বরিশালের গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের অন্তত অর্ধশতাধিক যুবকের ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন এখন লিবিয়ায় বন্দি হয়ে পড়েছে। জিম্মি অবস্থায় সেখানে তাদের মানবেতর দিন কাটছে বলে স্বজনরা জানিয়েছেন। গত বছরের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মুক্তিপণ দিয়ে লিবিয়া থেকে ১৫ যুবক দেশে ফিরেছেন। তাদের অধিকাংশই প্রতারণা ও মানব পাচারের ঘটনায় আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এদিকে ইতালি পাঠানোর নামে বরিশালের তিন যুবককে লিবিয়ায় পাচার করে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং মুক্তিপণসহ প্রত্যেকের কাছ থেকে ২৪ লাখ টাকা করে হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে মানব পাচার চক্রের পাঁচ সদস্যের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও তিন-চারজনকে আসামি করে বরিশাল মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
সম্প্রতি দেশে ফিরে এসে গত ৮ ফেব্রুয়ারি আগৈলঝাড়া উপজেলার রাজিহার ইউনিয়নের ছোট ডুমুরিয়া গ্রামের মেহেদী হাসান খান, গত ২৫ জানুয়ারি গৌরনদী উপজেলার খাঞ্জাপুর ইউনিয়নের মাগুরা মাদারীপুর গ্রামের আব্দুল হামিদ এবং গত ৫ জানুয়ারি পশ্চিম সমরসিংহ গ্রামের আব্দুর রহিম সরদার বাদী হয়ে পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করেন।
ট্রাইব্যুনালের বিচারক অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া থানার ওসিকে মামলা রুজুর নির্দেশ দেন।
মামলার আসামিরা হলেন গৌরনদী উপজেলার খাঞ্জাপুর ইউনিয়নের পশ্চিম ডুমুরিয়া গ্রামের মৃত আইউব আলীর ছেলে জামাল মোল্লা (৫০), তার ইতালি প্রবাসী দুই ছেলে জাকির মোল্লা (৩৫) ও সাকিব মোল্লা (৩৩), এবং জামাল মোল্লার দুই শ্যালক পূর্ব ডুমুরিয়া গ্রামের মৃত বুদাই বেপারীর ছেলে বাবুল বেপারী (৪৫) ও হাবুল বেপারী ওরফে হাবুল মেম্বার (৪২)।
গৌরনদী থানায় তদন্তাধীন দুটি মানব পাচার মামলার আসামি জামাল মোল্লা ও তার দুই শ্যালক বাবুল বেপারী এবং হাবুল বেপারী বর্তমানে বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন। আর জামালের দুই ছেলে ইতালিতে অবস্থান করায় মামলার তদন্ত কিছুটা ধীরগতিতে চলছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
মামলার বাদীদের অভিযোগ অনুযায়ী, জামাল মোল্লা তাদের কাছে দাবি করেন- ১৬ লাখ টাকা দিলে তার ইতালি প্রবাসী দুই ছেলে জাকির ও সাকিবের মাধ্যমে বৈধ ওয়ার্ক পারমিট দিয়ে ইতালিতে চাকরির ব্যবস্থা করা হবে। এই আশ্বাসে ভরসা করে অনেকেই জমি বিক্রি, ঋণ ও ধারদেনা করে সাক্ষীদের উপস্থিতিতে নগদ টাকা দেন। পরে আসামিদের দেওয়া পূবালী ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা পাঠিয়ে প্রত্যেকে মোট ১৬ লাখ টাকা পরিশোধ করেন।
বাদী মেহেদী হাসান জানান, গত ২৬ আগস্ট তাকে ইতালির উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ থেকে পাঠিয়ে প্রথমে সৌদি আরব নেওয়া হয়। সেখান থেকে মিশর হয়ে লিবিয়ায় নিয়ে অজ্ঞাতস্থানে আটকে রাখা হয়। ঠিকমতো খাবার না দিয়ে তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। পরে লিবিয়ার পুলিশ দিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করিয়ে বেনগাজির বাংকিনা কারাগারে পাঠানো হয়। সেখানে তিনি প্রায় দেড় মাস বন্দি ছিলেন।
পরবর্তীতে বিভিন্ন লোকের মোবাইল ব্যবহার করে ভিডিও কলে পরিবারের সদস্যদের কাছে নিজের করুণ অবস্থার কথা জানান মেহেদী। কিন্তু তার কোনো খোঁজ না পেয়ে স্বজনরা দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা দাবি করে—মেহেদীকে ইতালি কোস্টগার্ড রিসিভ করেছে।
এর কিছুদিন পর মেহেদীর পরিবারকে ৮ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে মেহেদীকে হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়। পরে স্বজনরা ধারদেনা করে টাকা জোগাড় করে গত ৪ জানুয়ারি তাকে দেশে ফিরিয়ে আনেন। দেশে ফিরে মেহেদী জানতে পারেন, তার মতো আরও ১৫ যুবক ইতোমধ্যে দেশে ফিরেছেন, তবে অনেকেই এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
