শেরপুর জেলায় গত দুই-তিন বছর ধরে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় নদী-নালা, খাল-বিল ও প্রাকৃতিক জলাশয়গুলোতে দেশীয় মাছের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এর ফলস্বরূপ মাছের বংশবিস্তারেও দেখা দিয়েছে চরম বিপর্যয়। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রভাবে জেলার শত শত জেলে আজ বেকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ঝিনাইগাতী উপজেলার সারিকালিনগর গ্রামের মাছ ব্যবসায়ী সাজল জানান, এলাকায় প্রাকৃতিক মাছ প্রায় নেই বললেই চলে; তাই ব্যবসার স্বার্থে জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে মাছ এনে বিক্রি করতে হয়। তিনি বলেন, দুই বছর আগেও কিছু দেশীয় মাছ পাওয়া গেলেও এবার জোগানও কম এবং দামও বেশি।
দিঘিরপাড়ের আলহাজ সোলায়মান আকন্দ মাছ কিনতে এসে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না থাকায় নদী-খাল শুকিয়ে গেছে। এতে যেমন প্রাকৃতিক মাছ ধ্বংস হয়েছে, তেমনি পরিবেশেরও মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। তাঁর মতে, জেলেরা পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে। এর ওপর শুরু হয়েছে বিল সেঁচে নির্বিচারে মাছ ধরা। এতে ছোট-বড় সবধরনের মাছ, পোনা, জলজ উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে। তিনি অভিযোগ করে আরও বলেন, বিল সেঁচে মাছ ধরা আইনত নিষিদ্ধ হলেও সংশ্লিষ্ট বিভাগ তেমন কোনো উদ্যোগ নেয় না এবং জনগণও এ নিয়ম সম্পর্কে সচেতন নয়।
সারিকালিনগর গ্রামের শান্ত শিফাত বলেন, বিলে সামান্য ছোট মাছ দেখা গেলেও জেলেরা অবাধে ধরে বিক্রি করছে এবং কেউ কেউ আবার বিল সেঁচে মাছ ধরছে। তিনি জানান, চায়না দোয়ারী জাল বা রিংনেটের ব্যাপক ব্যবহারে মা মাছসহ দেশীয় মাছ নির্বিচারে ধরা পড়ছে। ফলে প্রাকৃতিক প্রজনন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গারো পাহাড়ের নদী-নালা-খালে আগে প্রচুর প্রাকৃতিক মাছ পাওয়া যেত যা এখানে চাহিদা মিটিয়ে দেশের অন্য জায়গাতেও যেত; বর্তমানে অনাবৃষ্টি ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে মাছের টান পড়েছে। ঝিনাইগাতীর শতবর্ষী ডা. আব্দুল বারী ও আলহাজ সরোয়ার্দী দুদু মন্ডলসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বলেন, দশ-পনেরো বছর আগেও এলাকার ধলী, গজারমারী, নিশ্চিন্দা বিলসহ বিভিন্ন জলাশয়ে দশ-পনেরো কেজি ওজনের শোল, গজার, বোয়াল, আইর, চিতলসহ বড় বড় প্রাকৃতিক মাছ পাওয়া যেত। প্রচুর ছোট মাছও মিলত, এখন এসব কথা নতুন প্রজন্মের কাছে যেন ইতিহাস হয়ে গেছে।
এ বিষয়ে ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আশরাফুল আলম রাসেল বলেন, জুন মাসে বেশিরভাগ দেশীয় মাছ ডিম ছাড়ে এবং জুলাই–আগস্টে তা পোনা আকারে বড় হয়। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে মে থেকে জুলাই পর্যন্ত বৃষ্টি হয়নি। অতিরিক্ত তাপমাত্রায় অনেক মাছ ডিম ছাড়তেই পারেনি। জুলাইয়ের শেষে সামান্য বৃষ্টি হলেও তা পর্যাপ্ত ছিল না। ফলে কৈ, মাগুর, শিং, টেংরা, পুটি, দারকিনা, মলা, চেলা, ঢেলা, চিংড়ি—এসব ছোট মাছ ও বড় প্রজাতির মাছের বংশবিস্তারে মারাত্মক সংকট তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে শেরপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা প্রনব কুমার কর্মকার জানান, দেশীয় মাছ রক্ষায় জেলা মৎস্য বিভাগ ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে এবং বিল এলাকায় মৎস্য অভয়াশ্রম ও বিল নার্সারি স্থাপন করে দেশীয় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির চেষ্টা চলছে। ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আশরাফুল আলম রাসেল দৈনিক নববাণীকে বলেন, অভয়াশ্রম ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে চাষাবাদের মাধ্যমে প্রাকৃতিক মাছের সংকট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং তাঁরা আশা করছেন—আগামীতে পরিস্থিতি কিছুটা হলেও স্বাভাবিক হবে।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ নভেম্বর ২০২৫
