ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

দেড় শতকের ইতিহাস কাঁদে বাউন্ডারির ওপারে

সতাল মহাশ্মশানের ঐতিহ্যবাহী মঠ ও জমি দখলের অভিযোগ, এলাকায় ক্ষোভ


সৈয়দ মইনুল হোসেন, কিশোরগঞ্জ
সৈয়দ মইনুল হোসেন, কিশোরগঞ্জ
প্রকাশ : ০৭ জুলাই ২০২৬

সতাল মহাশ্মশানের ঐতিহ্যবাহী মঠ ও জমি দখলের অভিযোগ, এলাকায় ক্ষোভ

​বুকের ভেতর দেড়শ বছরের পুরোনো স্মৃতি, পূর্বপুরুষদের চিতার ছাই আর বিশ্বাসের এক পরম আশ্রয় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার সতাল মহাশ্মশান ঘাট। কিন্তু সেই চেনা আশ্রয়ে এখন কান পাতলে শোনা যাচ্ছে ঐতিহ্যের কান্না। দীর্ঘ দেড় শতকেরও বেশি সময় ধরে যে মঠটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শেষকৃত্যের পবিত্র আবহ আর ধর্মীয় অনুভূতির সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, ক্ষমতার করাল গ্রাসে আজ তা নিজ আঙিনা থেকেই ‘পরবাসী’। শ্মশানের জমি দখল করে সীমানা প্রাচীর বদলে দেওয়ার এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগে উত্তাল হয়ে উঠেছে স্থানীয় সনাতন সম্প্রদায়, ক্ষোভ আর উদ্বেগের ছায়া নেমে এসেছে পুরো এলাকায়।

সরেজমিনে জানা যায় স্থানীয়দের অভিযোগের আঙুল এক প্রভাবশালী ব্যক্তির দিকে। সম্প্রতি রাতের আঁধারে বা ক্ষমতার দাপটে শ্মশানের প্রায় দুই শতাংশ জমি দখল করে বদলে দেওয়া হয়েছে চিরচেনা সীমানা। আর এই সুনিপুণ কারসাজিতে শ্মশানের নিজস্ব সম্পত্তিতে থাকা ১৫০ বছরের প্রাচীন ঐতিহাসিক মঠটি রাতারাতি চলে গেছে শ্মশানের বাউন্ডারির বাইরে। যে মঠের সামনে দাঁড়িয়ে স্বজনহারা মানুষ বুক হালকা করত, যে মঠকে ঘিরে আবর্তিত হতো শত বছরের ধর্মীয় সংস্কৃতি, তা আজ এক লহমায় শ্মশান থেকে বিচ্ছিন্ন। এতে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে লেগেছে চরম আঘাত। 


সতাল মহাশ্মশান কমিটির সভাপতি বাপ্পি দত্ত প্রতিবেদককে জানান, ​"আমাদের জন্মের পর থেকেই এই মঠ ও এর চারপাশের জায়গা শ্মশানের সম্পত্তি হিসেবে দেখে আসছি। এটি শুধু ইট-পাথরের দেয়াল নয়, আমাদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতিবিজড়িত এক পবিত্র স্থান। কিন্তু ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে শ্মশানের প্রায় দুই শতাংশ জমি গিলে খাওয়া হয়েছে, মঠটিকে বাউন্ডারির বাইরে ফেলে দেওয়া হয়েছে। আমরা প্রশাসনের কাছে দ্রুত তদন্ত ও এর সুষ্ঠু বিচার চাই।"


​এই ঘটনা কেবল একটি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ক্ষোভেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং নাড়া দিয়েছে স্থানীয় সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধেও। কিশোরগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক জহিরুল ইসলাম সেলিম বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখার আহ্বান জানিয়ে বলেন,

​"এই শ্মশান ও মঠ আমাদের দেড়শ বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ। মানবিকতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় এই অভিযোগের একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা মিললে দখলকৃত জায়গা অবিলম্বে শ্মশান কর্তৃপক্ষের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত।"


​এদিকে, যাঁর বিরুদ্ধে এই ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থাপনার জমি দখলের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, তাঁর সাথে যোগাযোগের একাধিক চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব না হওয়ায় ধোঁয়াশা আরও ঘনীভূত হয়েছে।​


​সতাল মহাশ্মশানের পবিত্রতা, ধর্মীয় মর্যাদা এবং এই প্রাচীন নিদর্শনটি রক্ষায় এখন একমাত্র ভরসা প্রশাসন। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, অবিলম্বে প্রশাসনকে এই বিষয়ে জরুরি হস্তক্ষেপ করতে হবে। দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে অবৈধ দখলমুক্ত করে শ্মশানের জমি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে ফিরিয়ে না দিলে ভবিষ্যতে এখানকার ধর্মীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনায় বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে।


​একটি প্রাচীন শ্মশানের জমি ও মঠ দখলের এই ঘটনায় এলাকায় বর্তমানে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। সচেতন মহলের মতে, বিষয়টি কেবল জমির সীমানার নয়, বরং সামাজিক স্থিতিশীলতা ও ধর্মীয় সম্প্রীতির সুরক্ষার প্রশ্ন। প্রশাসন দ্রুত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়ে দেড়শ বছরের এই ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থাপনার নিরাপত্তা ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখবে—এমনটাই এখন আপামর কিশোরগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


