ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

নিয়ম নীতির তোয়াক্কা নেই খানপুর ৩০০ শয্যা হাসপাতালে: খোলা জায়গায় মেডিকেল বর্জ্যের স্তূপ, বাড়ছে সংক্রমণের ঝুঁকি



নিয়ম নীতির তোয়াক্কা নেই খানপুর ৩০০ শয্যা হাসপাতালে: খোলা জায়গায় মেডিকেল বর্জ্যের স্তূপ, বাড়ছে সংক্রমণের ঝুঁকি
ছবি: প্রতিনিধি

নারায়ণগঞ্জের খানপুর ৩০০ শয্যা হাসপাতালের পেছনে সাধারণ ময়লার সঙ্গে রক্তমাখা গজ, ব্যবহৃত সুচ-সিরিঞ্জ, গ্লাভস, মাস্ক, ব্যান্ডেজসহ মারাত্মক সংক্রমণক্ষম মেডিকেল বর্জ্য খোলা জায়গায় ফেলে রাখা হচ্ছে। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য ফেলায় হাসপাতালের চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের নির্ধারিত বর্জ্য ফেলার স্থানে সাধারণ ও মেডিকেল বর্জ্য একসঙ্গে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে আনা বর্জ্য একই জায়গায় ফেলায় সেখান থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। পাশেই রয়েছে পানি নিষ্কাশনের ড্রেন। স্থানীয়দের আশঙ্কা, বৃষ্টির সময় এসব বর্জ্যের দূষিত ও জীবাণুযুক্ত উপাদান ড্রেন হয়ে সরাসরি শীতলক্ষ্যা নদীতে মিশে পরিবেশ ও পানির মারাত্মক বিপর্যয় ঘটাচ্ছে।

হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে থাকা সাতটি বর্জ্যের ঝুড়িতে বর্জ্য আলাদা করার কোনো নিয়মই মানা হচ্ছে না। নিয়ম অনুযায়ী লাল ও নীল পাত্রে নির্দিষ্ট ধরনের বর্জ্য রাখার কথা থাকলেও, দেখা গেছে নীল রঙের পাত্রে রাখা হচ্ছে রক্তমাখা ব্যান্ডেজ ও রোগীর ব্যবহৃত কাপড়। আবার লাল রঙের পাত্রে ফেলা হচ্ছে ডাবের খোসাসহ সাধারণ ময়লা। পরবর্তীতে এসব বর্জ্য আলাদা না করেই হাসপাতালের পেছনে একই স্থানে এনে স্তূপ করা হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনেক সময় এসব ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য দুই থেকে সাত দিন পর্যন্ত খোলা অবস্থায় পড়ে থাকে। তবে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের দাবি, তারা এক দিন পরপর সাধারণ বর্জ্য অপসারণ করে।

হাসপাতালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা নজরুল ইসলাম সিটি করপোরেশনের ওপর দায় চাপিয়ে বলেন:

"আগে সিটি করপোরেশন প্রতিদিন সাধারণ বর্জ্য নিয়ে যেত। এখন নিয়মিত নেয় না। গত ১৫ দিনে মাত্র দুইবার বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রতিদিন বর্জ্য সরানো হলে এভাবে ময়লা জমে থাকত না।"

সাধারণ ও মেডিকেল বর্জ্য একসঙ্গে ফেলার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি আরও দাবি করেন, সংক্রমণক্ষম মেডিকেল বর্জ্য ‘প্রিজম’ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সংগ্রহ করে নিয়ে যায় এবং ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য আলাদাভাবে সংরক্ষণ করা হয়। তবে তার এই দাবির সঙ্গে বাস্তব চিত্রের কোনো মিল পাওয়া যায়নি। সরেজমিনে সাধারণ ময়লার স্তূপেই বিপুল পরিমাণ ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, রক্তমাখা গজ ও গ্লাভস পড়ে থাকতে দেখা গেছে।

যোগাযোগ করা হলে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবুল বাসার বলেন, "সাধারণ ও মেডিকেল বর্জ্য আলাদাভাবে সংরক্ষণের নিয়ম রয়েছে। তবে কখনো কখনো জরুরি বিভাগের কিছু রক্তযুক্ত বর্জ্য ভুল করে সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে চলে যায়। কয়েকজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর অসাবধানতার কারণেও এমনটি ঘটছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে।"

তিনি আরও জানান, হাসপাতালে একটি 'ইনসিনারেশন প্ল্যান্ট' (বর্জ্য পুড়িয়ে ফেলার আধুনিক ব্যবস্থা) স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এর টেন্ডার প্রক্রিয়া চলছে। এটি চালু হলে হাসপাতালেই নিরাপদভাবে মেডিকেল বর্জ্য ধ্বংস করা সম্ভব হবে।

এদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ অস্বীকার করে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা মো. আলমগীর হিরন বলেন, "হাসপাতালের সাধারণ বর্জ্য প্রায় প্রতিদিনই অপসারণ করা হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ সঠিক নয়। মূলত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই সাধারণ ও মেডিকেল বর্জ্য যথাযথভাবে আলাদা করে সংরক্ষণ করছে না, যার ফলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।"

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দুই সংস্থার এই কাদা ছোঁড়াছুড়ির অবসান ঘটিয়ে দ্রুত যদি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা না আনা হয়, তবে এই হাসপাতালটিই সাধারণ মানুষের জন্য বড় স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


