ঢাকা    মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

দুর্গাপুরে মঙ্গল শোভাযাত্রা দিয়ে বর্ণাঢ্য আয়োজনে নববর্ষ ১৪৩৩ পালিত



দুর্গাপুরে মঙ্গল শোভাযাত্রা দিয়ে বর্ণাঢ্য আয়োজনে নববর্ষ ১৪৩৩ পালিত
ছবি : বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩ দুর্গাপুরে মঙ্গল শোভাযাত্রা দিয়ে বর্ণাঢ্য আয়োজন

পুরোনো বছরের গ্লানি, জীর্ণতা ও বেদনা পেছনে ফেলে নতুন স্বপ্ন, আশা আর উদ্দীপনাকে বুকে ধারণ করে শুরু হলো বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩-এর যাত্রা। ভোরের কোমল সোনালি আলোয় রাজশাহীর দুর্গাপুর যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায়। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ, প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখকে ঘিরে আনন্দে মুখর হয়ে ওঠে পুরো জনপদ।

বাংলা সনের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশের অন্যতম সর্বজনীন লোকজ উৎসব। ইতিহাসের পরতে পরতে জড়িয়ে থাকা এই দিনটি কেবল একটি তারিখ নয়, বরং বাঙালির আত্মপরিচয়, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গভীর বহিঃপ্রকাশ। ১৫৫৬ সালে মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনামলে খাজনা আদায়কে সহজ করার লক্ষ্যে প্রবর্তিত ফসলি সন থেকেই বাংলা সনের সূচনা, যা পরবর্তীতে বঙ্গাব্দ নামে পরিচিতি লাভ করে। কৃষিনির্ভর সমাজে হালখাতা, খাজনা পরিশোধ ও গ্রামীণ মেলার মধ্য দিয়ে নববর্ষ উদযাপনের যে ঐতিহ্য শুরু হয়েছিল, তা আজ সময়ের পরিবর্তনে রূপ নিয়েছে এক বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক উৎসবে।

আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে কিছু ঐতিহ্য ম্লান হয়ে এলেও পহেলা বৈশাখ এখনো বাঙালির প্রাণের উৎসব হিসেবেই অটুট রয়েছে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে এই দিনটি সবাইকে একসূত্রে গেঁথে দেয়। এটি অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সম্প্রীতি ও মিলনের এক উজ্জ্বল প্রতীক।

পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে রাজশাহী-৫ (দুর্গাপুর-পুঠিয়া) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মন্ডল ও দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাশতুরা আমিনা পৃথক বাণীতে এলাকাবাসীকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানান। তাদের বক্তব্যে উঠে আসে বাংলা নববর্ষের ঐতিহ্যগত গুরুত্ব, ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা এবং গ্রামীণ সংস্কৃতিকে ধরে রাখার আহ্বান।

দুর্গাপুর উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ৮টা থেকে শুরু হয় দিনব্যাপী কর্মসূচি। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মন্ডল এবং সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাশতুরা আমিনা। শুরুতেই জাতীয় সংগীতের সঙ্গে পরিবেশিত হয় ‘এসো হে বৈশাখ’, যা নতুন বছরের আগমনী বার্তাকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।

এরপর বের করা হয় বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা, যা ছিল দিনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ। ‘শান্তি, সৃজন, গৌরব ও গতিময়তা’র প্রতীকী বার্তা নিয়ে রঙিন মুখোশ, প্রতিকৃতি, প্ল্যাকার্ড ও বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে শোভাযাত্রাটি পুরো এলাকায় ঘুরে বেড়ায়। এতে অংশ নেয় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সর্বস্তরের মানুষ। শোভাযাত্রার মাধ্যমে অশুভ শক্তির বিনাশ ও একটি কল্যাণময় ভবিষ্যতের প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়।

একই সঙ্গে উদ্বোধন করা হয় বৈশাখী মেলা, যেখানে স্থান পেয়েছে গ্রামীণ ঐতিহ্যের নানা উপকরণ, হস্তশিল্প ও মুখরোচক খাবারের স্টল। শিশু-কিশোরদের জন্য আয়োজন করা হয় বিভিন্ন গ্রামীণ খেলাধুলা, যেমন বলিখেলা, লাঠিখেলা, হা-ডু-ডু, দড়ি টানাটানি ইত্যাদি, যা নতুন প্রজন্মকে গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করে।

দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে স্থানীয় শিল্পী ও উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির সদস্যরা পরিবেশন করেন গান, কবিতা আবৃত্তি ও নৃত্য। ‘শান্তি, মানবতা ও সম্প্রীতি’ প্রতিপাদ্যে সম্মিলিত সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়া হয়, যা উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ করে।

শুধু উপজেলা সদর নয়, গ্রামবাংলার প্রতিটি কোণেও বইতে থাকে বৈশাখী উৎসবের হাওয়া। বিভিন্ন স্থানে বসে বৈশাখী মেলা, আয়োজন করা হয় নানা লোকজ খেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে গ্রামীণ জীবনের সহজ-সরল আনন্দ নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়।

উৎসবকে কেন্দ্র করে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপর উপস্থিতিতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সকলেই নির্বিঘ্নে উৎসব উপভোগ করতে পারেন।

সব মিলিয়ে, আনন্দ, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির এক অপূর্ব মেলবন্ধনে দুর্গাপুরে উদযাপিত হলো বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩। এই উৎসব শুধু নতুন বছরকে বরণই করেনি, বরং বাঙালির শেকড়, ঐক্য এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়কে নতুন করে দৃঢ় করেছে।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬


