আতাহার আলীর দাবি ‘আমি কোনো অভিযোগ করিনি, আমার নাম-পরিচয় ব্যবহার করে জালিয়াতি করা হয়েছে’
নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার রসুলপুর পাড়ইল ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা (নায়েব) মোঃ মাহবুব আলম ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে ঘুষ, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তুলে সম্প্রতি একটি লিখিত অভিযোগের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি নতুন মোড় নিয়েছে। অভিযোগে যাকে ভুক্তভোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, সেই মোঃ আতাহার আলী (পল্টু) সরাসরি দাবি করেছেন তিনি এ ধরনের কোনো লিখিত কিংবা মৌখিক অভিযোগ কখনো দেননি।
আতাহার আলীর দাবি, তার নাম, পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে কে বা কারা তার অজ্ঞাতে একটি অভিযোগ তৈরি করে নায়েব ও এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে দাখিল করেছে। বিষয়টি জানার পর তিনি নিজেই ওই অভিযোগের পেছনে থাকা ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন বলেও দাবি করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি একজন দালাল, যার বিষয়ে তিনি জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিতভাবে অবহিত করবেন।
অভিযোগে বলা হয়েছিল, আতাহার আলীর স্ত্রী মোছাঃ হাফসা বেগমের জমির অনলাইন খাজনা পরিশোধের ক্ষেত্রে নায়েব মাহবুব আলমের পক্ষ থেকে বহিরাগত এক ব্যক্তির মাধ্যমে ৩৬ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করা হয়েছিল। এমনকি ওই অর্থের একটি অংশ এসিল্যান্ডকে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। তবে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন আতাহার আলী।
তিনি বলেন, “আমি কোনো লিখিত অভিযোগ দিইনি, এমনকি মৌখিকভাবেও কোনো অভিযোগ করিনি। আমার নাম-পরিচয় ব্যবহার করে কে বা কারা জালিয়াতির মাধ্যমে এই অভিযোগ করেছে, তা আমি জানতে পেরেছি। আমি ভূমি অফিসে গিয়ে কোনো হয়রানি ছাড়াই সেবা পেয়েছি। আমাকে কোনো ঘুষ বা অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়নি।”
আতাহার আলী আরও বলেন, তার নাম ব্যবহার করে দায়ের করা অভিযোগের বিষয়টি তিনি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিতভাবে জানাবেন এবং তার নাম ব্যবহার করে যারা এমন অভিযোগ করেছে, তাদের বিষয়ে তদন্তের দাবি জানাবেন বলেও জানান তিনি।
তার ভাষ্য, “যে ব্যক্তি অভিযোগটি দিয়েছে তাকে আমি শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছি। তিনি একজন দালাল। তার বিষয়ে জেলা প্রশাসক স্যারকে লিখিতভাবে জানাবো।”
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে রসুলপুর পাড়ইল ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মোঃ মাহবুব আলমের সঙ্গে কথা হলে তিনিও ঘুষ চাওয়া বা অতিরিক্ত অর্থ দাবি করার অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন।
মাহবুব আলম বলেন, “ঘুষ চাওয়া বা কারও কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা দাবি করার কোনো বিষয়ই নেই। অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।” তিনি দাবি করেন, মূল বিরোধের সূত্রপাত আব্দুল কাইয়ুম নামে এক ব্যক্তির একটি জমি সংক্রান্ত বিষয়কে কেন্দ্র করে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, আব্দুল কাইয়ুম তার কাছে একটি হাইকোর্টের মামলা চলমান থাকার বিষয়টি গোপন করে নামজারি সম্পন্ন করেছিলেন। পরবর্তীতে অপরপক্ষ ওই নামজারির বিরুদ্ধে মিস কেস করলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় হাইকোর্টে মামলা চলমান থাকার বিষয়টি তিনি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন।
