আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিতর্কিত কর্মকাণ্ড, নির্যাতন ও হত্যা মামলার অভিযোগে অভিযুক্ত একাধিক পুলিশ কর্মকর্তাকে ফের গুরুত্বপূর্ণ থানায় ওসি ও এসপি পদে পদায়ন করায় বাহিনীর ভেতরে বাড়ছে ক্ষোভ ও অসন্তোষ। বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক বিবেচনায় সুবিধাভোগীদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে, যা পুলিশের ভাবমূর্তি ও ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের চেতনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
২০২৩ সালের ২৬ আগস্ট যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ‘থানার এসি-টিভি খুলে বাসায় নিলেন ওসি’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদন। প্রতিবেদনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন মুহাম্মদ ফরিদুল ইসলাম, যিনি তখন ভূঞাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। অভিযোগ ছিল, বদলির আদেশ পাওয়ার পর তিনি থানা থেকে এসি, টেলিভিশন, আইপিএস ও সোফা সেট সরিয়ে নিজের বাসায় নিয়ে যান। ঘটনাটি প্রকাশ্যে এলে তাকে ভূঞাপুর থানা থেকে প্রত্যাহার করে জেলা পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত সেই ফরিদুল ইসলাম বর্তমানে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বনানী থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের পদায়নের মাধ্যমে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে গোটা পুলিশ প্রশাসনের। প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে।
এদিকে ফরিদুল ইসলাম বলেন , ভূঞাপুর থানা থেকে জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়ার খবরটি ওই সময় মিডিয়ায় অতিরঞ্জিতভাবে ছাপা হয়েছিল। তিনি নিজেকে বঞ্চিতও দাবি করেন। অপরদিকে আওয়ামী শাসনামলে বঞ্চনার শিকার পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ। তাদের অভিযোগ, পদায়নের ক্ষেত্রে বঞ্চিতদের উপেক্ষা করে হাসিনা সরকারের সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদেরই প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
শুধু ফরিদুল ইসলাম একা নন; আওয়ামী আমলের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তারা ফের বিভিন্ন থানায় ওসির দায়িত্ব পাচ্ছেন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে যাদের ঢাকা থেকে দূরবর্তী স্টেশনে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছিল, তাদের পদায়ন দেওয়া হচ্ছে ঢাকায়। পুলিশের উচ্চপর্যায়কে ম্যানেজ করেই এসব পদায়ন হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সাবেক আইজিপি নূরুল হুদা যুগান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের শেষের দিকে পুলিশ চরম ভাবমূর্তি সংকটে পড়ে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর সেই ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলানো হয়। সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হচ্ছে, তাতে পুলিশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার কঠিন হয়ে যাবে।
দুটি হত্যা মামলার আসামি মোহাম্মদ মাহবুব আলম খানকে ৫ মে ফেনীর পুলিশ সুপার (এসপি) হিসাবে পদায়ন করা হয়। পতিত আওয়ামী সরকারের আমলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ছিলেন তিনি। ওই সময় তার বিরুদ্ধে বিএনপি-জামায়াতের কর্মসূচিতে বাধা, হামলা ও বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর ব্যাপক নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে মাহবুবের কর্মকাণ্ড সামনে আসে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আদালত ও থানায় তার বিরুদ্ধে দুটি হত্যা মামলা করেন ভুক্তভোগীরা। এর মধ্যে জেলার শিবগঞ্জ থানার যুবদল নেতা মিজান হত্যা মামলা উল্লেখযোগ্য। ওই মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের ২৭ এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ থানায় পুলিশের কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন মিজান। এ ঘটনায় নিহতের বাবা আইনাল হক ২০২৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর শিবগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা করেন। ওই মামলার ১০ নম্বর আসামি মাহবুব আলম খান। ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর ফিরোজ আহমেদ নামে আরও একজন ভুক্তভোগী বাদী হয়ে শিবগঞ্জ থানায় অপর হত্যা মামলাটি করেন। ওই মামলায় ১২ জন আসামির মধ্যে মাহবুব আলম খানের নাম ৩ নম্বরে।