নিয়ম নীতির তোয়াক্কা নেই খানপুর ৩০০ শয্যা হাসপাতালে: খোলা জায়গায় মেডিকেল বর্জ্যের স্তূপ, বাড়ছে সংক্রমণের ঝুঁকি

প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুলাই ২০২৬

featured Image

নারায়ণগঞ্জের খানপুর ৩০০ শয্যা হাসপাতালের পেছনে সাধারণ ময়লার সঙ্গে রক্তমাখা গজ, ব্যবহৃত সুচ-সিরিঞ্জ, গ্লাভস, মাস্ক, ব্যান্ডেজসহ মারাত্মক সংক্রমণক্ষম মেডিকেল বর্জ্য খোলা জায়গায় ফেলে রাখা হচ্ছে। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য ফেলায় হাসপাতালের চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী এবং সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের নির্ধারিত বর্জ্য ফেলার স্থানে সাধারণ ও মেডিকেল বর্জ্য একসঙ্গে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে আনা বর্জ্য একই জায়গায় ফেলায় সেখান থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। পাশেই রয়েছে পানি নিষ্কাশনের ড্রেন। স্থানীয়দের আশঙ্কা, বৃষ্টির সময় এসব বর্জ্যের দূষিত ও জীবাণুযুক্ত উপাদান ড্রেন হয়ে সরাসরি শীতলক্ষ্যা নদীতে মিশে পরিবেশ ও পানির মারাত্মক বিপর্যয় ঘটাচ্ছে।

হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে থাকা সাতটি বর্জ্যের ঝুড়িতে বর্জ্য আলাদা করার কোনো নিয়মই মানা হচ্ছে না। নিয়ম অনুযায়ী লাল ও নীল পাত্রে নির্দিষ্ট ধরনের বর্জ্য রাখার কথা থাকলেও, দেখা গেছে নীল রঙের পাত্রে রাখা হচ্ছে রক্তমাখা ব্যান্ডেজ ও রোগীর ব্যবহৃত কাপড়। আবার লাল রঙের পাত্রে ফেলা হচ্ছে ডাবের খোসাসহ সাধারণ ময়লা। পরবর্তীতে এসব বর্জ্য আলাদা না করেই হাসপাতালের পেছনে একই স্থানে এনে স্তূপ করা হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনেক সময় এসব ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য দুই থেকে সাত দিন পর্যন্ত খোলা অবস্থায় পড়ে থাকে। তবে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের দাবি, তারা এক দিন পরপর সাধারণ বর্জ্য অপসারণ করে।

হাসপাতালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা নজরুল ইসলাম সিটি করপোরেশনের ওপর দায় চাপিয়ে বলেন:

"আগে সিটি করপোরেশন প্রতিদিন সাধারণ বর্জ্য নিয়ে যেত। এখন নিয়মিত নেয় না। গত ১৫ দিনে মাত্র দুইবার বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রতিদিন বর্জ্য সরানো হলে এভাবে ময়লা জমে থাকত না।"

সাধারণ ও মেডিকেল বর্জ্য একসঙ্গে ফেলার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি আরও দাবি করেন, সংক্রমণক্ষম মেডিকেল বর্জ্য ‘প্রিজম’ নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সংগ্রহ করে নিয়ে যায় এবং ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য আলাদাভাবে সংরক্ষণ করা হয়। তবে তার এই দাবির সঙ্গে বাস্তব চিত্রের কোনো মিল পাওয়া যায়নি। সরেজমিনে সাধারণ ময়লার স্তূপেই বিপুল পরিমাণ ব্যবহৃত সিরিঞ্জ, রক্তমাখা গজ ও গ্লাভস পড়ে থাকতে দেখা গেছে।

যোগাযোগ করা হলে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবুল বাসার বলেন, "সাধারণ ও মেডিকেল বর্জ্য আলাদাভাবে সংরক্ষণের নিয়ম রয়েছে। তবে কখনো কখনো জরুরি বিভাগের কিছু রক্তযুক্ত বর্জ্য ভুল করে সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে চলে যায়। কয়েকজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর অসাবধানতার কারণেও এমনটি ঘটছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কঠোরভাবে সতর্ক করা হয়েছে।"

তিনি আরও জানান, হাসপাতালে একটি 'ইনসিনারেশন প্ল্যান্ট' (বর্জ্য পুড়িয়ে ফেলার আধুনিক ব্যবস্থা) স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এর টেন্ডার প্রক্রিয়া চলছে। এটি চালু হলে হাসপাতালেই নিরাপদভাবে মেডিকেল বর্জ্য ধ্বংস করা সম্ভব হবে।

এদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ অস্বীকার করে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা মো. আলমগীর হিরন বলেন, "হাসপাতালের সাধারণ বর্জ্য প্রায় প্রতিদিনই অপসারণ করা হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অভিযোগ সঠিক নয়। মূলত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই সাধারণ ও মেডিকেল বর্জ্য যথাযথভাবে আলাদা করে সংরক্ষণ করছে না, যার ফলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।"

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দুই সংস্থার এই কাদা ছোঁড়াছুড়ির অবসান ঘটিয়ে দ্রুত যদি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা না আনা হয়, তবে এই হাসপাতালটিই সাধারণ মানুষের জন্য বড় স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