ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

ভাঙ্গায় পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকে অনিয়মের অভিযোগ, তদন্তের আশ্বাস ইউএনওর



ভাঙ্গায় পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকে অনিয়মের অভিযোগ, তদন্তের আশ্বাস ইউএনওর
ছবি: প্রতিনিধি

ফরিদপুরের ভাঙ্গায় পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের একটি শাখায় ঋণ বিতরণ ও কিস্তির টাকা আদায়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। গ্রাহকদের অভিযোগ, ঋণের আবেদন না করেও কয়েকজনের নামে ঋণ দেখানো হয়েছে। আবার নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করেও অনেক গ্রাহকের নামে বকেয়া ঋণ দেখানো হচ্ছে।

এ ঘটনায় সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক মনোয়ার হোসেন ও মাঠ সহকারী ফজলুল হক ওরফে রুবেল মাতুব্বরের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের নামে ভুয়া ঋণ দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ এবং কিস্তির টাকা ব্যাংকে জমা না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন ভাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদুল হাসান।

ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে সম্প্রতি ইউএনও বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। অভিযোগে উপজেলার চুমুরদী ইউনিয়নের পূর্ব সদরদী গ্রামের প্রায় অর্ধশত গ্রাহকের কিস্তির টাকা পরিশোধের পরও তাদের নামে বকেয়া ঋণ দেখানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, এসব গ্রাহক নিয়মিত মাঠ সহকারী রুবেল মাতুব্বরের কাছে ঋণের কিস্তির টাকা পরিশোধ করেছেন। কিন্তু ওই টাকা ব্যাংকে জমা না দেওয়ায় বর্তমানে তাদের অনেকের নামেই বকেয়া ঋণ দেখানো হচ্ছে।

ঋণের আবেদন না করেও ৭০ হাজার টাকা ঋণ

ভুক্তভোগী হোসনেয়ারা বেগমের দাবি, তিনি কখনো ঋণের জন্য আবেদন করেননি। এমনকি তিনি ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পের সদস্যও ছিলেন না। অথচ তার নামে ৭০ হাজার টাকা ঋণ বিতরণ দেখানো হয়েছে।

হোসনেয়ারা বেগম বলেন, “আমি ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পের সদস্যই নই। কখনো ঋণের আবেদনও করিনি। অথচ আমার নামে ৭০ হাজার টাকার ঋণ দেখানো হয়েছে। বিষয়টি জানতে অফিসে গেলে কোনো কাগজপত্র দেখানো হয়নি। উল্টো আমাকে ঋণের টাকা পরিশোধের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে।”

এ কারণে তিনি ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন বলে জানান।

তার এলাকার কর্মসূচির দলনেতা হাজেরা বেগম বলেন, “হোসনেয়ারা আমাদের দলের সদস্যই না। সদস্য না হলে ঋণ নেওয়ার সুযোগ নেই। তার নামে কীভাবে ঋণ হলো, কে টাকা তুলেছে, আমরা কিছুই জানি না।”

টাকা পরিশোধ করেও দেখানো হচ্ছে বকেয়া

আরেক ভুক্তভোগী আলেয়া বেগম বলেন, তিনি ৭০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে প্রায় ৮০ হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন। কিন্তু এখন ব্যাংক থেকে তাকে জানানো হচ্ছে, তার কাছে আরও ৫০ হাজার টাকা পাওনা রয়েছে।

আলেয়া বেগম বলেন, “আমরা গরিব মানুষ, কাগজপত্র তেমন বুঝি না। অনেক কষ্ট করে ঋণ শোধ করেছি। এখন আবার বলা হচ্ছে ৫০ হাজার টাকা বাকি। এই টাকা কীভাবে দেব?”