মাহবুব আলম বলেন, “আমি মিস কেসের প্রতিবেদনে হাইকোর্টে মামলা চলমান থাকার বিষয়টি রেফারেন্স হিসেবে উল্লেখ করেছি এবং বিষয়টি বিচারাধীন বলে প্রতিবেদনে জানিয়েছি। কেন আমি প্রতিবেদনে মামলা চলমান থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেছি এ নিয়েই আব্দুল কাইয়ুম তার ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে আমার বিরুদ্ধে এবং এসিল্যান্ড স্যারকে জড়িয়ে মিথ্যা প্রপাগান্ডা চালাচ্ছেন বলে আমি জানতে পেরেছি।”
তিনি আরও বলেন, তার বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে অভিযোগ তোলা হলেও তিনি কোনো অন্যায় করেননি এবং তদন্ত হলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে। “আমি অন্যায় করিনি। এতটুকু ভরসা আমার আছে যে, সুষ্ঠু তদন্ত হলে আমি নির্দোষ প্রমাণিত হব,” বলেন মাহবুব আলম।
সেবাগ্রহীতাদের বক্তব্যেও মিলল ভিন্ন চিত্র। অভিযোগে ভূমি অফিসে ঘুষ, হয়রানি ও দালালচক্রের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, সরেজমিনে স্থানীয় কয়েকজন সেবাগ্রহীতার সঙ্গে কথা বললে তাদের বক্তব্যে এর ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়।
ওই এলাকার প্রায় ৬০ একর জমির মালিক এক সেবাগ্রহীতা জানান, আমরা ছয় ভাই আমাদের জমি সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রয়োজনে মাঝেমধ্যেই ভূমি অফিসে যেতে হয়। নামজারি, খাজনা কিংবা অন্যান্য ভূমিসেবা নিতে গিয়ে এখন পর্যন্ত তিনি কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হননি বলে জানান। তার ভাষ্য, “জমির খাজনা-খারিজের বিষয়ে মাঝেমধ্যেই ভূমি অফিসে আসি। কখনো হয়রানির শিকার হইনি। অতিরিক্ত টাকা দেওয়ার বিষয়ও ঘটেনি।”
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ভূমি সংক্রান্ত অনেক সেবার অর্থ অনলাইনে পরিশোধ করা হয়। ফলে সরাসরি হাতে টাকা দেওয়ার সুযোগও আগের মতো এখন নেই।
ভূমি অফিসের কাছাকাছি বসবাসকারী জিল্লুর রহমান নামক এক সেবাগ্রহীতা জানান, ভূমি অফিসের পাশেই তার বাড়ি এবং নিয়মিত ভূমি অফিসের কার্যক্রম দেখতে পান। তিনি বলেন, “ভূমি অফিসের পাশেই নিজস্ব বাড়ি হওয়ার সুবাদে এবং অফিস সংলগ্ন নিজস্ব একটি মার্কেট থাকায় আশ পাশেই বেশিরভাগ সময় থাকা হয়। কখনো টাকা-পয়সা সংক্রান্ত বিষয়ে কারও সঙ্গে ঝামেলা হয়েছে বলে দেখিনি। নিজের জমির খাজনা-খারিজের কাজ করতেও অতিরিক্ত কোনো টাকা দিতে হয়নি এবং হয়রানির শিকারও হইনি।”
দামকুড়া এলাকার সালেক নামক এক সেবাগ্রহীতা জানান, প্রায় দুই মাস আগে তার একটি জমির নামজারি সম্পন্ন হয়েছে। পরবর্তীতে তিনি অনলাইনের মাধ্যমে খাজনাও পরিশোধ করেছেন। তিনি বলেন, “আমার একটি জমির খারিজ প্রায় দুই মাস আগে সম্পন্ন হয়েছে। পরে অনলাইনের মাধ্যমে খাজনা দিয়েছি। এ সময় কোনো হয়রানির শিকার হইনি। খাজনা খারিজের টাকাও অনলাইনের মাধ্যমেই দিয়েছি।”
ভূমি অফিসসংলগ্ন এলাকার এক কম্পিউটার দোকানদার জানান, প্রতিদিনই বিভিন্ন মানুষ তাদের দোকানে এসে ভূমি সংক্রান্ত বিভিন্ন সেবার জন্য অনলাইনে আবেদন করেন। আবেদন শেষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ভূমি অফিসে জমা দেন সেবাগ্রহীতারা। তিনি বলেন, “আমাদের কাছে প্রতিনিয়ত মানুষ আসে অনলাইনে আবেদন করার জন্য। পরে প্রয়োজনীয় নথি অফিসে জমা দেয়। মাঝখানে দালাল, হয়রানি বা অতিরিক্ত টাকা-পয়সার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কেউ আমাদের কাছে অভিযোগ করেনি। আমরাও ভূমি অফিসে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার বিষয়টি দেখিনি।”
তবে তিনি বলেন, কারও পক্ষ থেকে যদি এমন অভিযোগ করা হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা উচিত। কারণ অভিযোগটি সত্য নাকি মিথ্যা তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
