ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

মিনিকেট–নাজিরশাইল ধানের অস্তিত্ব নেই, সেই চাল বাজারে কীভাবে


মাসুদ রানা :
মাসুদ রানা :
প্রকাশ : ২০ ডিসেম্বর ২০২৫

মিনিকেট–নাজিরশাইল ধানের অস্তিত্ব নেই, সেই চাল বাজারে কীভাবে

দেশের চালের বাজারে সবচেয়ে পরিচিত নাম এখন মিনিকেট ও নাজিরশাইল। শহর–গ্রাম সর্বত্র এই দুই নামের চালই ভোক্তাদের প্রথম পছন্দ। অথচ বিস্ময়কর হলেও সত্য, কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিংবা সরকারি কোনো স্বীকৃত তালিকায় মিনিকেট বা নাজিরশাইল নামে কোনো ধান জাতের অস্তিত্ব নেই। তাহলে এই চাল আসে কোথা থেকে—এ প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে সচেতন মহলে।


কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মিনিকেট ও নাজিরশাইল কোনো ধানের জাত নয়; এগুলো মূলত চালের বাজারি বা বাণিজ্যিক নাম। সাধারণত BR-28, BR-29, স্বর্ণা, পাইজাম কিংবা ইরি জাতের মোটা ও মাঝারি দানার ধান আধুনিক অটো রাইস মিলগুলোতে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। মেশিনে চালের দুই পাশ কেটে দানাকে চিকন ও সমান করা হয়। এরপর একাধিক ধাপে অতিরিক্ত পলিশ দিয়ে চালকে ঝকঝকে সাদা বানানো হয়। এই প্রক্রিয়া শেষ হলেই চালের নাম বদলে বাজারে আসে—মিনিকেট বা নাজিরশাইল নামে।

ফলে ধানের প্রকৃত পরিচয় আড়াল থেকেই যাচ্ছে ভোক্তার কাছে।


চাল পলিশের পেছনে মূল কারণ ভোক্তার চাহিদা ও ব্যবসায়িক লাভ। সাদা, চিকন ও ঝরঝরে চালকে এখনো ভালো মানের চাল বলে মনে করেন অনেকেই। ব্যবসায়ীরা এই ধারণাকে কাজে লাগিয়ে একই ধান থেকে পলিশ করা চালের দাম কয়েকগুণ বাড়িয়ে বিক্রি করছেন।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সৌন্দর্যের আড়ালে বড় ক্ষতি হচ্ছে পুষ্টিগুণের।


পুষ্টিবিদদের মতে, চালের বাইরের স্তরেই থাকে ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স, আয়রন, জিঙ্ক ও প্রয়োজনীয় ফাইবার। অতিরিক্ত পলিশের সময় এই স্তর উঠে যায়। ফলে প্রতিদিনের ভাত ধীরে ধীরে পুষ্টিহীন হয়ে পড়ছে। দীর্ঘমেয়াদে এতে অপুষ্টি, হজমের সমস্যা ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে।


চালের বাজারে আধুনিক অটো রাইস মিলের বিস্তার, দুর্বল বাজার তদারকি এবং লেবেলিংয়ের বাধ্যবাধকতা না থাকাই এই সমস্যাকে জটিল করে তুলেছে। চালের বস্তায় কোন ধানের চাল, কতটা পলিশ করা হয়েছে—এসব তথ্য উল্লেখ বাধ্যতামূলক না হওয়ায় ভোক্তারা নাম দেখেই চাল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।


অন্যদিকে, তুলনামূলক নিরাপদ ও পুষ্টিকর হিসেবে পরিচিত অর্গানিক চাল এখনো বাজারে খুব সীমিত। কেমিক্যাল সার ও কীটনাশক ছাড়া ধান উৎপাদনে খরচ বেশি, ফলন কম। এসব চাল সাধারণত কম পলিশ করা হওয়ায় সংরক্ষণও কঠিন। ফলে ব্যবসায়ীরা এতে আগ্রহ দেখান না। দাম বেশি হওয়ায় অনেক ভোক্তাও অর্গানিক চাল কিনতে পিছিয়ে যান।


কৃষি ও খাদ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চালের ক্ষেত্রে নাম নয়, ধানের উৎস ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্পর্কে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁরা অতিরিক্ত পলিশ করা চালের পরিবর্তে আংশিক পলিশ করা চাল বা ব্রাউন রাইস গ্রহণের পরামর্শ দেন।


মিনিকেট ও নাজিরশাইল চালের জনপ্রিয়তা আসলে ভোক্তার রুচি ও বাজার ব্যবস্থারই প্রতিফলন। সৌন্দর্য আর চিকন দানার মোহে আমরা প্রতিদিন এমন চাল খাচ্ছি, যার প্রকৃত পরিচয় অজানা। খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সচেতনতা, সঠিক লেবেলিং এবং কার্যকর বাজার তদারকি।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


