেরও তার পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
খাদিজা হয়তো কারও কাছে সাহায্যের জন্য হাত বাড়াতে পারেন না। কিন্তু তার নুয়ে পড়া শরীর, রেললাইনের পাশ থেকে কুড়িয়ে আনা ছোনের বোঝা আর অনিশ্চিত জীবনের গল্পটাই যেন নীরবে সাহায্যের আবেদন জানাচ্ছে।
একজন ৭০ বছরের বৃদ্ধার জীবনের শেষ সময়ে যদি নিজের একটি ঘর না থাকে, খাবারের নিশ্চয়তা না থাকে—তাহলে আমাদের সমাজের মানবিকতার জায়গাটি কোথায়?
খাদিজার চোখের জল হয়তো শুকিয়ে যাবে। কিন্তু তার জীবনের এই কষ্টের গল্প যেন আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করতেই থাকবে—
“জীবনের শেষ বয়সে এসেও কি একটু আশ্রয় পাওয়ার অধিকার তার নেই।

আপনার মতামত লিখুন