ভুক্তভোগী মমতাজ বেগমের অভিযোগ, তিনি ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। পরে মাঠ সহকারী রুবেল মাতুব্বরের মাধ্যমে পুরো ঋণের টাকা পরিশোধ করেন। তবে রুবেল চলে যাওয়ার পর ব্যাংক থেকে তাকে জানানো হচ্ছে, তার নামে এখনও ৫০ হাজার টাকা বকেয়া রয়েছে।

আবেদনপত্র দেখাতে অস্বীকৃতি

অভিযোগের বিষয়ে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের বর্তমান শাখা ব্যবস্থাপক সুশান্ত কুমার দাস বলেন, হোসনেয়ারা বেগমের নামে থাকা ঋণের আবেদনে যে স্বাক্ষর রয়েছে, তার সঙ্গে হোসনেয়ারা বেগমের স্বাক্ষরের মিল পাওয়া গেছে।

তবে ওই ঋণের আবেদনপত্র দেখানোর অনুরোধ করা হলে তিনি তা দেখাতে অস্বীকৃতি জানান।

গ্রাহকদের দাবি অনুযায়ী কিস্তির টাকা পরিশোধের পরও তাদের নামে বকেয়া দেখানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ওই সময় আমি দায়িত্বে ছিলাম না। তাই বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানি না।”

মাঠ সহকারী ফজলুল হক ওরফে রুবেল মাতুব্বরের বিষয়ে তিনি বলেন, “তাকে ফরিদপুরে সংযুক্ত করা হয়েছিল। তবে তিনি সেখানে যোগদান করেননি।”

অভিযোগকারীদের দাবি, রুবেল মাতুব্বর বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। অন্যদিকে সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক মনোয়ার হোসেন বর্তমানে মাদারীপুরের শিবচরে কর্মরত রয়েছেন বলে জানা গেছে।

পাওয়া যায়নি সাবেক ব্যবস্থাপকের বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক মনোয়ার হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

তদন্তের আশ্বাস ইউএনওর

ভাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, “‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পের ঋণ বিতরণে কিছু অসঙ্গতির বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগে বলা হয়েছে, ঋণ পরিশোধ করার পরও অনেকের নামে অনাদায়ী ঋণ দেখানো হয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্পের সদস্য নন, এমন ব্যক্তির নামেও ঋণ বিতরণের অভিযোগ রয়েছে।”

তিনি বলেন, “বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

ভুক্তভোগীদের দাবি, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করে তাদের নামে থাকা অনিয়মতান্ত্রিক বকেয়া ঋণ বাতিল করতে হবে। একই সঙ্গে তারা মাঠ পর্যায়ে পরিশোধ করা কিস্তির অর্থের হিসাব যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।


আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


ভাঙ্গায় পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকে অনিয়মের অভিযোগ, তদন্তের আশ্বাস ইউএনওর

প্রকাশের তারিখ : ১০ আগস্ট ২০২৬

featured Image

ফরিদপুরের ভাঙ্গায় পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের একটি শাখায় ঋণ বিতরণ ও কিস্তির টাকা আদায়ে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। গ্রাহকদের অভিযোগ, ঋণের আবেদন না করেও কয়েকজনের নামে ঋণ দেখানো হয়েছে। আবার নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করেও অনেক গ্রাহকের নামে বকেয়া ঋণ দেখানো হচ্ছে।

এ ঘটনায় সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক মনোয়ার হোসেন ও মাঠ সহকারী ফজলুল হক ওরফে রুবেল মাতুব্বরের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের নামে ভুয়া ঋণ দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ এবং কিস্তির টাকা ব্যাংকে জমা না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন ভাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদুল হাসান।

ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে সম্প্রতি ইউএনও বরাবর লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়। অভিযোগে উপজেলার চুমুরদী ইউনিয়নের পূর্ব সদরদী গ্রামের প্রায় অর্ধশত গ্রাহকের কিস্তির টাকা পরিশোধের পরও তাদের নামে বকেয়া ঋণ দেখানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, এসব গ্রাহক নিয়মিত মাঠ সহকারী রুবেল মাতুব্বরের কাছে ঋণের কিস্তির টাকা পরিশোধ করেছেন। কিন্তু ওই টাকা ব্যাংকে জমা না দেওয়ায় বর্তমানে তাদের অনেকের নামেই বকেয়া ঋণ দেখানো হচ্ছে।

ঋণের আবেদন না করেও ৭০ হাজার টাকা ঋণ

ভুক্তভোগী হোসনেয়ারা বেগমের দাবি, তিনি কখনো ঋণের জন্য আবেদন করেননি। এমনকি তিনি ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পের সদস্যও ছিলেন না। অথচ তার নামে ৭০ হাজার টাকা ঋণ বিতরণ দেখানো হয়েছে।

