জাতীয়

হামের প্রাদুর্ভাবে নতুন উদ্বেগ, টিকার ঘাটতিতে বাড়ছে ঝুঁকি

দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা প্রায় ভুলতে বসেছিল মানুষ। কিন্তু চলতি বছর হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি হয়েছে।

⎙ প্রিন্ট
হামের প্রাদুর্ভাবে নতুন উদ্বেগ, টিকার ঘাটতিতে বাড়ছে ঝুঁকি

দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা প্রায় ভুলতে বসেছিল মানুষ। কিন্তু চলতি বছর হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সংকট তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কয়েক বছর ধরে টিকাদানের ঘাটতি জমতে থাকা, নিয়মিত টিকাদানে কাঙ্ক্ষিত কভারেজ না হওয়া এবং শিশুদের মধ্যে প্রতিরোধক্ষমতার ফাঁক তৈরি হওয়াই বর্তমান প্রাদুর্ভাবের অন্যতম কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় সংক্রমণের তথ্য পাওয়া যায়। ওই সময় হাজারের বেশি সন্দেহভাজন রোগী এবং ২ হাজার ৮৯৭টি পরীক্ষাগারে নিশ্চিত সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছিল। পরিস্থিতি আরও তীব্র হয় পরবর্তী মাসগুলোতে। ১৪ জুন পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, ১৫ মার্চের পর থেকে ৮৫ হাজার ৯৫১ জন সন্দেহভাজন হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১০ হাজার ৩২৩ জনের সংক্রমণ পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হয়। একই সময়ে ৯২টি নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যুর তথ্যও রেকর্ড করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের মতো অত্যন্ত সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে খুব উচ্চমাত্রার টিকাদান কভারেজ প্রয়োজন। ইউনিসেফ বলছে, শিশুদের অন্তত ৯৫ শতাংশকে দুই ডোজ হাম টিকার আওতায় আনতে না পারলে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ বা জনসমষ্টিগত প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে ২০২০ সালে বড় পরিসরে হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি হয়েছিল। ওই কর্মসূচিতে ৯ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য ছিল। এরপর কয়েক বছরে নিয়মিত টিকাদানের কভারেজে ঘাটতি জমতে থাকায় নতুন প্রজন্মের শিশুদের একটি বড় অংশ ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, হাম-রুবেলা টিকার দ্বিতীয় ডোজের কভারেজ ২০১৯ সালের ৮৯ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে ৮০ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসে। সংস্থাটি বলছে, এই ঘাটতির কারণে বিপুলসংখ্যক শিশু সংক্রমণের ঝুঁকিতে থেকে যায় এবং কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ আরও বড় হয়। বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। প্রথমে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী ১২ লাখের বেশি শিশুকে টিকার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে কর্মসূচি দেশব্যাপী সম্প্রসারণ করা হয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু জরুরি ক্যাম্পেইন নয়, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির কভারেজও দ্রুত বাড়াতে হবে। যেসব শিশু প্রথম কিংবা দ্বিতীয় ডোজ থেকে বাদ পড়েছে, তাদের দ্রুত শনাক্ত করে টিকার আওতায় না আনলে ভবিষ্যতেও হামের প্রাদুর্ভাব ফিরে আসতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি, হাঁচি বা শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে এটি দ্রুত ছড়ায়। জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ি এর সাধারণ উপসর্গ হলেও শিশুদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, অপুষ্টি ও অন্যান্য গুরুতর জটিলতা তৈরি হতে পারে। টিকাই হামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা। বর্তমান প্রাদুর্ভাব তাই শুধু একটি সংক্রামক রোগের সংকট নয়, বরং নিয়মিত টিকাদানের ফাঁক দ্রুত পূরণ এবং শিশুদের প্রতিরোধক্ষমতা পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তাকেও নতুন করে সামনে এনেছে।

 

সম্পর্কিত সংবাদ