ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

তিন মাস নেগোসিয়েশনেও আমাদের স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে না : নৌপরিবহন উপদেষ্টা


নিজস্ব প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিবেদন
প্রকাশ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

তিন মাস নেগোসিয়েশনেও আমাদের স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে না : নৌপরিবহন উপদেষ্টা

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (NCT) সংক্রান্ত বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে তিন মাস ধরে চলা আলোচনায় দেশীয় স্বার্থ পুরোপুরি রক্ষা করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন নৌপরিবহন ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন। মঙ্গলবার সচিবালয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, দেশের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও গৃহীত হয়নি।

উপদেষ্টা আরও জানান, আলোচনাগুলো চলমান হলেও বাণিজ্যিক এবং নৈতিক স্বার্থের যথাযথ প্রতিফলন নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, “আমরা দেশের স্বার্থ বিক্রি করতে পারি না। বিদেশি অংশীদার নিলে বন্দরের উন্নয়ন সম্ভব, তবে দেশের নিয়ন্ত্রণ ও স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়।”

বিদেশি অপারেটর ডি.পি. ওয়ার্ল্ডকে NCT পরিচালনার প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। স্থানীয় শ্রমিক সংগঠন এবং ব্যবসায়ীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে দেশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চুক্তি হলে স্থানীয় কর্মসংস্থান ও ন্যায্য মজুরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তিন মাস ধরে বিভিন্ন স্তরে আলোচনা চালানো হলেও চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। সরকার স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হবে না। সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে নির্বাচন পরবর্তী স্থায়ী সরকারের অধীনে।

NCT সংক্রান্ত ইজারার কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিক আন্দোলন দেখা দিয়েছে। ধর্মঘটের কারণে বন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থবির হয়েছে, যা আমদানি ও রপ্তানি কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে। শ্রমিকরা দাবি করেছেন যে বিদেশি অপারেটরের হাতে NCT পরিচালনা করলে দেশের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সরকার জানিয়েছে, ধর্মঘট সাময়িক হলেও সংলাপের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে। কিছু আন্দোলনকারী কর্মচারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে ধর্মঘট ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থগিত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

বন্দর স্থবিরতার কারণে দেশের রপ্তানি-আমদানি কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা দেশের অর্থনীতিকে কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিকোণ থেকেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে বিদেশি বিনিয়োগ গ্রহণ করা হলেও দেশের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখা হবে এবং স্বার্থ রক্ষার শর্ত স্পষ্টভাবে সংযুক্ত করা হবে।

সরকার ইতোমধ্যেই জাতীয় পোর্ট স্ট্রাটেজি (National Port Strategy) তৈরির কাজ শুরু করেছে। নীতি অনুযায়ী দেশের সব বন্দরকে একক নীতির আওতায় আনা হবে, বন্দর ব্যবস্থাপনা ও অপারেশন দক্ষতা বৃদ্ধি করা হবে, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সুবিধা বাড়ানো হবে। উপদেষ্টা জানিয়েছেন, এই স্ট্রাটেজি বছরের মধ্যে চূড়ান্ত করা হবে এবং আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে বাস্তবায়ন শুরু হবে।

তিন মাস ধরে চলা আলোচনায় দেশীয় স্বার্থ পুরোপুরি রক্ষা করা যায়নি। তবে সরকার নিশ্চিত করেছে যে কোনো অবস্থাতেই জাতীয় স্বার্থের ক্ষতি হবে না। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ নেওয়া হলেও বন্দর ব্যবস্থাপনা ও দক্ষতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে দেশের নিয়ন্ত্রণ ও স্বার্থ অক্ষুণ্ণ থাকবে। শ্রমিক আন্দোলন সাময়িক হলেও সরকার পর্যবেক্ষণে রেখেছে, যাতে বন্দর কার্যক্রমে বিঘ্ন সীমিত হয়। চুক্তি প্রক্রিয়ার দীর্ঘস্থায়ীতা, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ, এবং অর্থনৈতিক প্রভাব সব মিলিয়ে এটি দেশের নৌপরিবহন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল ইস্যু হিসেবে রয়ে গেছে।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