মাহবুব আলম খান বলেন, আমার বিরুদ্ধে যে দুটি হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছিল তার সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমাকে আসামি করা হয়। আমি আশা করছি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগ থেকে রেহাই পাব। ফেনী জেলায় কবে যোগদান করবেন-জানতে চাইলে বলেন, ‘আইজিপি মহোদয় যেদিন বলবেন, সেদিন।’
নিজেদের বঞ্চিত দাবি করে বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ‘বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আমাদের ‘ব্ল্যাকলিস্টেড’ করে রাখা হয়েছিল। ছাত্রজীবনে ছাত্রদল করা বা বিএনপিপন্থি পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে আমাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। কোনো গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে পদায়নও দেওয়া হয়নি। বিএনপি সরকার গঠনের পর আমরা আশায় বুক বেঁধেছিলাম। কিন্তু অদৃশ্য ইশারায় ফ্যাসিবাদের দোসররা ফের পুনর্বাসন হচ্ছে।’
কামরুজ্জামান এখন রাজধানীর মতিঝিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ থানার ওসি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কুমিল্লার বাঙ্গুরা বাজার থানা ও মুরাদনগর থানার ওসি হিসাবে চার বছর দায়িত্ব পালন করেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের শেষের দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া নবীনগর থানার ওসি ছিলেন মাহাবুব রহমান। ৯ এপ্রিল তাকে পদায়ন করা হয়েছে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানায় ওসি হিসাবে। মাহাবুব রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আমলে বঞ্চিত ছিলাম। মাত্র ৮-৯ মাস ওসিগিরি করার সুযোগ পেয়েছি।’
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মাদারীপুরের শিবচর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) এবং উপপরিদর্শক (এসআই) হিসাবে চাকরি করেছেন আমির হোসেন সেরনিয়াবাত। ২৪ মার্চ তিনি একই থানার ওসি হিসাবে দায়িত্ব পান। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হলে যোগদানের ৪ দিনের মাথায় তাকে প্রত্যাহার করা হয়।
২০২২ সালের ৩১ জুলাই বিএনপির বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নিয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ভোলা জেলা ছাত্রদল সভাপতি নুরে আলম। এ ঘটনায় ২০২২ সালের ৪ আগস্ট ভোলা সদর থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) আরমান হোসেনসহ ৩৬ পুলিশ সদস্যের নামে হত্যা মামলা হয়। সেই আরমান হোসেনকে সম্প্রতি কক্সবাজারের রামু থানার ওসি হিসাবে পদায়নের বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তাকে সেখানে ওসি হিসাবে পদায়ন করা হয়নি।
নূর হোসেন মামুন এবং আতিকুর রহমান। তারা দুজনই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দাপটের সঙ্গে ওসি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানায়। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা-মামলায় তারা ছিলেন পারদর্শী। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের আগে মামুন ছিলেন চট্টগ্রাম জোরারগঞ্জ থানার ওসি। এখন তিনি ওসি হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটনের চান্দগাঁও থানায়। আতিকুর রহমান ছিলেন ফ্যাসিস্টের আমলে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া থানার ওসি। তিনি এখন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) ইপিজেড থানার ওসি।
আব্দুল মজিদ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মুক্তাগাছা ও নান্দাইল থানায় ওসি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের সময়ও তিনি ওসি ছিলেন। ৩০ এপ্রিল তাকে নেত্রকোনার কেন্দুয়া থানার ওসি হিসাবে পদায়ন করা হয়। এ নিয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হলে এক দিনের মাথায় তাকে পরিবর্তন করে জেলা পুলিশে সংযুক্ত করা হয়।
গুলশান থানার ওসি ওসি দাউদ খান। ২০১৫ সাল থেকেই ডিএমপি ডিবিতে কর্মরত ছিলেন তিনি। গণ-অভ্যুত্থানের পর ডিএমপির সব কর্মকর্তাদের ঢাকার বাইরে পাঠানো হলেও তিনি থেকে যান ঢাকাতেই। হন খিলগাঁও থানার ওসি। সেখান থেকে পদায়ন করা হয় ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি হিসাবে। গত মাসে গুলশান থানায় ওসি হিসাবে পদায়ন করা হয় তাকে। এছাড়া ঢাকার আশুলিয়া, সাভার, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জের বন্দর, সোনারগাঁ, চট্টগ্রাম এবং ময়মনসিংহ রেঞ্জের কয়েকটি থানাসহ সারা দেশে বেশকিছু থানার ওসি পদায়নে খোদ পুলিশের ভেতর থেকে এরই মধ্যে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (প্রশাসন) আবু রায়হান মুহাম্মদ সালেহ যুগান্তরকে বলেন, ‘কয়েকদিন আগে আমি প্রশাসন বিভাগের দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। এখনো সবকিছু বুঝে উঠতে পারিনি। আগে বিষয়গুলো বুঝে নিই, পরে মন্তব্য করব।’

