ভরা মৌসুমে নদী ও সাগরে ইলিশ ধরার ব্যস্ততা থাকার কথা, বাজারেও থাকার কথা পর্যাপ্ত সরবরাহ। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। রাজধানীর খুচরা বাজারে ইলিশের সরবরাহ কম, বিশেষ করে বড় আকারের মাছের সংকটে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে এক কেজি বা তার বেশি ওজনের ইলিশ। সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে এই মাছ। উপকূলীয় মৎস্যঘাটেও বড় ইলিশ ধরা পড়লেই তা উঠছে অস্বাভাবিক দামে। দেশের বাজারে যখন এমন পরিস্থিতি, তখন পূজা উপলক্ষে ভারতের ব্যবসায়ীদের ইলিশ চাওয়ার খবর যেন বাজারের আগুনে ঘি ঢালার মতো, সরবরাহ নিয়ে নতুন করে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ, আর বাড়ছে দাম নিয়ে ক্রেতাদের শঙ্কা।বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী, ৩০০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের ছোট ইলিশ বা জাটকা বিক্রি হচ্ছে কেজিপ্রতি প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায়। ৫০০ থেকে ৭০০ গ্রামের ইলিশের দাম উঠেছে ১ হাজার ৮৯০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত। এক কেজি ওজনের ইলিশ কিনতে ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা। আর ১ থেকে দেড় কেজি বা তার বেশি ওজনের বড় ইলিশের দাম আকার ও মানভেদে ২ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠছে।চলতি মৌসুমে বড় আকারের ২ কেজি ৯০০ গ্রাম ওজনের এটি ইলিশ ১৭ হাজার টাকায় বিক্রির খবর পাওয়া যায়। একই দিন সকালে ২ কেজি ৭০০ গ্রামের আরও একটি ইলিশ ধরা পড়ে দক্ষিণের জেলা বরগুনার পাথরঘাটায়। এখানের বলেশ্বর নদীতে ধরা পড়া বিশাল আকৃতির রাজা ইলিশটি ১০ সেপ্টেম্বর সকালে পাথরঘাটা বিএফডিসি মৎস্য ঘাটে নিলামে ১৫ হাজার ৯৩০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এর মাত্র কয়েক দিন আগে ভোলার মনপুরায় মেঘনা নদীতে ধরা পড়ে আড়াই কেজি ওজনের একটি বিশাল ইলিশ। রামনেওয়াজ মৎস্যঘাটে নিলামে মাছটি বিক্রি হয় ১৫ হাজার টাকায়। পরে ঢাকার কারওয়ান বাজারের এক ব্যবসায়ীর কাছে একই মাছের দাম ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ওঠে।অর্থাৎ, ঘাট থেকে ঢাকার বাজার পর্যন্ত আসার পথে পরিবহন, বরফ, আড়তদারি, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের বিভিন্ন খরচ এবং মুনাফা যোগ হয়ে বড় ইলিশের দাম আরও বেড়ে যাচ্ছে। তবে শুধু বাজার ব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করলে ইলিশের বর্তমান সংকটের পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। এর পেছনে রয়েছে উৎপাদন ও প্রাপ্যতার মৌলিক সংকটও। ভোলার মৎস্য ব্যবসায়ী সাহাবুদ্দিন ফরাজি মনে করেন, দিন দিন ইলিশের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা কমে যাচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, ভোলার উজান ও সাগরের মোহনায় বেহুন্দি জালসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর জাল ব্যবহার করে মাছের বংশ ধ্বংস করা হচ্ছে। প্রভাবশালী এসব মহলের নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, তখন তারা সেই দলের ছত্রছায়ায় থেকে মাছের ছোট পোনা থেকে শুরু করে জাটকা ও মা ইলিশ পর্যন্ত নির্বিচারে আহরণ করে। তিনি বলেন, এভাবে অবাধে মাছ আহরণের কারণে শুধু ইলিশ নয়, অন্যান্য প্রজাতির মাছের প্রাপ্যতাও দিন দিন কমে যাচ্ছে। ফলে নদী ও সাগরে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন ও বংশবিস্তারের পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।বাংলাদেশ মৎস্যজীবী ফেডারেশনের মহাসচিব শাহ আলম মল্লিক বলেন, নানা কারণে বর্তমানে ইলিশের প্রাপ্যতায় ভয়াবহ সংকট দেখা দিয়েছে। সাগর থেকে নদীতে ইলিশের স্বাভাবিক চলাচলের পথ বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পাশাপাশি সাগরের মোহনায় বেহুন্দি জালসহ বিভিন্ন ক্ষতিকর জাল ব্যবহার করে নির্বিচারে মাছ নিধন করা হচ্ছে। শাহ আলম মল্লিকের অভিযোগ, বিশেষ করে ইউনূস সরকারের সময়ে নদীতে বাধাহীনভাবে মাছ নিধন চলায় ইলিশের সংকট আরও প্রকট হয়েছে। তাঁর মতে, ইলিশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র রক্ষা, ক্ষতিকর জালের ব্যবহার বন্ধ এবং নির্বিচারে মাছ আহরণ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যতে ইলিশসহ অন্যান্য দেশীয় মাছের সংকট আরও তীব্র হতে পারে।