তিন মাস নেগোসিয়েশনেও আমাদের স্বার্থ রক্ষা হচ্ছে না : নৌপরিবহন উপদেষ্টা

প্রকাশের তারিখ : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

featured Image

চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (NCT) সংক্রান্ত বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে তিন মাস ধরে চলা আলোচনায় দেশীয় স্বার্থ পুরোপুরি রক্ষা করা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন নৌপরিবহন ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন। মঙ্গলবার সচিবালয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে এক ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, দেশের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও গৃহীত হয়নি।

উপদেষ্টা আরও জানান, আলোচনাগুলো চলমান হলেও বাণিজ্যিক এবং নৈতিক স্বার্থের যথাযথ প্রতিফলন নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, “আমরা দেশের স্বার্থ বিক্রি করতে পারি না। বিদেশি অংশীদার নিলে বন্দরের উন্নয়ন সম্ভব, তবে দেশের নিয়ন্ত্রণ ও স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া উচিত নয়।”

বিদেশি অপারেটর ডি.পি. ওয়ার্ল্ডকে NCT পরিচালনার প্রস্তাব নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। স্থানীয় শ্রমিক সংগঠন এবং ব্যবসায়ীরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যে দেশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চুক্তি হলে স্থানীয় কর্মসংস্থান ও ন্যায্য মজুরি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তিন মাস ধরে বিভিন্ন স্তরে আলোচনা চালানো হলেও চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। সরকার স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হবে না। সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে নির্বাচন পরবর্তী স্থায়ী সরকারের অধীনে।

NCT সংক্রান্ত ইজারার কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে শ্রমিক আন্দোলন দেখা দিয়েছে। ধর্মঘটের কারণে বন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থবির হয়েছে, যা আমদানি ও রপ্তানি কার্যক্রমে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছে। শ্রমিকরা দাবি করেছেন যে বিদেশি অপারেটরের হাতে NCT পরিচালনা করলে দেশের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সরকার জানিয়েছে, ধর্মঘট সাময়িক হলেও সংলাপের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়েছে। কিছু আন্দোলনকারী কর্মচারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে ধর্মঘট ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থগিত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

বন্দর স্থবিরতার কারণে দেশের রপ্তানি-আমদানি কার্যক্রমে উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতা দেশের অর্থনীতিকে কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিকোণ থেকেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে বিদেশি বিনিয়োগ গ্রহণ করা হলেও দেশের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখা হবে এবং স্বার্থ রক্ষার শর্ত স্পষ্টভাবে সংযুক্ত করা হবে।

সরকার ইতোমধ্যেই জাতীয় পোর্ট স্ট্রাটেজি (National Port Strategy) তৈরির কাজ শুরু করেছে। নীতি অনুযায়ী দেশের সব বন্দরকে একক নীতির আওতায় আনা হবে, বন্দর ব্যবস্থাপনা ও অপারেশন দক্ষতা বৃদ্ধি করা হবে, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সুবিধা বাড়ানো হবে। উপদেষ্টা জানিয়েছেন, এই স্ট্রাটেজি বছরের মধ্যে চূড়ান্ত করা হবে এবং আগামী বছরের জানুয়ারি থেকে বাস্তবায়ন শুরু হবে।

তিন মাস ধরে চলা আলোচনায় দেশীয় স্বার্থ পুরোপুরি রক্ষা করা যায়নি। তবে সরকার নিশ্চিত করেছে যে কোনো অবস্থাতেই জাতীয় স্বার্থের ক্ষতি হবে না। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ নেওয়া হলেও বন্দর ব্যবস্থাপনা ও দক্ষতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে দেশের নিয়ন্ত্রণ ও স্বার্থ অক্ষুণ্ণ থাকবে। শ্রমিক আন্দোলন সাময়িক হলেও সরকার পর্যবেক্ষণে রেখেছে, যাতে বন্দর কার্যক্রমে বিঘ্ন সীমিত হয়। চুক্তি প্রক্রিয়ার দীর্ঘস্থায়ীতা, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের উদ্বেগ, এবং অর্থনৈতিক প্রভাব সব মিলিয়ে এটি দেশের নৌপরিবহন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল ইস্যু হিসেবে রয়ে গেছে।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