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ মে ২০২৬
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিতর্কিত কর্মকাণ্ড, নির্যাতন ও হত্যা মামলার অভিযোগে অভিযুক্ত একাধিক পুলিশ কর্মকর্তাকে ফের গুরুত্বপূর্ণ থানায় ওসি ও এসপি পদে পদায়ন করায় বাহিনীর ভেতরে বাড়ছে ক্ষোভ ও অসন্তোষ। বঞ্চিত কর্মকর্তাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক বিবেচনায় সুবিধাভোগীদের পুনর্বাসন করা হচ্ছে, যা পুলিশের ভাবমূর্তি ও ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের চেতনাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
২০২৩ সালের ২৬ আগস্ট যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ‘থানার এসি-টিভি খুলে বাসায় নিলেন ওসি’ শিরোনামের একটি প্রতিবেদন। প্রতিবেদনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন মুহাম্মদ ফরিদুল ইসলাম, যিনি তখন ভূঞাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। অভিযোগ ছিল, বদলির আদেশ পাওয়ার পর তিনি থানা থেকে এসি, টেলিভিশন, আইপিএস ও সোফা সেট সরিয়ে নিজের বাসায় নিয়ে যান। ঘটনাটি প্রকাশ্যে এলে তাকে ভূঞাপুর থানা থেকে প্রত্যাহার করে জেলা পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত করা হয়। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত সেই ফরিদুল ইসলাম বর্তমানে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বনানী থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের পদায়নের মাধ্যমে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে গোটা পুলিশ প্রশাসনের। প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকে।
এদিকে ফরিদুল ইসলাম বলেন , ভূঞাপুর থানা থেকে জিনিসপত্র নিয়ে যাওয়ার খবরটি ওই সময় মিডিয়ায় অতিরঞ্জিতভাবে ছাপা হয়েছিল। তিনি নিজেকে বঞ্চিতও দাবি করেন। অপরদিকে আওয়ামী শাসনামলে বঞ্চনার শিকার পুলিশ কর্মকর্তাদের মধ্যে বাড়ছে ক্ষোভ। তাদের অভিযোগ, পদায়নের ক্ষেত্রে বঞ্চিতদের উপেক্ষা করে হাসিনা সরকারের সুবিধাভোগী কর্মকর্তাদেরই প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
শুধু ফরিদুল ইসলাম একা নন; আওয়ামী আমলের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিতর্কিত পুলিশ কর্মকর্তারা ফের বিভিন্ন থানায় ওসির দায়িত্ব পাচ্ছেন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে যাদের ঢাকা থেকে দূরবর্তী স্টেশনে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছিল, তাদের পদায়ন দেওয়া হচ্ছে ঢাকায়। পুলিশের উচ্চপর্যায়কে ম্যানেজ করেই এসব পদায়ন হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সাবেক আইজিপি নূরুল হুদা যুগান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের শেষের দিকে পুলিশ চরম ভাবমূর্তি সংকটে পড়ে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর সেই ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চলানো হয়। সাম্প্রতিক সময়ে যেভাবে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা হচ্ছে, তাতে পুলিশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার কঠিন হয়ে যাবে।
দুটি হত্যা মামলার আসামি মোহাম্মদ মাহবুব আলম খানকে ৫ মে ফেনীর পুলিশ সুপার (এসপি) হিসাবে পদায়ন করা হয়। পতিত আওয়ামী সরকারের আমলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ছিলেন তিনি। ওই সময় তার বিরুদ্ধে বিএনপি-জামায়াতের কর্মসূচিতে বাধা, হামলা ও বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর ব্যাপক নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে মাহবুবের কর্মকাণ্ড সামনে আসে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের আদালত ও থানায় তার বিরুদ্ধে দুটি হত্যা মামলা করেন ভুক্তভোগীরা। এর মধ্যে জেলার শিবগঞ্জ থানার যুবদল নেতা মিজান হত্যা মামলা উল্লেখযোগ্য। ওই মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালের ২৭ এপ্রিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ থানায় পুলিশের কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন মিজান। এ ঘটনায় নিহতের বাবা আইনাল হক ২০২৪ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর শিবগঞ্জ থানায় হত্যা মামলা করেন। ওই মামলার ১০ নম্বর আসামি মাহবুব আলম খান। ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর ফিরোজ আহমেদ নামে আরও একজন ভুক্তভোগী বাদী হয়ে শিবগঞ্জ থানায় অপর হত্যা মামলাটি করেন। ওই মামলায় ১২ জন আসামির মধ্যে মাহবুব আলম খানের নাম ৩ নম্বরে।