মিনিকেট–নাজিরশাইল ধানের অস্তিত্ব নেই, সেই চাল বাজারে কীভাবে

প্রকাশের তারিখ : ২০ ডিসেম্বর ২০২৫

featured Image

দেশের চালের বাজারে সবচেয়ে পরিচিত নাম এখন মিনিকেট ও নাজিরশাইল। শহর–গ্রাম সর্বত্র এই দুই নামের চালই ভোক্তাদের প্রথম পছন্দ। অথচ বিস্ময়কর হলেও সত্য, কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান কিংবা সরকারি কোনো স্বীকৃত তালিকায় মিনিকেট বা নাজিরশাইল নামে কোনো ধান জাতের অস্তিত্ব নেই। তাহলে এই চাল আসে কোথা থেকে—এ প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে সচেতন মহলে।


কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মিনিকেট ও নাজিরশাইল কোনো ধানের জাত নয়; এগুলো মূলত চালের বাজারি বা বাণিজ্যিক নাম। সাধারণত BR-28, BR-29, স্বর্ণা, পাইজাম কিংবা ইরি জাতের মোটা ও মাঝারি দানার ধান আধুনিক অটো রাইস মিলগুলোতে প্রক্রিয়াজাত করা হয়। মেশিনে চালের দুই পাশ কেটে দানাকে চিকন ও সমান করা হয়। এরপর একাধিক ধাপে অতিরিক্ত পলিশ দিয়ে চালকে ঝকঝকে সাদা বানানো হয়। এই প্রক্রিয়া শেষ হলেই চালের নাম বদলে বাজারে আসে—মিনিকেট বা নাজিরশাইল নামে।

ফলে ধানের প্রকৃত পরিচয় আড়াল থেকেই যাচ্ছে ভোক্তার কাছে।


চাল পলিশের পেছনে মূল কারণ ভোক্তার চাহিদা ও ব্যবসায়িক লাভ। সাদা, চিকন ও ঝরঝরে চালকে এখনো ভালো মানের চাল বলে মনে করেন অনেকেই। ব্যবসায়ীরা এই ধারণাকে কাজে লাগিয়ে একই ধান থেকে পলিশ করা চালের দাম কয়েকগুণ বাড়িয়ে বিক্রি করছেন।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সৌন্দর্যের আড়ালে বড় ক্ষতি হচ্ছে পুষ্টিগুণের।


পুষ্টিবিদদের মতে, চালের বাইরের স্তরেই থাকে ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স, আয়রন, জিঙ্ক ও প্রয়োজনীয় ফাইবার। অতিরিক্ত পলিশের সময় এই স্তর উঠে যায়। ফলে প্রতিদিনের ভাত ধীরে ধীরে পুষ্টিহীন হয়ে পড়ছে। দীর্ঘমেয়াদে এতে অপুষ্টি, হজমের সমস্যা ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে।


চালের বাজারে আধুনিক অটো রাইস মিলের বিস্তার, দুর্বল বাজার তদারকি এবং লেবেলিংয়ের বাধ্যবাধকতা না থাকাই এই সমস্যাকে জটিল করে তুলেছে। চালের বস্তায় কোন ধানের চাল, কতটা পলিশ করা হয়েছে—এসব তথ্য উল্লেখ বাধ্যতামূলক না হওয়ায় ভোক্তারা নাম দেখেই চাল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।


অন্যদিকে, তুলনামূলক নিরাপদ ও পুষ্টিকর হিসেবে পরিচিত অর্গানিক চাল এখনো বাজারে খুব সীমিত। কেমিক্যাল সার ও কীটনাশক ছাড়া ধান উৎপাদনে খরচ বেশি, ফলন কম। এসব চাল সাধারণত কম পলিশ করা হওয়ায় সংরক্ষণও কঠিন। ফলে ব্যবসায়ীরা এতে আগ্রহ দেখান না। দাম বেশি হওয়ায় অনেক ভোক্তাও অর্গানিক চাল কিনতে পিছিয়ে যান।


কৃষি ও খাদ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, চালের ক্ষেত্রে নাম নয়, ধানের উৎস ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সম্পর্কে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। তাঁরা অতিরিক্ত পলিশ করা চালের পরিবর্তে আংশিক পলিশ করা চাল বা ব্রাউন রাইস গ্রহণের পরামর্শ দেন।


মিনিকেট ও নাজিরশাইল চালের জনপ্রিয়তা আসলে ভোক্তার রুচি ও বাজার ব্যবস্থারই প্রতিফলন। সৌন্দর্য আর চিকন দানার মোহে আমরা প্রতিদিন এমন চাল খাচ্ছি, যার প্রকৃত পরিচয় অজানা। খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টি নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সচেতনতা, সঠিক লেবেলিং এবং কার্যকর বাজার তদারকি।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