ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

ফাঁসির রায় টিকছে না উচ্চ আদালতে


নিজস্ব প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিবেদন
প্রকাশ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ফাঁসির রায় টিকছে না উচ্চ আদালতে

সাজা নির্ধারণে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাবে বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডাদেশের বড় অংশই হাইকোর্টে বাতিল হয়ে যাচ্ছে — এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে আইন কমিশনের পরিসংখ্যানে।

আইন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে হাইকোর্টে নিষ্পত্তি হওয়া ৫৭টি ডেথ রেফারেন্স মামলার মধ্যে ৩৮টিতেই মৃত্যুদণ্ড বাতিল হয়েছে, যা মোট মামলার ৬৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ। কেবল ১৯টি মামলায় মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল ছিল। পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে ২০২৫ সালে। ওই বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত নিষ্পত্তি হওয়া ২২টি ডেথ রেফারেন্স মামলার মধ্যে ১৯টিতেই মৃত্যুদণ্ড বাতিল করা হয়েছে, যা ৮৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ। এই সময়কালে ফাঁসির দণ্ড বহাল ছিল মাত্র তিনটি মামলায়।

বাস্তব উদাহরণেও এই প্রবণতা স্পষ্ট। রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলা মামলায় বিচারিক আদালত আটজনকে মৃত্যুদণ্ড ও ছয়জনকে যাবজ্জীবন সাজা দিলেও হাইকোর্ট গত বছরের মে মাসে ১৪ আসামির মধ্যে নয়জনের সাজা কমিয়ে ১০ বছর কারাদণ্ড দেয় এবং একজনের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন করে। জয়পুরহাটের একটি হত্যা মামলায় সাতজনের মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে হাইকোর্টে একজনের বাদে বাকিদের সাজা কমানো হয়। এছাড়া ২০১৩ সালে শাহ আলী থানার এএসআই হুমায়ুন কবির হত্যা মামলায় দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড ও একজনের যাবজ্জীবন সাজা থাকলেও ২০২৩ সালে হাইকোর্ট সব আসামিকে খালাস দেয়।

আইন কমিশন বলছে, ফৌজদারি আইনে অপরাধের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন সাজার সীমা নির্ধারিত থাকলেও সাজা প্রদানের শুনানির কোনো সুনির্দিষ্ট বিধান বা নীতিমালা নেই। ফলে বিচারকরা নিজ বিবেচনায় সাজা দেন, যা বিচারকভেদে অসমতার জন্ম দিচ্ছে এবং ন্যায়বিচার বিঘ্নিত হচ্ছে। কমিশন ইতোমধ্যে একটি খসড়া নীতিমালা প্রস্তুত করে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে পাঠিয়েছে।

'রাষ্ট্র বনাম লাভলু' মামলায় হাইকোর্ট বলেছেন, চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক শেষে রায়ের তারিখ ধার্য না করে সাজা নির্ধারণে পৃথক শুনানির ব্যবস্থা রাখা দরকার। সেই শুনানিতে অপরাধীর বয়স, চরিত্র, অপরাধের প্রকৃতি, বিচার বিলম্বসহ নানা বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে, যাতে অপরাধী সংশোধনের সুযোগ পান।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও বার কাউন্সিল এক্সিকিউটিভ কমিটির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, নীতিমালা না থাকায় অপরাধে সম্পৃক্ততা কম এমন ব্যক্তিও অনেক সময় সর্বোচ্চ শাস্তি পান, যা ন্যায়বিচারের পরিপন্থি। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. শিশির মনির বলেন, নীতিমালা থাকলে বিচারকের একক মনমতো রায়ের সুযোগ থাকত না এবং সাজা প্রদানে বৈষম্যও দূর হত।

উল্লেখ্য, ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরসহ অনেক দেশে সাজার পরিমাণ নির্ধারণে পৃথক শুনানির বিধান রয়েছে। বাংলাদেশে ১৯৭৮ সালে এই বিধান চালু হলেও মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে তা বাতিল করা হয়।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