এদিকে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা জানান, ঋণ, ধারদেনা ও জমি বিক্রি করে দালাল চক্রের সদস্যদের কাছে গৌরনদী উপজেলার প্রায় ৬০ যুবক ও আগৈলঝাড়া উপজেলার ১০ যুবকসহ কয়েক জেলার মোট ১০৮ জন যুবক ১৫ থেকে ১৮ লাখ টাকা করে দিয়ে ভূমধ্যসাগর হয়ে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন।
দালালরা গত বছরের ৮ ও ২২ সেপ্টেম্বর রাতে লিবিয়ার বেনগাজি থেকে তিনটি স্পিডবোটে তাদের ইতালির উদ্দেশ্যে পাঠায়। প্রায় ১০ থেকে ২০ ঘণ্টা চলার পর লিবিয়া কোস্টগার্ড ওই স্পিডবোটগুলো আটক করে ১০৮ বাংলাদেশিকে বন্দি করে বাংকিনা কারাগারের পাশে একটি গ্যারেজে আটকে রাখে।
এ খবর পেয়ে গত ১৬ অক্টোবর গৌরনদীতে দালাল জাকির মোল্লার বাড়িতে জড়ো হয়ে নিখোঁজ যুবকদের স্বজনরা বিক্ষোভ করেন। তারা জাকিরের মা ও বোনকে গৃহবন্দি করে প্রতিবাদ জানান। পরে মানব পাচার চক্রের মূলহোতা জাকির মোল্লা ৭০ যুবককে কারাগার থেকে বের করে দালালদের জিম্মায় রাখে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ১৫ জন দেশে ফিরেছেন।
গৌরনদী থানার ওসি তারিক হাসান রাসেল বলেন, থানায় দায়ের হওয়া দুটি মানব পাচার মামলার তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এজাহারভুক্ত তিন আসামি বর্তমানে বরিশাল কারাগারে রয়েছেন এবং দুই আসামি বিদেশে অবস্থান করছেন।
মেহেদীর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আগৈলঝাড়া থানার এসআই মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক তদন্তে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। আসামি জামাল মোল্লা ও বাবুল বেপারী কারাগারে আছেন, হাবুল বেপারী পলাতক এবং অপর দুই আসামি বিদেশে অবস্থান করছেন।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ মার্চ ২০২৬
বরিশালের গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রামের অন্তত অর্ধশতাধিক যুবকের ইতালি যাওয়ার স্বপ্ন এখন লিবিয়ায় বন্দি হয়ে পড়েছে। জিম্মি অবস্থায় সেখানে তাদের মানবেতর দিন কাটছে বলে স্বজনরা জানিয়েছেন। গত বছরের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মুক্তিপণ দিয়ে লিবিয়া থেকে ১৫ যুবক দেশে ফিরেছেন। তাদের অধিকাংশই প্রতারণা ও মানব পাচারের ঘটনায় আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এদিকে ইতালি পাঠানোর নামে বরিশালের তিন যুবককে লিবিয়ায় পাচার করে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং মুক্তিপণসহ প্রত্যেকের কাছ থেকে ২৪ লাখ টাকা করে হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে মানব পাচার চক্রের পাঁচ সদস্যের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও তিন-চারজনকে আসামি করে বরিশাল মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
সম্প্রতি দেশে ফিরে এসে গত ৮ ফেব্রুয়ারি আগৈলঝাড়া উপজেলার রাজিহার ইউনিয়নের ছোট ডুমুরিয়া গ্রামের মেহেদী হাসান খান, গত ২৫ জানুয়ারি গৌরনদী উপজেলার খাঞ্জাপুর ইউনিয়নের মাগুরা মাদারীপুর গ্রামের আব্দুল হামিদ এবং গত ৫ জানুয়ারি পশ্চিম সমরসিংহ গ্রামের আব্দুর রহিম সরদার বাদী হয়ে পৃথক তিনটি মামলা দায়ের করেন।
ট্রাইব্যুনালের বিচারক অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া থানার ওসিকে মামলা রুজুর নির্দেশ দেন।
মামলার আসামিরা হলেন গৌরনদী উপজেলার খাঞ্জাপুর ইউনিয়নের পশ্চিম ডুমুরিয়া গ্রামের মৃত আইউব আলীর ছেলে জামাল মোল্লা (৫০), তার ইতালি প্রবাসী দুই ছেলে জাকির মোল্লা (৩৫) ও সাকিব মোল্লা (৩৩), এবং জামাল মোল্লার দুই শ্যালক পূর্ব ডুমুরিয়া গ্রামের মৃত বুদাই বেপারীর ছেলে বাবুল বেপারী (৪৫) ও হাবুল বেপারী ওরফে হাবুল মেম্বার (৪২)।
