কিশোরগঞ্জ শহরের ব্যস্ততম কালীবাড়ি মোড় দীর্ঘদিন ধরেই মোটরসাইকেলের খুচরা যন্ত্রাংশের অন্যতম প্রধান বাজার হিসেবে পরিচিত। প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত বাইকার প্রয়োজনীয় পার্টস কিনতে এখানে আসেন। সারি সারি দোকানে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পার্টসের সমাহার থাকলেও, সাম্প্রতিক সময়ে এই বাজার ঘিরে উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। ভুক্তভোগীদের দাবি, অধিকাংশ পণ্যের গায়ে সর্বোচ্চ খুচরা বিক্রয়মূল্য (MRP), উৎপাদনের তারিখ কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য না থাকায় ইচ্ছেমতো দাম আদায় করছেন কিছু ব্যবসায়ী। সাধারণত ওষুধ, প্রসাধনী বা খাদ্যপণ্যের মতো ভোগ্যপণ্যে উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদ এবং সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু কালীবাড়ি মোড়ের বিভিন্ন মোটরসাইকেল পার্টসের দোকানে বিক্রি হওয়া অনেক পণ্যের প্যাকেটে এসব তথ্য অনুপস্থিত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফলে একই পণ্যের দাম একেক দোকানে একেক রকম হওয়ায় ক্রেতারা বিভ্রান্তির পাশাপাশি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। সম্প্রতি এক স্থানীয় মোটরসাইকেল চালক নিজের বাইকের একটি ইগনিশন সুইচ (মিটারের সুইচ) কিনতে গিয়ে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। এক দোকানে পণ্যটির দাম বলা হয় ৪৮০ টাকা। সন্দেহ হওয়ায় পাশের আরেকটি দোকানে গিয়ে একই পণ্যের দাম জানতে চাইলে সেখানে মূল্য চাওয়া হয় ৩০০ টাকা। একই পণ্যের দামে মাত্র কয়েক গজ দূরত্বে ১৮০ টাকার পার্থক্য দেখে বিস্মিত হন তিনি। এ ধরনের অভিযোগের সঙ্গে মিল পাওয়া গেছে কিশোরগঞ্জের প্রবীণ লেখক ও সাংবাদিক আতাউর রহমান বাচ্চুর অভিজ্ঞতায়ও। তিনি জানান, সম্প্রতি কালীবাড়ি মোড়ের একটি দোকান থেকে ৮ হাজার ৫০০ টাকায় মোট ২১টি মোটরসাইকেল পার্টস কিনেছেন। তবে কোনো পণ্যের প্যাকেটেই মুদ্রিত মূল্য কিংবা উৎপাদনের তথ্য ছিল না। আতাউর রহমান বাচ্চুর ভাষ্য, পণ্যের গায়ে কেবল কালো মার্কার দিয়ে লেখা ছিল কিছু সাংকেতিক চিহ্ন, যেমন LX/2, XB2, ACE/2, B2, XX/2। তার অভিযোগ, এসব কোডের ভিত্তিতেই দোকানদাররা নিজেদের মতো করে দাম নির্ধারণ করেন, যা সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব কোড মূলত ব্যবসায়ীদের অভ্যন্তরীণ হিসাব কিংবা পাইকারি ক্রয়মূল্য নির্দেশ করতে ব্যবহৃত হতে পারে। তবে অনেকের অভিযোগ, এই কোডকে ভিত্তি করেই ক্রেতাভেদে ভিন্ন ভিন্ন দাম নেওয়া হয়। দরদাম করলে কিছু ছাড় দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি দামেই পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে কালীবাড়ি মোড়ের কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বললে তারা স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিক্রেতা বলেন, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় পণ্যের গায়ে মূল্য উল্লেখ করে না। তাই নিজেদের হিসাবের সুবিধার্থে মার্কার দিয়ে সংকেত লিখে রাখা হয়। তবে ভুক্তভোগী বাইকারদের মতে, হিসাব সংরক্ষণের জন্য সফটওয়্যার, ইনভয়েস বা অন্য পদ্ধতি ব্যবহার করা সম্ভব। প্রকাশ্যে