একদিকে লিখিত অভিযোগে নায়েব ও এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে, অন্যদিকে অভিযোগে ভুক্তভোগী হিসেবে উল্লেখ করা আতাহার আলী নিজেই সেই অভিযোগের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন। একই সঙ্গে স্থানীয় কয়েকজন সেবাগ্রহীতাও ভূমি অফিসে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান বা হয়রানির অভিজ্ঞতা নেই বলে জানিয়েছেন।
এ অবস্থায় অভিযোগটির প্রকৃত উৎস, অভিযোগপত্রে ব্যবহৃত তথ্যের সত্যতা এবং অভিযোগকারীর পরিচয় সবকিছুই নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষ করে আতাহার আলী যদি সত্যিই অভিযোগটি না দিয়ে থাকেন, তাহলে তার নাম ও পরিচয় ব্যবহার করে কে বা কারা অভিযোগটি তৈরি ও দাখিল করেছে এবং এর পেছনে কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ বা উদ্দেশ্য ছিল কি না তা তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসা জরুরি।
অন্যদিকে নায়েব মাহবুব আলমের বিরুদ্ধে কোনো অনিয়ম বা ঘুষ দাবির অভিযোগ সত্য হলে তারও যথাযথ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগ সত্য কিংবা মিথ্যা কোনো পক্ষের বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, আবেদন প্রক্রিয়া, সরকারি রেকর্ড এবং প্রত্যক্ষ প্রমাণ যাচাইয়ের মাধ্যমেই প্রকৃত ঘটনা সামনে আসতে পারে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা হবে এমন প্রত্যাশা স্থানীয় সচেতন মহলের।
উক্ত বিষয়ে নওগাঁর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জান্নাত আরা তিথি বলেন, উক্ত অভিযোগের বিষয়টি তদন্তাধীন। অভিযোগকারী অভিযোগ করেছেন কিনা বা কেউ উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে অভিযোগ দায়ের করেছেন কিনা এবং অভিযোগের সত্যতা রয়েছে কিনা তদন্ত শেষে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। তদন্ত শেষে বিধি মোতাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
আতাহার আলীর দাবি ‘আমি কোনো অভিযোগ করিনি, আমার নাম-পরিচয় ব্যবহার করে জালিয়াতি করা হয়েছে’
নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার রসুলপুর পাড়ইল ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা (নায়েব) মোঃ মাহবুব আলম ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোঃ রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে ঘুষ, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ তুলে সম্প্রতি একটি লিখিত অভিযোগের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর বিষয়টি নতুন মোড় নিয়েছে। অভিযোগে যাকে ভুক্তভোগী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, সেই মোঃ আতাহার আলী (পল্টু) সরাসরি দাবি করেছেন তিনি এ ধরনের কোনো লিখিত কিংবা মৌখিক অভিযোগ কখনো দেননি।
আতাহার আলীর দাবি, তার নাম, পরিচয় ও ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহার করে কে বা কারা তার অজ্ঞাতে একটি অভিযোগ তৈরি করে নায়েব ও এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে দাখিল করেছে। বিষয়টি জানার পর তিনি নিজেই ওই অভিযোগের পেছনে থাকা ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন বলেও দাবি করেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি একজন দালাল, যার বিষয়ে তিনি জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিতভাবে অবহিত করবেন।
অভিযোগে বলা হয়েছিল, আতাহার আলীর স্ত্রী মোছাঃ হাফসা বেগমের জমির অনলাইন খাজনা পরিশোধের ক্ষেত্রে নায়েব মাহবুব আলমের পক্ষ থেকে বহিরাগত এক ব্যক্তির মাধ্যমে ৩৬ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করা হয়েছিল। এমনকি ওই অর্থের একটি অংশ এসিল্যান্ডকে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। তবে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন আতাহার আলী।
