ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

২০৫০ সালের লক্ষ্য ঝুঁকিতে

নীতিগত অবহেলায় পিছিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি : টিআইবি


নিজস্ব প্রতিবেদক :
নিজস্ব প্রতিবেদক :
প্রকাশ : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫

নীতিগত অবহেলায় পিছিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি : টিআইবি

নীতিগতভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে প্রয়োজনীয় প্রাধান্য না দেওয়ায় ২০৫০ সালের মধ্যে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সম্ভাবনা ক্রমেই কমে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই খাত অবহেলিত থাকায় টেকসই জ্বালানিতে ন্যায়সংগত রূপান্তর আজ বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।

বুধবার (২৪ ডিসেম্বর) রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে টিআইবি আয়োজিত ‘বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে যৌথভাবে গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন এনার্জি গভর্ন্যান্সের অ্যাসিস্ট্যান্ট কো-অর্ডিনেটর আশনা ইসলাম এবং কো-অর্ডিনেটর নেওয়াজুল মওলা।

গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট স্থাপিত সক্ষমতা ২৮ হাজার ৬১৬ মেগাওয়াট হলেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ১ হাজার ৩১৪ মেগাওয়াট। ২০১০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ হলেও এর ৯৬ দশমিক ৭ শতাংশ ব্যয় হয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক খাতে, বিপরীতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ মাত্র ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। বর্তমানে দেশে ১ হাজার ২২১ দশমিক ৪ মেগাওয়াট সক্ষমতাসম্পন্ন মাত্র ১৭টি গ্রিড-সংযুক্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প রয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের সম্প্রসারণ ও ক্রমবর্ধমান কার্বন নিঃসরণ প্যারিস চুক্তি, আইএনডিসি এবং টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একই সঙ্গে আমদানি করা জ্বালানি ও বিদ্যুতের ওপর বাড়তি নির্ভরতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির বর্তমান সীমিত অবদান এবং চলমান প্রকল্পগুলোর ধীর অগ্রগতি ২০৫০ সালের মধ্যে শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যে পৌঁছাতে সহায়ক নয় বলে অংশীজনদের আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

গবেষণায় আরও বলা হয়, জ্বালানি নীতি ও পরিকল্পনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে পর্যাপ্ত অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি। বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে রয়েছে অসংগতি ও সমন্বয়হীনতা। বাস্তবতা, সক্ষমতা ও বিদ্যমান কাঠামোর যথাযথ বিশ্লেষণ ছাড়াই বিদ্যুৎ চাহিদার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, অথচ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়নি।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, উন্নয়ন অংশীদারদের বিনিয়োগ-স্বার্থের কারণে জ্বালানি নীতি ও পরিকল্পনায় প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকি রয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর নীতির ফলে অতিরিক্ত ভর্তুকি ও ক্যাপাসিটি চার্জের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় হচ্ছে। অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে পর্যাপ্ত প্রণোদনার অভাব এবং বেসরকারিকরণের নীতি এই খাতকে কর্পোরেট উদ্যোক্তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে। প্রকল্প ক্রয় ও দরপত্র প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি, প্রকল্প অনুমোদন ও চুক্তি সম্পাদনে অনিয়ম এবং বিদ্যুতের দাম নির্ধারণে অসঙ্গতির কারণে সামগ্রিকভাবে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।

গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তিতে বিদেশনির্ভরতা, সরকারের বিনিয়োগ ঘাটতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা)-এর দুর্বলতা এই খাতের অগ্রগতিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্রয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ বিচারহীন থেকে যাওয়ায় অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রবণতা আরও উৎসাহিত হচ্ছে।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বর্তমানে দেশে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা প্রায় ৯৫ শতাংশ, বিপরীতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ৪ শতাংশেরও কম। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা মূলত জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর হওয়ায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত প্রান্তিক অবস্থায় রয়ে গেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে অগ্রগতির ইঙ্গিত দিতে পরীক্ষিত নয় এমন ক্লিন এনার্জিকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও মূল সমস্যার সমাধান হয়নি। তিনি আরও বলেন, গবেষণায় পর্যালোচিত প্রকল্পগুলোতে সুশাসনের সব নির্দেশকেই ঘাটতির চিত্র পাওয়া গেছে, যা ২০৫০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সম্ভাবনাকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


নীতিগত অবহেলায় পিছিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি : টিআইবি