দুর্গাপুরে মঙ্গল শোভাযাত্রা দিয়ে বর্ণাঢ্য আয়োজনে নববর্ষ ১৪৩৩ পালিত

প্রকাশের তারিখ : ১৪ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

পুরোনো বছরের গ্লানি, জীর্ণতা ও বেদনা পেছনে ফেলে নতুন স্বপ্ন, আশা আর উদ্দীপনাকে বুকে ধারণ করে শুরু হলো বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩-এর যাত্রা। ভোরের কোমল সোনালি আলোয় রাজশাহীর দুর্গাপুর যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায়। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ, প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখকে ঘিরে আনন্দে মুখর হয়ে ওঠে পুরো জনপদ।

বাংলা সনের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ বাংলাদেশের অন্যতম সর্বজনীন লোকজ উৎসব। ইতিহাসের পরতে পরতে জড়িয়ে থাকা এই দিনটি কেবল একটি তারিখ নয়, বরং বাঙালির আত্মপরিচয়, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গভীর বহিঃপ্রকাশ। ১৫৫৬ সালে মুঘল সম্রাট আকবরের শাসনামলে খাজনা আদায়কে সহজ করার লক্ষ্যে প্রবর্তিত ফসলি সন থেকেই বাংলা সনের সূচনা, যা পরবর্তীতে বঙ্গাব্দ নামে পরিচিতি লাভ করে। কৃষিনির্ভর সমাজে হালখাতা, খাজনা পরিশোধ ও গ্রামীণ মেলার মধ্য দিয়ে নববর্ষ উদযাপনের যে ঐতিহ্য শুরু হয়েছিল, তা আজ সময়ের পরিবর্তনে রূপ নিয়েছে এক বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক উৎসবে।

আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে কিছু ঐতিহ্য ম্লান হয়ে এলেও পহেলা বৈশাখ এখনো বাঙালির প্রাণের উৎসব হিসেবেই অটুট রয়েছে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে এই দিনটি সবাইকে একসূত্রে গেঁথে দেয়। এটি অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সম্প্রীতি ও মিলনের এক উজ্জ্বল প্রতীক।

পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে রাজশাহী-৫ (দুর্গাপুর-পুঠিয়া) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মন্ডল ও দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাশতুরা আমিনা পৃথক বাণীতে এলাকাবাসীকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানান। তাদের বক্তব্যে উঠে আসে বাংলা নববর্ষের ঐতিহ্যগত গুরুত্ব, ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা এবং গ্রামীণ সংস্কৃতিকে ধরে রাখার আহ্বান।

দুর্গাপুর উপজেলা প্রশাসনের আয়োজনে মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ৮টা থেকে শুরু হয় দিনব্যাপী কর্মসূচি। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম মন্ডল এবং সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাশতুরা আমিনা। শুরুতেই জাতীয় সংগীতের সঙ্গে পরিবেশিত হয় ‘এসো হে বৈশাখ’, যা নতুন বছরের আগমনী বার্তাকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।

এরপর বের করা হয় বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা, যা ছিল দিনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ। ‘শান্তি, সৃজন, গৌরব ও গতিময়তা’র প্রতীকী বার্তা নিয়ে রঙিন মুখোশ, প্রতিকৃতি, প্ল্যাকার্ড ও বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে শোভাযাত্রাটি পুরো এলাকায় ঘুরে বেড়ায়। এতে অংশ নেয় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সর্বস্তরের মানুষ। শোভাযাত্রার মাধ্যমে অশুভ শক্তির বিনাশ ও একটি কল্যাণময় ভবিষ্যতের প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়।

একই সঙ্গে উদ্বোধন করা হয় বৈশাখী মেলা, যেখানে স্থান পেয়েছে গ্রামীণ ঐতিহ্যের নানা উপকরণ, হস্তশিল্প ও মুখরোচক খাবারের স্টল। শিশু-কিশোরদের জন্য আয়োজন করা হয় বিভিন্ন গ্রামীণ খেলাধুলা, যেমন বলিখেলা, লাঠিখেলা, হা-ডু-ডু, দড়ি টানাটানি ইত্যাদি, যা নতুন প্রজন্মকে গ্রামীণ সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করে।

দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে স্থানীয় শিল্পী ও উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির সদস্যরা পরিবেশন করেন গান, কবিতা আবৃত্তি ও নৃত্য। ‘শান্তি, মানবতা ও সম্প্রীতি’ প্রতিপাদ্যে সম্মিলিত সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়া হয়, যা উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ করে।

শুধু উপজেলা সদর নয়, গ্রামবাংলার প্রতিটি কোণেও বইতে থাকে বৈশাখী উৎসবের হাওয়া। বিভিন্ন স্থানে বসে বৈশাখী মেলা, আয়োজন করা হয় নানা লোকজ খেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে গ্রামীণ জীবনের সহজ-সরল আনন্দ নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়।

উৎসবকে কেন্দ্র করে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয় বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপর উপস্থিতিতে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সকলেই নির্বিঘ্নে উৎসব উপভোগ করতে পারেন।

সব মিলিয়ে, আনন্দ, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সম্প্রীতির এক অপূর্ব মেলবন্ধনে দুর্গাপুরে উদযাপিত হলো বাংলা নববর্ষ ১৪৩৩। এই উৎসব শুধু নতুন বছরকে বরণই করেনি, বরং বাঙালির শেকড়, ঐক্য এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়কে নতুন করে দৃঢ় করেছে।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০২৪১০৯১৭৩০
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: 01711-070054

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