সতাল মহাশ্মশানের ঐতিহ্যবাহী মঠ ও জমি দখলের অভিযোগ, এলাকায় ক্ষোভ

প্রকাশের তারিখ : ০৭ জুলাই ২০২৬

featured Image

​বুকের ভেতর দেড়শ বছরের পুরোনো স্মৃতি, পূর্বপুরুষদের চিতার ছাই আর বিশ্বাসের এক পরম আশ্রয় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার সতাল মহাশ্মশান ঘাট। কিন্তু সেই চেনা আশ্রয়ে এখন কান পাতলে শোনা যাচ্ছে ঐতিহ্যের কান্না। দীর্ঘ দেড় শতকেরও বেশি সময় ধরে যে মঠটি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শেষকৃত্যের পবিত্র আবহ আর ধর্মীয় অনুভূতির সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, ক্ষমতার করাল গ্রাসে আজ তা নিজ আঙিনা থেকেই ‘পরবাসী’। শ্মশানের জমি দখল করে সীমানা প্রাচীর বদলে দেওয়ার এক চাঞ্চল্যকর অভিযোগে উত্তাল হয়ে উঠেছে স্থানীয় সনাতন সম্প্রদায়, ক্ষোভ আর উদ্বেগের ছায়া নেমে এসেছে পুরো এলাকায়।

সরেজমিনে জানা যায় স্থানীয়দের অভিযোগের আঙুল এক প্রভাবশালী ব্যক্তির দিকে। সম্প্রতি রাতের আঁধারে বা ক্ষমতার দাপটে শ্মশানের প্রায় দুই শতাংশ জমি দখল করে বদলে দেওয়া হয়েছে চিরচেনা সীমানা। আর এই সুনিপুণ কারসাজিতে শ্মশানের নিজস্ব সম্পত্তিতে থাকা ১৫০ বছরের প্রাচীন ঐতিহাসিক মঠটি রাতারাতি চলে গেছে শ্মশানের বাউন্ডারির বাইরে। যে মঠের সামনে দাঁড়িয়ে স্বজনহারা মানুষ বুক হালকা করত, যে মঠকে ঘিরে আবর্তিত হতো শত বছরের ধর্মীয় সংস্কৃতি, তা আজ এক লহমায় শ্মশান থেকে বিচ্ছিন্ন। এতে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় অনুভূতিতে লেগেছে চরম আঘাত। 


সতাল মহাশ্মশান কমিটির সভাপতি বাপ্পি দত্ত প্রতিবেদককে জানান, ​"আমাদের জন্মের পর থেকেই এই মঠ ও এর চারপাশের জায়গা শ্মশানের সম্পত্তি হিসেবে দেখে আসছি। এটি শুধু ইট-পাথরের দেয়াল নয়, আমাদের পূর্বপুরুষদের স্মৃতিবিজড়িত এক পবিত্র স্থান। কিন্তু ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে শ্মশানের প্রায় দুই শতাংশ জমি গিলে খাওয়া হয়েছে, মঠটিকে বাউন্ডারির বাইরে ফেলে দেওয়া হয়েছে। আমরা প্রশাসনের কাছে দ্রুত তদন্ত ও এর সুষ্ঠু বিচার চাই।"


​এই ঘটনা কেবল একটি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ক্ষোভেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং নাড়া দিয়েছে স্থানীয় সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধেও। কিশোরগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক জহিরুল ইসলাম সেলিম বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখার আহ্বান জানিয়ে বলেন,

​"এই শ্মশান ও মঠ আমাদের দেড়শ বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ। মানবিকতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় এই অভিযোগের একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। অভিযোগের সত্যতা মিললে দখলকৃত জায়গা অবিলম্বে শ্মশান কর্তৃপক্ষের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া উচিত।"


​এদিকে, যাঁর বিরুদ্ধে এই ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থাপনার জমি দখলের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, তাঁর সাথে যোগাযোগের একাধিক চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর বক্তব্য জানা সম্ভব না হওয়ায় ধোঁয়াশা আরও ঘনীভূত হয়েছে।​


​সতাল মহাশ্মশানের পবিত্রতা, ধর্মীয় মর্যাদা এবং এই প্রাচীন নিদর্শনটি রক্ষায় এখন একমাত্র ভরসা প্রশাসন। স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, অবিলম্বে প্রশাসনকে এই বিষয়ে জরুরি হস্তক্ষেপ করতে হবে। দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে অবৈধ দখলমুক্ত করে শ্মশানের জমি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে ফিরিয়ে না দিলে ভবিষ্যতে এখানকার ধর্মীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনায় বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হতে পারে।


​একটি প্রাচীন শ্মশানের জমি ও মঠ দখলের এই ঘটনায় এলাকায় বর্তমানে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। সচেতন মহলের মতে, বিষয়টি কেবল জমির সীমানার নয়, বরং সামাজিক স্থিতিশীলতা ও ধর্মীয় সম্প্রীতির সুরক্ষার প্রশ্ন। প্রশাসন দ্রুত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়ে দেড়শ বছরের এই ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থাপনার নিরাপত্তা ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখবে—এমনটাই এখন আপামর কিশোরগঞ্জবাসীর প্রত্যাশা।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