প্রকাশের তারিখ : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫

featured Image

নীতিগতভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতকে প্রয়োজনীয় প্রাধান্য না দেওয়ায় ২০৫০ সালের মধ্যে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সম্ভাবনা ক্রমেই কমে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই খাত অবহেলিত থাকায় টেকসই জ্বালানিতে ন্যায়সংগত রূপান্তর আজ বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।


বুধবার (২৪ ডিসেম্বর) রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে টিআইবি আয়োজিত ‘বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। সংবাদ সম্মেলনে যৌথভাবে গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন এনার্জি গভর্ন্যান্সের অ্যাসিস্ট্যান্ট কো-অর্ডিনেটর আশনা ইসলাম এবং কো-অর্ডিনেটর নেওয়াজুল মওলা।


গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট স্থাপিত সক্ষমতা ২৮ হাজার ৬১৬ মেগাওয়াট হলেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ মাত্র ১ হাজার ৩১৪ মেগাওয়াট। ২০১০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতে প্রায় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমপরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ হলেও এর ৯৬ দশমিক ৭ শতাংশ ব্যয় হয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক খাতে, বিপরীতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ মাত্র ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। বর্তমানে দেশে ১ হাজার ২২১ দশমিক ৪ মেগাওয়াট সক্ষমতাসম্পন্ন মাত্র ১৭টি গ্রিড-সংযুক্ত নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প রয়েছে।


প্রতিবেদনে বলা হয়, জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের সম্প্রসারণ ও ক্রমবর্ধমান কার্বন নিঃসরণ প্যারিস চুক্তি, আইএনডিসি এবং টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। একই সঙ্গে আমদানি করা জ্বালানি ও বিদ্যুতের ওপর বাড়তি নির্ভরতা দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির বর্তমান সীমিত অবদান এবং চলমান প্রকল্পগুলোর ধীর অগ্রগতি ২০৫০ সালের মধ্যে শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যে পৌঁছাতে সহায়ক নয় বলে অংশীজনদের আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।


গবেষণায় আরও বলা হয়, জ্বালানি নীতি ও পরিকল্পনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে পর্যাপ্ত অগ্রাধিকার দেওয়া হয়নি। বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে রয়েছে অসংগতি ও সমন্বয়হীনতা। বাস্তবতা, সক্ষমতা ও বিদ্যমান কাঠামোর যথাযথ বিশ্লেষণ ছাড়াই বিদ্যুৎ চাহিদার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, অথচ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়নি।


প্রতিবেদন অনুযায়ী, উন্নয়ন অংশীদারদের বিনিয়োগ-স্বার্থের কারণে জ্বালানি নীতি ও পরিকল্পনায় প্রভাব বিস্তারের ঝুঁকি রয়েছে। জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর নীতির ফলে অতিরিক্ত ভর্তুকি ও ক্যাপাসিটি চার্জের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় হচ্ছে। অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে পর্যাপ্ত প্রণোদনার অভাব এবং বেসরকারিকরণের নীতি এই খাতকে কর্পোরেট উদ্যোক্তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি করেছে। প্রকল্প ক্রয় ও দরপত্র প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি, প্রকল্প অনুমোদন ও চুক্তি সম্পাদনে অনিয়ম এবং বিদ্যুতের দাম নির্ধারণে অসঙ্গতির কারণে সামগ্রিকভাবে প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।


গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তিতে বিদেশনির্ভরতা, সরকারের বিনিয়োগ ঘাটতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা)-এর দুর্বলতা এই খাতের অগ্রগতিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভূমি অধিগ্রহণ ও ক্রয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ বিচারহীন থেকে যাওয়ায় অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রবণতা আরও উৎসাহিত হচ্ছে।


ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বর্তমানে দেশে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা প্রায় ৯৫ শতাংশ, বিপরীতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ৪ শতাংশেরও কম। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা মূলত জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর হওয়ায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাত প্রান্তিক অবস্থায় রয়ে গেছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে অগ্রগতির ইঙ্গিত দিতে পরীক্ষিত নয় এমন ক্লিন এনার্জিকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও মূল সমস্যার সমাধান হয়নি। তিনি আরও বলেন, গবেষণায় পর্যালোচিত প্রকল্পগুলোতে সুশাসনের সব নির্দেশকেই ঘাটতির চিত্র পাওয়া গেছে, যা ২০৫০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সম্ভাবনাকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