কিশোরগঞ্জে লাল-সবুজের নতুন কান্ডারি খোঁজার মেলা, বাফুফের অনূর্ধ্ব-১৫
চারপাশের গ্যালারিতে ভেসে আসা করতালির শব্দ আর মাঠজুড়ে শত শত কিশোরের অবিরাম দৌড়ঝাঁপে রচিত হচ্ছিল এক স্বপ্ন গাঁথা।
সকালের শিশিরভেজা সবুজ ঘাস আর রক্তিম সূর্যের আলোয় সেজেছিল ঐতিহাসিক কিশোরগঞ্জ পুরাতন স্টেডিয়াম। চারপাশের গ্যালারিতে ভেসে আসা করতালির শব্দ আর মাঠজুড়ে শত শত কিশোরের অবিরাম দৌড়ঝাঁপে রচিত হচ্ছিল এক স্বপ্ন গাঁথা। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে)-এর পরিচালিত জেলা ও আঞ্চলিক পর্যায়ের বিভিন্ন একাডেমির উদীয়মান অনূর্ধ্ব-১৫ বালক ফুটবলারদের মধ্য থেকে সেরা ২৫ জন প্রতিভাবান খেলোয়াড় বাছাইয়ের লক্ষ্যে দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয়েছে এক উৎসবমুখর কার্যক্রম। গ্রাম-বাংলার ধুলোবালি ঘেঁষে গড়ে ওঠা কিশোরদের চোখে ছিল লাল-সবুজ জার্সি গায়ে বিশ্বমঞ্চে ফুটবল খেলার এক বুক লালিত স্বপ্ন।
বাছাই পর্বের এই বিশেষ কর্মযজ্ঞকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই শহরের ঐতিহ্যবাহী পুরাতন স্টেডিয়াম এলাকা পরিণত হয়েছিল উদীয়মান ফুটবলার ও ক্রীড়াপ্রেমীদের মিলনমেলায়। জেলা ও আশেপাশের উপজেলার নিবন্ধিত বিভিন্ন ফুটবল একাডেমি থেকে আগত দেড় শতাধিক প্রতিশ্রুতিশীল কিশোর ফুটবলার এতে অংশগ্রহণ করে। বয়স ও শারীরবৃত্তীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ করে প্রত্যেকে তাদের পছন্দের পজিশনে প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে মাঠে নামে। বল ড্রিবলিং, পাসিং একুরেসি, পজিশনিং, দূরদর্শী ভিশন এবং শারীরিক সহনশীলতার (স্ট্যামিনা) ওপর ভিত্তি করে বিচারকরা নিবিড়ভাবে তাদের নৈপুণ্য পর্যবেক্ষণ করেন।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের অভিজ্ঞ কোচ ও টেকনিক্যাল প্যানেলের প্রতিনিধিরা মাঠের চারপাশে থেকে নিখুঁতভাবে উদীয়মান খেলোয়াড়দের ফুটবলীয় দক্ষতা মূল্যায়ন করেন। একাধিক ড্রিল ও পূর্ণাঙ্গ ট্রায়াল ম্যাচের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই শেষে সেরা ২৫ জন উদীয়মান ফুটবলারকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়। বাছাইকৃত এই সেরা ২৫ ফুটবলার পরবর্তীতে বাফুফের উন্নত ও দীর্ঘমেয়াদী নিবিড় আবাসিক প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবে, যা তাদের জাতীয় অনূর্ধ্ব-১৫ দলসহ জাতীয় ফুটবলের মূল ধারায় উঠে আসার পথ সুগম করবে।বাছাই কার্যক্রমের উদ্বোধনী ও সমাপনী পর্বে উপস্থিত ছিলেন জেলা ক্রীড়া সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ, বিশিষ্ট ক্রীড়াবিদ, সাবেক ফুটবলার ও স্থানীয় ক্রীড়া সংগঠকগণ। আমন্ত্রিত অতিথিরা কিশোরগঞ্জের ফুটবলের গৌরবময় ইতিহাসের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, "কিশোরগঞ্জের মাটি বরাবরই জাতীয় দল ও দেশের ক্রীড়াঙ্গনে অনেক তারকা ফুটবলার উপহার দিয়েছে। আজকের এই প্রান্তিক পর্যায়ের অনূর্ধ্ব-১৫ খেলোয়াড়দের প্রতিভার উন্মেষ প্রমাণ করে যে, সুযোগ ও সঠিক পরিচর্যা পেলে আমাদের প্রত্যন্ত এলাকার ছেলেরা এ দেশের ফুটবলের মুখ উজ্জ্বল করবে।" বাফুফের কোচিং প্যানেলও কিশোরগঞ্জের কিশোরদের স্বাভাবিক নৈপুণ্য ও ফুটবলের প্রতি প্রবল আবেগের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
মাঠে ট্রায়াল দিতে আসা তরুণদের চোখে-মুখে ছিল আত্মবিশ্বাস ও দারুণ উদ্দীপনা। মাঠের এক কোণে ঘেমে-নেয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণ খেলোয়াড় অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে বলে, "কঠোর অনুশীলন করে আজ ট্রায়াল দিতে এসেছি। আমাদের একটাই লক্ষ্য—জাতীয় দলের হয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় দেশের পতাকা উঁচু করে ধরা। এমন আধুনিক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় বাছাই কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হওয়ায় আমাদের মতো সাধারণ পরিবারের ছেলেদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস বহুগুণ বেড়ে গেছে।"
আন্তর্জাতিক মানের ফুটবল তৈরি করার ক্ষেত্রে মূল ভিত্তি বা ‘গ্রাসরুট’ হলো সঠিক বয়সভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত প্রতিভা অন্বেষণ। জাতীয় পর্যায়ে ফুটবলের হারানো ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করতে হলে জেলা পর্যায়ে নিয়মিত এমন উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী। অভিজ্ঞ ফুটবল বিশেষজ্ঞদের মতে, কিশোরগঞ্জ পুরাতন স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত বাফুফের এই সুনির্দিষ্ট ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির নির্বাচন কার্যক্রম কেবল জেলার ফুটবলকে বেগবান করবে না, বরং দেশের জাতীয় দল গঠনের পাইপলাইনকেও শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ করবে।
দিনব্যাপী তুমুল উত্তেজনা, আনন্দ আর স্বপ্নের এই প্রতিযোগিতা শেষে সেরা ২৫ ফুটবলারের তালিকা প্রকাশের মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটে বাছাই কার্যক্রমের। বিজয়ী ফুটবলারদের মুখচ্ছবিতে ছিল আগামী দিনের মাঠ কাঁপানোর দৃঢ় অঙ্গীকার। কিশোরগঞ্জের প্রবীণ ও নবীন ক্রীড়ামোদী দর্শকরা শুভকামনা জানান এই উদীয়মান তারকাদের, যাদের পায়ে ভর করে দেশের ফুটবল পা রাখবে এক নতুন স্বরবর্ণময় দিগন্তে।tapashmainul70@gmail.com