গৌরনদী থানায় তদন্তাধীন দুটি মানব পাচার মামলার আসামি জামাল মোল্লা ও তার দুই শ্যালক বাবুল বেপারী এবং হাবুল বেপারী বর্তমানে বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন। আর জামালের দুই ছেলে ইতালিতে অবস্থান করায় মামলার তদন্ত কিছুটা ধীরগতিতে চলছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
মামলার বাদীদের অভিযোগ অনুযায়ী, জামাল মোল্লা তাদের কাছে দাবি করেন- ১৬ লাখ টাকা দিলে তার ইতালি প্রবাসী দুই ছেলে জাকির ও সাকিবের মাধ্যমে বৈধ ওয়ার্ক পারমিট দিয়ে ইতালিতে চাকরির ব্যবস্থা করা হবে। এই আশ্বাসে ভরসা করে অনেকেই জমি বিক্রি, ঋণ ও ধারদেনা করে সাক্ষীদের উপস্থিতিতে নগদ টাকা দেন। পরে আসামিদের দেওয়া পূবালী ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন অ্যাকাউন্টে ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা পাঠিয়ে প্রত্যেকে মোট ১৬ লাখ টাকা পরিশোধ করেন।
বাদী মেহেদী হাসান জানান, গত ২৬ আগস্ট তাকে ইতালির উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ থেকে পাঠিয়ে প্রথমে সৌদি আরব নেওয়া হয়। সেখান থেকে মিশর হয়ে লিবিয়ায় নিয়ে অজ্ঞাতস্থানে আটকে রাখা হয়। ঠিকমতো খাবার না দিয়ে তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। পরে লিবিয়ার পুলিশ দিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করিয়ে বেনগাজির বাংকিনা কারাগারে পাঠানো হয়। সেখানে তিনি প্রায় দেড় মাস বন্দি ছিলেন।
পরবর্তীতে বিভিন্ন লোকের মোবাইল ব্যবহার করে ভিডিও কলে পরিবারের সদস্যদের কাছে নিজের করুণ অবস্থার কথা জানান মেহেদী। কিন্তু তার কোনো খোঁজ না পেয়ে স্বজনরা দালালদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা দাবি করে—মেহেদীকে ইতালি কোস্টগার্ড রিসিভ করেছে।
এর কিছুদিন পর মেহেদীর পরিবারকে ৮ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে মেহেদীকে হত্যা করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়। পরে স্বজনরা ধারদেনা করে টাকা জোগাড় করে গত ৪ জানুয়ারি তাকে দেশে ফিরিয়ে আনেন। দেশে ফিরে মেহেদী জানতে পারেন, তার মতো আরও ১৫ যুবক ইতোমধ্যে দেশে ফিরেছেন, তবে অনেকেই এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
এদিকে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা জানান, ঋণ, ধারদেনা ও জমি বিক্রি করে দালাল চক্রের সদস্যদের কাছে গৌরনদী উপজেলার প্রায় ৬০ যুবক ও আগৈলঝাড়া উপজেলার ১০ যুবকসহ কয়েক জেলার মোট ১০৮ জন যুবক ১৫ থেকে ১৮ লাখ টাকা করে দিয়ে ভূমধ্যসাগর হয়ে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন।
দালালরা গত বছরের ৮ ও ২২ সেপ্টেম্বর রাতে লিবিয়ার বেনগাজি থেকে তিনটি স্পিডবোটে তাদের ইতালির উদ্দেশ্যে পাঠায়। প্রায় ১০ থেকে ২০ ঘণ্টা চলার পর লিবিয়া কোস্টগার্ড ওই স্পিডবোটগুলো আটক করে ১০৮ বাংলাদেশিকে বন্দি করে বাংকিনা কারাগারের পাশে একটি গ্যারেজে আটকে রাখে।
এ খবর পেয়ে গত ১৬ অক্টোবর গৌরনদীতে দালাল জাকির মোল্লার বাড়িতে জড়ো হয়ে নিখোঁজ যুবকদের স্বজনরা বিক্ষোভ করেন। তারা জাকিরের মা ও বোনকে গৃহবন্দি করে প্রতিবাদ জানান। পরে মানব পাচার চক্রের মূলহোতা জাকির মোল্লা ৭০ যুবককে কারাগার থেকে বের করে দালালদের জিম্মায় রাখে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে ১৫ জন দেশে ফিরেছেন।
গৌরনদী থানার ওসি তারিক হাসান রাসেল বলেন, থানায় দায়ের হওয়া দুটি মানব পাচার মামলার তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। এজাহারভুক্ত তিন আসামি বর্তমানে বরিশাল কারাগারে রয়েছেন এবং দুই আসামি বিদেশে অবস্থান করছেন।
মেহেদীর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আগৈলঝাড়া থানার এসআই মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক তদন্তে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। আসামি জামাল মোল্লা ও বাবুল বেপারী কারাগারে আছেন, হাবুল বেপারী পলাতক এবং অপর দুই আসামি বিদেশে অবস্থান করছেন।

আপনার মতামত লিখুন