মাহবুব আলম খান বলেন, আমার বিরুদ্ধে যে দুটি হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছিল তার সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমাকে আসামি করা হয়। আমি আশা করছি সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগ থেকে রেহাই পাব। ফেনী জেলায় কবে যোগদান করবেন-জানতে চাইলে বলেন, ‘আইজিপি মহোদয় যেদিন বলবেন, সেদিন।’
নিজেদের বঞ্চিত দাবি করে বেশ কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, ‘বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আমাদের ‘ব্ল্যাকলিস্টেড’ করে রাখা হয়েছিল। ছাত্রজীবনে ছাত্রদল করা বা বিএনপিপন্থি পরিবারের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণে আমাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। কোনো গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে পদায়নও দেওয়া হয়নি। বিএনপি সরকার গঠনের পর আমরা আশায় বুক বেঁধেছিলাম। কিন্তু অদৃশ্য ইশারায় ফ্যাসিবাদের দোসররা ফের পুনর্বাসন হচ্ছে।’
কামরুজ্জামান এখন রাজধানীর মতিঝিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ থানার ওসি। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কুমিল্লার বাঙ্গুরা বাজার থানা ও মুরাদনগর থানার ওসি হিসাবে চার বছর দায়িত্ব পালন করেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের শেষের দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া নবীনগর থানার ওসি ছিলেন মাহাবুব রহমান। ৯ এপ্রিল তাকে পদায়ন করা হয়েছে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানায় ওসি হিসাবে। মাহাবুব রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আমলে বঞ্চিত ছিলাম। মাত্র ৮-৯ মাস ওসিগিরি করার সুযোগ পেয়েছি।’
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মাদারীপুরের শিবচর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) এবং উপপরিদর্শক (এসআই) হিসাবে চাকরি করেছেন আমির হোসেন সেরনিয়াবাত। ২৪ মার্চ তিনি একই থানার ওসি হিসাবে দায়িত্ব পান। এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হলে যোগদানের ৪ দিনের মাথায় তাকে প্রত্যাহার করা হয়।
২০২২ সালের ৩১ জুলাই বিএনপির বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নিয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ভোলা জেলা ছাত্রদল সভাপতি নুরে আলম। এ ঘটনায় ২০২২ সালের ৪ আগস্ট ভোলা সদর থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) আরমান হোসেনসহ ৩৬ পুলিশ সদস্যের নামে হত্যা মামলা হয়। সেই আরমান হোসেনকে সম্প্রতি কক্সবাজারের রামু থানার ওসি হিসাবে পদায়নের বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তাকে সেখানে ওসি হিসাবে পদায়ন করা হয়নি।
নূর হোসেন মামুন এবং আতিকুর রহমান। তারা দুজনই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দাপটের সঙ্গে ওসি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানায়। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা-মামলায় তারা ছিলেন পারদর্শী। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের আগে মামুন ছিলেন চট্টগ্রাম জোরারগঞ্জ থানার ওসি। এখন তিনি ওসি হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটনের চান্দগাঁও থানায়। আতিকুর রহমান ছিলেন ফ্যাসিস্টের আমলে চট্টগ্রামের লোহাগাড়া থানার ওসি। তিনি এখন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) ইপিজেড থানার ওসি।
আব্দুল মজিদ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মুক্তাগাছা ও নান্দাইল থানায় ওসি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের সময়ও তিনি ওসি ছিলেন। ৩০ এপ্রিল তাকে নেত্রকোনার কেন্দুয়া থানার ওসি হিসাবে পদায়ন করা হয়। এ নিয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হলে এক দিনের মাথায় তাকে পরিবর্তন করে জেলা পুলিশে সংযুক্ত করা হয়।
গুলশান থানার ওসি ওসি দাউদ খান। ২০১৫ সাল থেকেই ডিএমপি ডিবিতে কর্মরত ছিলেন তিনি। গণ-অভ্যুত্থানের পর ডিএমপির সব কর্মকর্তাদের ঢাকার বাইরে পাঠানো হলেও তিনি থেকে যান ঢাকাতেই। হন খিলগাঁও থানার ওসি। সেখান থেকে পদায়ন করা হয় ক্যান্টনমেন্ট থানার ওসি হিসাবে। গত মাসে গুলশান থানায় ওসি হিসাবে পদায়ন করা হয় তাকে। এছাড়া ঢাকার আশুলিয়া, সাভার, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জের বন্দর, সোনারগাঁ, চট্টগ্রাম এবং ময়মনসিংহ রেঞ্জের কয়েকটি থানাসহ সারা দেশে বেশকিছু থানার ওসি পদায়নে খোদ পুলিশের ভেতর থেকে এরই মধ্যে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (প্রশাসন) আবু রায়হান মুহাম্মদ সালেহ যুগান্তরকে বলেন, ‘কয়েকদিন আগে আমি প্রশাসন বিভাগের দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। এখনো সবকিছু বুঝে উঠতে পারিনি। আগে বিষয়গুলো বুঝে নিই, পরে মন্তব্য করব।’

আপনার মতামত লিখুন