তিনি বলেন, “আমি কোনো লিখিত অভিযোগ দিইনি, এমনকি মৌখিকভাবেও কোনো অভিযোগ করিনি। আমার নাম-পরিচয় ব্যবহার করে কে বা কারা জালিয়াতির মাধ্যমে এই অভিযোগ করেছে, তা আমি জানতে পেরেছি। আমি ভূমি অফিসে গিয়ে কোনো হয়রানি ছাড়াই সেবা পেয়েছি। আমাকে কোনো ঘুষ বা অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়নি।”
আতাহার আলী আরও বলেন, তার নাম ব্যবহার করে দায়ের করা অভিযোগের বিষয়টি তিনি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিতভাবে জানাবেন এবং তার নাম ব্যবহার করে যারা এমন অভিযোগ করেছে, তাদের বিষয়ে তদন্তের দাবি জানাবেন বলেও জানান তিনি।
তার ভাষ্য, “যে ব্যক্তি অভিযোগটি দিয়েছে তাকে আমি শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছি। তিনি একজন দালাল। তার বিষয়ে জেলা প্রশাসক স্যারকে লিখিতভাবে জানাবো।”
এদিকে অভিযোগের বিষয়ে রসুলপুর পাড়ইল ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা মোঃ মাহবুব আলমের সঙ্গে কথা হলে তিনিও ঘুষ চাওয়া বা অতিরিক্ত অর্থ দাবি করার অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন।
মাহবুব আলম বলেন, “ঘুষ চাওয়া বা কারও কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা দাবি করার কোনো বিষয়ই নেই। অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন।” তিনি দাবি করেন, মূল বিরোধের সূত্রপাত আব্দুল কাইয়ুম নামে এক ব্যক্তির একটি জমি সংক্রান্ত বিষয়কে কেন্দ্র করে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, আব্দুল কাইয়ুম তার কাছে একটি হাইকোর্টের মামলা চলমান থাকার বিষয়টি গোপন করে নামজারি সম্পন্ন করেছিলেন। পরবর্তীতে অপরপক্ষ ওই নামজারির বিরুদ্ধে মিস কেস করলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় হাইকোর্টে মামলা চলমান থাকার বিষয়টি তিনি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন।
মাহবুব আলম বলেন, “আমি মিস কেসের প্রতিবেদনে হাইকোর্টে মামলা চলমান থাকার বিষয়টি রেফারেন্স হিসেবে উল্লেখ করেছি এবং বিষয়টি বিচারাধীন বলে প্রতিবেদনে জানিয়েছি। কেন আমি প্রতিবেদনে মামলা চলমান থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেছি এ নিয়েই আব্দুল কাইয়ুম তার ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে আমার বিরুদ্ধে এবং এসিল্যান্ড স্যারকে জড়িয়ে মিথ্যা প্রপাগান্ডা চালাচ্ছেন বলে আমি জানতে পেরেছি।”
তিনি আরও বলেন, তার বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে অভিযোগ তোলা হলেও তিনি কোনো অন্যায় করেননি এবং তদন্ত হলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে। “আমি অন্যায় করিনি। এতটুকু ভরসা আমার আছে যে, সুষ্ঠু তদন্ত হলে আমি নির্দোষ প্রমাণিত হব,” বলেন মাহবুব আলম।
সেবাগ্রহীতাদের বক্তব্যেও মিলল ভিন্ন চিত্র। অভিযোগে ভূমি অফিসে ঘুষ, হয়রানি ও দালালচক্রের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, সরেজমিনে স্থানীয় কয়েকজন সেবাগ্রহীতার সঙ্গে কথা বললে তাদের বক্তব্যে এর ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়।
ওই এলাকার প্রায় ৬০ একর জমির মালিক এক সেবাগ্রহীতা জানান, আমরা ছয় ভাই আমাদের জমি সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রয়োজনে মাঝেমধ্যেই ভূমি অফিসে যেতে হয়। নামজারি, খাজনা কিংবা অন্যান্য ভূমিসেবা নিতে গিয়ে এখন পর্যন্ত তিনি কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হননি বলে জানান। তার ভাষ্য, “জমির খাজনা-খারিজের বিষয়ে মাঝেমধ্যেই ভূমি অফিসে আসি। কখনো হয়রানির শিকার হইনি। অতিরিক্ত টাকা দেওয়ার বিষয়ও ঘটেনি।”
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে ভূমি সংক্রান্ত অনেক সেবার অর্থ অনলাইনে পরিশোধ করা হয়। ফলে সরাসরি হাতে টাকা দেওয়ার সুযোগও আগের মতো এখন নেই।
