তার হাতে গড়া ‘সারপুকুর যুব ফোরাম পাঠাগার’ বর্তমানে এলাকার প্রায় ১২০০ মানুষের জ্ঞানচর্চার সুযোগ তৈরি করেছে। বই পড়ার পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করার কাজও চলছে এই পাঠাগারকে কেন্দ্র করে।
জামালের এই পথচলার শুরু হয়েছিল একটি হতাশাজনক অভিজ্ঞতা থেকে। ২০১৩ সালে ঢাকায় জাতীয় কবিতা আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় অংশ নেন তিনি। আঞ্চলিক ভাষার টানের কারণে প্রথম রাউন্ডেই বাদ পড়েন। সে সময় বিচারকের পরামর্শে একটি বই সংগ্রহ করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন, নিজের এলাকায় বই পড়ার জন্য কোনো পাঠাগার নেই।
সেই অভাববোধ থেকেই নিজের এলাকায় একটি পাঠাগার গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেন জামাল। ২০১৪ সালে বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে মাত্র ৭৫০ টাকা পুঁজি করে প্রতিষ্ঠা করেন ‘সারপুকুর যুব ফোরাম পাঠাগার’। শুরুর সেই অর্থ এসেছিল মাটির ব্যাংকে জমানো খুচরো টাকা থেকে।
তবে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের মধ্যে পাঠাগার ও বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা সহজ ছিল না। বইকে মানুষের আরও কাছে নিয়ে যেতে ২০১৬ সালে জামাল নেন ব্যতিক্রমী এক উদ্যোগ।
তিনি লক্ষ্য করেন, স্থানীয় সেলুনগুলোতে চুল কাটার জন্য অপেক্ষার সময় মানুষকে দীর্ঘক্ষণ বসে থাকতে হয়। সেই অবসর সময়কে বই পড়ার কাজে লাগানোর চিন্তা থেকেই শুরু করেন ‘সেলুন লাইব্রেরি’। বিভিন্ন সেলুনে বিনামূল্যে বই দিয়ে সেখানে অপেক্ষমাণ মানুষের জন্য পড়ার সুযোগ তৈরি করেন।
ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগ পরবর্তী সময়ে ব্যাপক পরিচিতি পায়। জামালের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তার ‘সেলুন লাইব্রেরি’ ধারণা পরবর্তীতে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের ৬৪ জেলাতেও পরিচিতি লাভ করে।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সারপুকুর যুব ফোরাম পাঠাগারকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের আগ্রহও বেড়েছে। এখন অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের বই পড়া ও জ্ঞানচর্চার জন্য পাঠাগারে পাঠাচ্ছেন।
শুধু সাধারণ পাঠকের জন্য নয়, সমাজের পিছিয়ে পড়া ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীকেও পাঠাগারের কার্যক্রমে যুক্ত করার চেষ্টা করছেন জামাল। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৫২ জন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ এই পাঠাগারের মাধ্যমে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক চর্চার সুযোগ পাচ্ছেন।
বই পড়ার পাশাপাশি পাঠাগারটিতে বিভিন্ন ধরনের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে। কিশোরীদের বাল্যবিবাহ থেকে দূরে রাখা, সামাজিক অপরাধ সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি এবং তরুণ প্রজন্মকে ইতিবাচক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করতে কাজ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জামাল হোসেনের দাবি অনুযায়ী, তার সামাজিক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি হিসেবে দেশ-বিদেশ থেকে এখন পর্যন্ত ১৭টি সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। এর মধ্যে রয়েছে গ্লোবাল হেলথ ইমপ্যাক্ট অ্যাওয়ার্ড, স্বপ্নযাত্রা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড এবং ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইয়ুথ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ডটি তিনি নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের হাত থেকে গ্রহণ করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কবি নজরুল সরকারি কলেজের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী জামাল হোসেনের স্বপ্ন এখন আরও বড় পরিসরে জ্ঞানচর্চার সুযোগ তৈরি করা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বই ও পাঠাগারকেন্দ্রিক এমন উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়ুক—এটাই তার প্রত্যাশা।
মাটির ব্যাংকে জমানো মাত্র ৭৫০ টাকা থেকে যে উদ্যোগের সূচনা হয়েছিল, সেই সারপুকুর যুব ফোরাম পাঠাগার এখন প্রত্যন্ত জনপদের বহু মানুষের বই, শিক্ষা ও সংস্কৃতিচর্চার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।