শেরপুর জেলায় গত দুই-তিন বছর ধরে পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত না হওয়ায় নদী-নালা, খাল-বিল ও প্রাকৃতিক জলাশয়গুলোতে দেশীয় মাছের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এর ফলস্বরূপ মাছের বংশবিস্তারেও দেখা দিয়েছে চরম বিপর্যয়। এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রভাবে জেলার শত শত জেলে আজ বেকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ঝিনাইগাতী উপজেলার সারিকালিনগর গ্রামের মাছ ব্যবসায়ী সাজল জানান, এলাকায় প্রাকৃতিক মাছ প্রায় নেই বললেই চলে; তাই ব্যবসার স্বার্থে জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে মাছ এনে বিক্রি করতে হয়। তিনি বলেন, দুই বছর আগেও কিছু দেশীয় মাছ পাওয়া গেলেও এবার জোগানও কম এবং দামও বেশি।
দিঘিরপাড়ের আলহাজ সোলায়মান আকন্দ মাছ কিনতে এসে হতাশা প্রকাশ করে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না থাকায় নদী-খাল শুকিয়ে গেছে। এতে যেমন প্রাকৃতিক মাছ ধ্বংস হয়েছে, তেমনি পরিবেশেরও মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। তাঁর মতে, জেলেরা পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে। এর ওপর শুরু হয়েছে বিল সেঁচে নির্বিচারে মাছ ধরা। এতে ছোট-বড় সবধরনের মাছ, পোনা, জলজ উদ্ভিদ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক হুমকির মুখে। তিনি অভিযোগ করে আরও বলেন, বিল সেঁচে মাছ ধরা আইনত নিষিদ্ধ হলেও সংশ্লিষ্ট বিভাগ তেমন কোনো উদ্যোগ নেয় না এবং জনগণও এ নিয়ম সম্পর্কে সচেতন নয়।
সারিকালিনগর গ্রামের শান্ত শিফাত বলেন, বিলে সামান্য ছোট মাছ দেখা গেলেও জেলেরা অবাধে ধরে বিক্রি করছে এবং কেউ কেউ আবার বিল সেঁচে মাছ ধরছে। তিনি জানান, চায়না দোয়ারী জাল বা রিংনেটের ব্যাপক ব্যবহারে মা মাছসহ দেশীয় মাছ নির্বিচারে ধরা পড়ছে। ফলে প্রাকৃতিক প্রজনন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গারো পাহাড়ের নদী-নালা-খালে আগে প্রচুর প্রাকৃতিক মাছ পাওয়া যেত যা এখানে চাহিদা মিটিয়ে দেশের অন্য জায়গাতেও যেত; বর্তমানে অনাবৃষ্টি ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে মাছের টান পড়েছে। ঝিনাইগাতীর শতবর্ষী ডা. আব্দুল বারী ও আলহাজ সরোয়ার্দী দুদু মন্ডলসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা বলেন, দশ-পনেরো বছর আগেও এলাকার ধলী, গজারমারী, নিশ্চিন্দা বিলসহ বিভিন্ন জলাশয়ে দশ-পনেরো কেজি ওজনের শোল, গজার, বোয়াল, আইর, চিতলসহ বড় বড় প্রাকৃতিক মাছ পাওয়া যেত। প্রচুর ছোট মাছও মিলত, এখন এসব কথা নতুন প্রজন্মের কাছে যেন ইতিহাস হয়ে গেছে।
এ বিষয়ে ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আশরাফুল আলম রাসেল বলেন, জুন মাসে বেশিরভাগ দেশীয় মাছ ডিম ছাড়ে এবং জুলাই–আগস্টে তা পোনা আকারে বড় হয়। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে মে থেকে জুলাই পর্যন্ত বৃষ্টি হয়নি। অতিরিক্ত তাপমাত্রায় অনেক মাছ ডিম ছাড়তেই পারেনি। জুলাইয়ের শেষে সামান্য বৃষ্টি হলেও তা পর্যাপ্ত ছিল না। ফলে কৈ, মাগুর, শিং, টেংরা, পুটি, দারকিনা, মলা, চেলা, ঢেলা, চিংড়ি—এসব ছোট মাছ ও বড় প্রজাতির মাছের বংশবিস্তারে মারাত্মক সংকট তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে শেরপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা প্রনব কুমার কর্মকার জানান, দেশীয় মাছ রক্ষায় জেলা মৎস্য বিভাগ ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে এবং বিল এলাকায় মৎস্য অভয়াশ্রম ও বিল নার্সারি স্থাপন করে দেশীয় মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির চেষ্টা চলছে। ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আশরাফুল আলম রাসেল দৈনিক নববাণীকে বলেন, অভয়াশ্রম ও বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে চাষাবাদের মাধ্যমে প্রাকৃতিক মাছের সংকট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করা হচ্ছে এবং তাঁরা আশা করছেন—আগামীতে পরিস্থিতি কিছুটা হলেও স্বাভাবিক হবে।

আপনার মতামত লিখুন