ভূমি অফিসের কাছাকাছি বসবাসকারী জিল্লুর রহমান নামক এক সেবাগ্রহীতা জানান, ভূমি অফিসের পাশেই তার বাড়ি এবং নিয়মিত ভূমি অফিসের কার্যক্রম দেখতে পান। তিনি বলেন, “ভূমি অফিসের পাশেই নিজস্ব বাড়ি হওয়ার সুবাদে এবং অফিস সংলগ্ন নিজস্ব একটি মার্কেট থাকায় আশ পাশেই বেশিরভাগ সময় থাকা হয়। কখনো টাকা-পয়সা সংক্রান্ত বিষয়ে কারও সঙ্গে ঝামেলা হয়েছে বলে দেখিনি। নিজের জমির খাজনা-খারিজের কাজ করতেও অতিরিক্ত কোনো টাকা দিতে হয়নি এবং হয়রানির শিকারও হইনি।”
দামকুড়া এলাকার সালেক নামক এক সেবাগ্রহীতা জানান, প্রায় দুই মাস আগে তার একটি জমির নামজারি সম্পন্ন হয়েছে। পরবর্তীতে তিনি অনলাইনের মাধ্যমে খাজনাও পরিশোধ করেছেন। তিনি বলেন, “আমার একটি জমির খারিজ প্রায় দুই মাস আগে সম্পন্ন হয়েছে। পরে অনলাইনের মাধ্যমে খাজনা দিয়েছি। এ সময় কোনো হয়রানির শিকার হইনি। খাজনা খারিজের টাকাও অনলাইনের মাধ্যমেই দিয়েছি।”
ভূমি অফিসসংলগ্ন এলাকার এক কম্পিউটার দোকানদার জানান, প্রতিদিনই বিভিন্ন মানুষ তাদের দোকানে এসে ভূমি সংক্রান্ত বিভিন্ন সেবার জন্য অনলাইনে আবেদন করেন। আবেদন শেষে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ভূমি অফিসে জমা দেন সেবাগ্রহীতারা। তিনি বলেন, “আমাদের কাছে প্রতিনিয়ত মানুষ আসে অনলাইনে আবেদন করার জন্য। পরে প্রয়োজনীয় নথি অফিসে জমা দেয়। মাঝখানে দালাল, হয়রানি বা অতিরিক্ত টাকা-পয়সার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কেউ আমাদের কাছে অভিযোগ করেনি। আমরাও ভূমি অফিসে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার বিষয়টি দেখিনি।”
তবে তিনি বলেন, কারও পক্ষ থেকে যদি এমন অভিযোগ করা হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি তদন্ত করে দেখা উচিত। কারণ অভিযোগটি সত্য নাকি মিথ্যা তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
একদিকে লিখিত অভিযোগে নায়েব ও এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলা হয়েছে, অন্যদিকে অভিযোগে ভুক্তভোগী হিসেবে উল্লেখ করা আতাহার আলী নিজেই সেই অভিযোগের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন। একই সঙ্গে স্থানীয় কয়েকজন সেবাগ্রহীতাও ভূমি অফিসে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান বা হয়রানির অভিজ্ঞতা নেই বলে জানিয়েছেন।
এ অবস্থায় অভিযোগটির প্রকৃত উৎস, অভিযোগপত্রে ব্যবহৃত তথ্যের সত্যতা এবং অভিযোগকারীর পরিচয় সবকিছুই নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষ করে আতাহার আলী যদি সত্যিই অভিযোগটি না দিয়ে থাকেন, তাহলে তার নাম ও পরিচয় ব্যবহার করে কে বা কারা অভিযোগটি তৈরি ও দাখিল করেছে এবং এর পেছনে কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ বা উদ্দেশ্য ছিল কি না তা তদন্তের মাধ্যমে বেরিয়ে আসা জরুরি।
অন্যদিকে নায়েব মাহবুব আলমের বিরুদ্ধে কোনো অনিয়ম বা ঘুষ দাবির অভিযোগ সত্য হলে তারও যথাযথ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগ সত্য কিংবা মিথ্যা কোনো পক্ষের বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, আবেদন প্রক্রিয়া, সরকারি রেকর্ড এবং প্রত্যক্ষ প্রমাণ যাচাইয়ের মাধ্যমেই প্রকৃত ঘটনা সামনে আসতে পারে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা হবে এমন প্রত্যাশা স্থানীয় সচেতন মহলের।
উক্ত বিষয়ে নওগাঁর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জান্নাত আরা তিথি বলেন, উক্ত অভিযোগের বিষয়টি তদন্তাধীন। অভিযোগকারী অভিযোগ করেছেন কিনা বা কেউ উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে অভিযোগ দায়ের করেছেন কিনা এবং অভিযোগের সত্যতা রয়েছে কিনা তদন্ত শেষে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। তদন্ত শেষে বিধি মোতাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

আপনার মতামত লিখুন