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ইলিশের আকার ছোট হয়ে যাওয়া এবং বড় ইলিশের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে জাটকা নিধন। ইলিশের জীবনচক্রে ডিম ছাড়ার পর ছোট ইলিশ নদী থেকে সাগরের দিকে যাওয়ার পথে ব্যাপকভাবে ধরা পড়লে সেগুলো আর বড় হওয়ার সুযোগ পায় না। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ধরা পড়া ইলিশের গড় আকৃতি ছিল ১৪ দশমিক ৬৫ ইঞ্চি; ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে ১৩ দশমিক ৩৯ ইঞ্চিতে নেমেছে।বিশেষজ্ঞদের আরেকটি বড় উদ্বেগ নদীর পরিবেশ ও নাব্যতা। পদ্মা-মেঘনা অববাহিকায় পলি জমা, নাব্যতা কমে যাওয়া, চর ও ডুবোচরের সৃষ্টি এবং নদীর পানিদূষণের কারণে ইলিশের স্বাভাবিক চলাচল ও বিচরণক্ষেত্র ব্যাহত হচ্ছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাতও ইলিশের প্রজনন ও জীবনচক্রে প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যেও ইলিশের আবাসস্থল ও প্রজননক্ষেত্রের পরিবেশগত পরিবর্তনের বিষয়টি উঠে এসেছে। নদীতে অপরিকল্পিত অবকাঠামো, পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়া, দূষণ এবং ক্ষতিকর জাল ব্যবহারের কারণে ইলিশের চলাচল, প্রজনন ও খাদ্যগ্রহণের ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে নির্বিচারে জাটকা ও মা ইলিশ আহরণকে ইলিশসম্পদ কমে যাওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।বর্তমান বাজারে সবচেয়ে বেশি চাপ পড়েছে বড় ও মাঝারি আকারের ইলিশের ওপর। সাধারণ ক্রেতারা ভরা মৌসুমে তুলনামূলক কম দামে এক কেজি বা তার বেশি ওজনের ইলিশ পাওয়ার আশা করলেও সরবরাহ সেই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না। ফলে বড় ইলিশ বাজারে এলেই তা নিয়ে পাইকারি পর্যায়ে প্রতিযোগিতা তৈরি হচ্ছে।উপকূলীয় ঘাটে একেকটি বড় ইলিশের নিলামমূল্যই যখন ১৫ থেকে ১৭ হাজার টাকা ছাড়িয়ে যাচ্ছে, তখন ঢাকার খুচরা বাজারে সেই মাছের দাম আরও বেড়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। মনপুরার আড়াই কেজির ইলিশের ক্ষেত্রেও ঘাটের ১৫ হাজার টাকা থেকে ঢাকার কারওয়ান বাজারে দাম ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ওঠার ঘটনা সরবরাহ-শৃঙ্খলের বিভিন্ন স্তরে মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি সামনে এনেছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বাজারে অভিযান চালিয়ে বা খুচরা পর্যায়ে দাম নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে দীর্ঘমেয়াদে ইলিশের সংকট সমাধান করা যাবে না। ইলিশের প্রজনন ও বেড়ে ওঠার পরিবেশ রক্ষা, জাটকা নিধন বন্ধ, মা ইলিশ সংরক্ষণ এবং নদীর নাব্যতা ও পরিবেশ ফিরিয়ে আনার ওপর জোর দিতে হবে। কারণ আজ যে ছোট ইলিশটি নদীতে ধরা পড়ছে, সেটিই ভবিষ্যতে বড় ইলিশে পরিণত হতে পারত। জাটকা অবস্থায় সেই মাছ ধরা পড়লে শুধু একটি মাছ কমে না; কমে যায় ভবিষ্যৎ ইলিশের মজুতও। একইভাবে নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হলে ইলিশের প্রজনন ও চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়।তাই ভরা মৌসুমে বাজারে ইলিশের আকাল এবং চড়া দামকে কেবল সাময়িক বাজার সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ইলিশের উৎপাদন, প্রজনন, নদীর পরিবেশ এবং মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত একটি দীর্ঘমেয়াদি সংকেত। এখনই কার্যকর সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা জোরদার করা না গেলে ভবিষ্যতে বড় আকারের ইলিশ আরও দুর্লভ হয়ে উঠতে পারে, আর ‘মাছের রাজা’ ইলিশ হয়ে উঠতে পারে আরও বেশি মানুষের নাগালের বাইরে।
ভরা মৌসুমেও আকাল পাতে ওঠছে না ইলিশ
আমিনুল হক ভূইয়া
প্রকাশ: 12 সেপ্টেম্বর 2026, 17:30 আপডেট: 12 সেপ্টেম্বর 2026, 19:42 9 মিনিটে পড়ুন
23 বার পড়া
সম্পর্কিত সংবাদ



শ্রীমঙ্গলে ২১ বোতল ভারতীয় মদসহ ৩জন গ্রেপ্তার
1 ঘন্টা আগে