হোসনেয়ারা বেগম বলেন, “আমি ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পের সদস্যই নই। কখনো ঋণের আবেদনও করিনি। অথচ আমার নামে ৭০ হাজার টাকার ঋণ দেখানো হয়েছে। বিষয়টি জানতে অফিসে গেলে কোনো কাগজপত্র দেখানো হয়নি। উল্টো আমাকে ঋণের টাকা পরিশোধের জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে।”

এ কারণে তিনি ইউএনওর কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন বলে জানান।

তার এলাকার কর্মসূচির দলনেতা হাজেরা বেগম বলেন, “হোসনেয়ারা আমাদের দলের সদস্যই না। সদস্য না হলে ঋণ নেওয়ার সুযোগ নেই। তার নামে কীভাবে ঋণ হলো, কে টাকা তুলেছে, আমরা কিছুই জানি না।”

টাকা পরিশোধ করেও দেখানো হচ্ছে বকেয়া

আরেক ভুক্তভোগী আলেয়া বেগম বলেন, তিনি ৭০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে প্রায় ৮০ হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন। কিন্তু এখন ব্যাংক থেকে তাকে জানানো হচ্ছে, তার কাছে আরও ৫০ হাজার টাকা পাওনা রয়েছে।

আলেয়া বেগম বলেন, “আমরা গরিব মানুষ, কাগজপত্র তেমন বুঝি না। অনেক কষ্ট করে ঋণ শোধ করেছি। এখন আবার বলা হচ্ছে ৫০ হাজার টাকা বাকি। এই টাকা কীভাবে দেব?”

ভুক্তভোগী মমতাজ বেগমের অভিযোগ, তিনি ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। পরে মাঠ সহকারী রুবেল মাতুব্বরের মাধ্যমে পুরো ঋণের টাকা পরিশোধ করেন। তবে রুবেল চলে যাওয়ার পর ব্যাংক থেকে তাকে জানানো হচ্ছে, তার নামে এখনও ৫০ হাজার টাকা বকেয়া রয়েছে।

আবেদনপত্র দেখাতে অস্বীকৃতি

অভিযোগের বিষয়ে পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের বর্তমান শাখা ব্যবস্থাপক সুশান্ত কুমার দাস বলেন, হোসনেয়ারা বেগমের নামে থাকা ঋণের আবেদনে যে স্বাক্ষর রয়েছে, তার সঙ্গে হোসনেয়ারা বেগমের স্বাক্ষরের মিল পাওয়া গেছে।

তবে ওই ঋণের আবেদনপত্র দেখানোর অনুরোধ করা হলে তিনি তা দেখাতে অস্বীকৃতি জানান।

গ্রাহকদের দাবি অনুযায়ী কিস্তির টাকা পরিশোধের পরও তাদের নামে বকেয়া দেখানোর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ওই সময় আমি দায়িত্বে ছিলাম না। তাই বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানি না।”

মাঠ সহকারী ফজলুল হক ওরফে রুবেল মাতুব্বরের বিষয়ে তিনি বলেন, “তাকে ফরিদপুরে সংযুক্ত করা হয়েছিল। তবে তিনি সেখানে যোগদান করেননি।”

অভিযোগকারীদের দাবি, রুবেল মাতুব্বর বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। অন্যদিকে সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক মনোয়ার হোসেন বর্তমানে মাদারীপুরের শিবচরে কর্মরত রয়েছেন বলে জানা গেছে।

পাওয়া যায়নি সাবেক ব্যবস্থাপকের বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক মনোয়ার হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

তদন্তের আশ্বাস ইউএনওর

ভাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, “‘একটি বাড়ি একটি খামার’ প্রকল্পের ঋণ বিতরণে কিছু অসঙ্গতির বিষয়ে লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। অভিযোগে বলা হয়েছে, ঋণ পরিশোধ করার পরও অনেকের নামে অনাদায়ী ঋণ দেখানো হয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্পের সদস্য নন, এমন ব্যক্তির নামেও ঋণ বিতরণের অভিযোগ রয়েছে।”

তিনি বলেন, “বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

ভুক্তভোগীদের দাবি, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করে তাদের নামে থাকা অনিয়মতান্ত্রিক বকেয়া ঋণ বাতিল করতে হবে। একই সঙ্গে তারা মাঠ পর্যায়ে পরিশোধ করা কিস্তির অর্থের হিসাব যাচাই করে দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।



দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