পণ্যের গায়ে সাংকেতিক চিহ্ন লিখে প্রকৃত মূল্য গোপন রাখার বিষয়টি সন্দেহের জন্ম দেয় এবং এতে ভোক্তারা প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। একজন ক্ষুব্ধ মোটরসাইকেল চালক বলেন, "মেকানিকের শ্রমমূল্য দিতে আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু একটি পার্টসের প্রকৃত দাম না জেনে ইচ্ছেমতো মূল্য পরিশোধ করতে বাধ্য হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।" এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর দেশের বিভিন্ন খাত, বিশেষ করে খাদ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, প্রসাধনী ও রেস্তোরাঁয় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে প্রশংসা কুড়িয়েছে। তাই মোটরসাইকেল পার্টসের বাজারেও একই ধরনের নজরদারির দাবি তুলেছেন সচেতন নাগরিকরা। তাদের দাবি, কালীবাড়ি মোড়সহ জেলার বিভিন্ন মোটরসাইকেল পার্টসের দোকানে দ্রুত সরেজমিনে অভিযান পরিচালনা করে পণ্যের মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি, প্যাকেটের গায়ে লেখা সাংকেতিক কোডের ব্যবহার এবং আমদানি-সংক্রান্ত নথিপত্র যাচাই করা হোক। একই সঙ্গে প্রতিটি পণ্যে বাধ্যতামূলকভাবে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (MRP) উল্লেখ নিশ্চিত করা এবং ভোক্তা স্বার্থবিরোধী কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। সচেতন মহলের মতে, মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। তাদের স্বার্থ রক্ষায় পার্টস বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ জুলাই ২০২৬
কিশোরগঞ্জ শহরের ব্যস্ততম কালীবাড়ি মোড় দীর্ঘদিন ধরেই মোটরসাইকেলের খুচরা যন্ত্রাংশের অন্যতম প্রধান বাজার হিসেবে পরিচিত। প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে শত শত বাইকার প্রয়োজনীয় পার্টস কিনতে এখানে আসেন। সারি সারি দোকানে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পার্টসের সমাহার থাকলেও, সাম্প্রতিক সময়ে এই বাজার ঘিরে উঠেছে গুরুতর অভিযোগ। ভুক্তভোগীদের দাবি, অধিকাংশ পণ্যের গায়ে সর্বোচ্চ খুচরা বিক্রয়মূল্য (MRP), উৎপাদনের তারিখ কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য না থাকায় ইচ্ছেমতো দাম আদায় করছেন কিছু ব্যবসায়ী। সাধারণত ওষুধ, প্রসাধনী বা খাদ্যপণ্যের মতো ভোগ্যপণ্যে উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদ এবং সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু কালীবাড়ি মোড়ের বিভিন্ন মোটরসাইকেল পার্টসের দোকানে বিক্রি হওয়া অনেক পণ্যের প্যাকেটে এসব তথ্য অনুপস্থিত বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফলে একই পণ্যের দাম একেক দোকানে একেক রকম হওয়ায় ক্রেতারা বিভ্রান্তির পাশাপাশি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। সম্প্রতি এক স্থানীয় মোটরসাইকেল চালক নিজের বাইকের একটি ইগনিশন সুইচ (মিটারের সুইচ) কিনতে গিয়ে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। এক দোকানে পণ্যটির দাম বলা হয় ৪৮০ টাকা। সন্দেহ হওয়ায় পাশের আরেকটি দোকানে গিয়ে একই পণ্যের দাম জানতে চাইলে সেখানে মূল্য চাওয়া হয় ৩০০ টাকা। একই পণ্যের দামে মাত্র কয়েক গজ দূরত্বে ১৮০ টাকার পার্থক্য দেখে বিস্মিত হন তিনি। এ ধরনের অভিযোগের সঙ্গে মিল পাওয়া গেছে কিশোরগঞ্জের প্রবীণ লেখক ও সাংবাদিক আতাউর রহমান বাচ্চুর অভিজ্ঞতায়ও। তিনি জানান, সম্প্রতি কালীবাড়ি মোড়ের একটি দোকান থেকে ৮ হাজার ৫০০ টাকায় মোট ২১টি মোটরসাইকেল পার্টস কিনেছেন। তবে কোনো পণ্যের প্যাকেটেই মুদ্রিত মূল্য কিংবা উৎপাদনের তথ্য ছিল না। আতাউর রহমান বাচ্চুর ভাষ্য, পণ্যের গায়ে কেবল কালো মার্কার দিয়ে লেখা ছিল কিছু সাংকেতিক চিহ্ন, যেমন LX/2, XB2, ACE/2, B2, XX/2। তার অভিযোগ, এসব কোডের ভিত্তিতেই দোকানদাররা নিজেদের মতো করে দাম নির্ধারণ করেন, যা সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব কোড মূলত ব্যবসায়ীদের অভ্যন্তরীণ হিসাব কিংবা পাইকারি ক্রয়মূল্য নির্দেশ করতে ব্যবহৃত হতে পারে। তবে অনেকের অভিযোগ, এই কোডকে ভিত্তি করেই ক্রেতাভেদে ভিন্ন ভিন্ন দাম নেওয়া হয়। দরদাম করলে কিছু ছাড় দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত প্রকৃত মূল্যের চেয়ে বেশি দামেই পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে কালীবাড়ি মোড়ের কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বললে তারা স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বিক্রেতা বলেন, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় পণ্যের গায়ে মূল্য উল্লেখ করে না। তাই নিজেদের হিসাবের সুবিধার্থে মার্কার দিয়ে সংকেত লিখে রাখা হয়। তবে ভুক্তভোগী বাইকারদের মতে, হিসাব সংরক্ষণের জন্য সফটওয়্যার, ইনভয়েস বা অন্য পদ্ধতি ব্যবহার করা সম্ভব। প্রকাশ্যে পণ্যের গায়ে সাংকেতিক চিহ্ন লিখে প্রকৃত মূল্য গোপন রাখার বিষয়টি সন্দেহের জন্ম দেয় এবং এতে ভোক্তারা প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। একজন ক্ষুব্ধ মোটরসাইকেল চালক বলেন, "মেকানিকের শ্রমমূল্য দিতে আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু একটি পার্টসের প্রকৃত দাম না জেনে ইচ্ছেমতো মূল্য পরিশোধ করতে বাধ্য হওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।" এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর দেশের বিভিন্ন খাত, বিশেষ করে খাদ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য, প্রসাধনী ও রেস্তোরাঁয় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে প্রশংসা কুড়িয়েছে। তাই মোটরসাইকেল পার্টসের বাজারেও একই ধরনের নজরদারির দাবি তুলেছেন সচেতন নাগরিকরা। তাদের দাবি, কালীবাড়ি মোড়সহ জেলার বিভিন্ন মোটরসাইকেল পার্টসের দোকানে দ্রুত সরেজমিনে অভিযান পরিচালনা করে পণ্যের মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি, প্যাকেটের গায়ে লেখা সাংকেতিক কোডের ব্যবহার এবং আমদানি-সংক্রান্ত নথিপত্র যাচাই করা হোক। একই সঙ্গে প্রতিটি পণ্যে বাধ্যতামূলকভাবে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (MRP) উল্লেখ নিশ্চিত করা এবং ভোক্তা স্বার্থবিরোধী কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। সচেতন মহলের মতে, মোটরসাইকেল ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। তাদের স্বার্থ রক্ষায় পার্টস বাজারে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

আপনার মতামত লিখুন