ফাঁসির রায় টিকছে না উচ্চ আদালতে

প্রকাশের তারিখ : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

featured Image

সাজা নির্ধারণে সুনির্দিষ্ট নীতিমালার অভাবে বিচারিক আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ডাদেশের বড় অংশই হাইকোর্টে বাতিল হয়ে যাচ্ছে — এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে আইন কমিশনের পরিসংখ্যানে।

আইন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে হাইকোর্টে নিষ্পত্তি হওয়া ৫৭টি ডেথ রেফারেন্স মামলার মধ্যে ৩৮টিতেই মৃত্যুদণ্ড বাতিল হয়েছে, যা মোট মামলার ৬৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ। কেবল ১৯টি মামলায় মৃত্যুদণ্ডাদেশ বহাল ছিল। পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে ২০২৫ সালে। ওই বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত নিষ্পত্তি হওয়া ২২টি ডেথ রেফারেন্স মামলার মধ্যে ১৯টিতেই মৃত্যুদণ্ড বাতিল করা হয়েছে, যা ৮৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ। এই সময়কালে ফাঁসির দণ্ড বহাল ছিল মাত্র তিনটি মামলায়।

বাস্তব উদাহরণেও এই প্রবণতা স্পষ্ট। রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলা মামলায় বিচারিক আদালত আটজনকে মৃত্যুদণ্ড ও ছয়জনকে যাবজ্জীবন সাজা দিলেও হাইকোর্ট গত বছরের মে মাসে ১৪ আসামির মধ্যে নয়জনের সাজা কমিয়ে ১০ বছর কারাদণ্ড দেয় এবং একজনের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন করে। জয়পুরহাটের একটি হত্যা মামলায় সাতজনের মৃত্যুদণ্ডের মধ্যে হাইকোর্টে একজনের বাদে বাকিদের সাজা কমানো হয়। এছাড়া ২০১৩ সালে শাহ আলী থানার এএসআই হুমায়ুন কবির হত্যা মামলায় দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড ও একজনের যাবজ্জীবন সাজা থাকলেও ২০২৩ সালে হাইকোর্ট সব আসামিকে খালাস দেয়।

আইন কমিশন বলছে, ফৌজদারি আইনে অপরাধের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন সাজার সীমা নির্ধারিত থাকলেও সাজা প্রদানের শুনানির কোনো সুনির্দিষ্ট বিধান বা নীতিমালা নেই। ফলে বিচারকরা নিজ বিবেচনায় সাজা দেন, যা বিচারকভেদে অসমতার জন্ম দিচ্ছে এবং ন্যায়বিচার বিঘ্নিত হচ্ছে। কমিশন ইতোমধ্যে একটি খসড়া নীতিমালা প্রস্তুত করে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে পাঠিয়েছে।

'রাষ্ট্র বনাম লাভলু' মামলায় হাইকোর্ট বলেছেন, চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক শেষে রায়ের তারিখ ধার্য না করে সাজা নির্ধারণে পৃথক শুনানির ব্যবস্থা রাখা দরকার। সেই শুনানিতে অপরাধীর বয়স, চরিত্র, অপরাধের প্রকৃতি, বিচার বিলম্বসহ নানা বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে, যাতে অপরাধী সংশোধনের সুযোগ পান।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও বার কাউন্সিল এক্সিকিউটিভ কমিটির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, নীতিমালা না থাকায় অপরাধে সম্পৃক্ততা কম এমন ব্যক্তিও অনেক সময় সর্বোচ্চ শাস্তি পান, যা ন্যায়বিচারের পরিপন্থি। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. শিশির মনির বলেন, নীতিমালা থাকলে বিচারকের একক মনমতো রায়ের সুযোগ থাকত না এবং সাজা প্রদানে বৈষম্যও দূর হত।

উল্লেখ্য, ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, কানাডা, নিউজিল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরসহ অনেক দেশে সাজার পরিমাণ নির্ধারণে পৃথক শুনানির বিধান রয়েছে। বাংলাদেশে ১৯৭৮ সালে এই বিধান চালু হলেও মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে তা বাতিল করা হয়।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