বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রসম্পদ সম্পর্কে গবেষণা ও সমস্যা চিহ্নিতকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, দেশের স্থলভাগের সমান জলভাগ থাকা সত্ত্বেও গভীর সমুদ্রসম্পদ ব্যবস্থাপনা এখনও অপ্রতুল, ফলে এগুলো যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারিনি। এজন্য পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণা, তথ্যভিত্তিক পলিসি সাপোর্ট এবং আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে।
এক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের ২১ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নরওয়ের গবেষণা জাহাজ R.V. Dr. Fridtjof Nansen বঙ্গোপসাগরের সমুদ্র জুড়ে বাংলাদেশি জলসীমায় মৎস্যসম্পদ ও ইকোসিস্টেম জরিপ পরিচালনা করে। এতে ২৫ জন গবেষক, যার মধ্যে ১৩ জন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী অংশ নেন। জরিপের ফলাফল অনুযায়ী ৬৫টি নতুন জলজ প্রাণীর প্রজাতি শনাক্ত হয়েছে, এর মধ্যে কিছু হয়তো বিশ্বব্যাপী নতুন আবিষ্কারও হতে পারে।
গবেষকদের মতে, বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে প্লাস্টিক দূষণের প্রমাণ ২,০০০ মিটার গভীরতায়ও পাওয়া গেছে, যা পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। পাশাপাশি জেলিফিশ (উর্ধ্বস্তরীয় উদ্ভিজ্জ প্রাণী) এর অস্বাভাবিক বৃদ্ধি একটি ইকোসিস্টেম ইমব্যালেন্সের লক্ষ্যসূচক। আরও দেখা গেছে গত কয়েক বছরে বড় বড় মাছের প্রজাতির সংখ্যা কমে গেছে এবং স্বল্প গভীর পানিতে মৎস্য আহরণের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
গভীর সমুদ্রে মাছ ধরে আনার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ওভারফিশিং, অবৈধ জাল ও শব্দ-নির্ভর টার্গেটেড ফিশিং পদ্ধতি ব্যবহারের কারণে মাছের সংখ্যা এবং ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। দেশটির ২৭০–২৮০টি শিল্পিক ট্রলারের মধ্যে প্রায় ৭০টি উন্নত প্রযুক্তির ট্রলার সোনার (Sonar) ব্যবহার করে মাছ ধরছে, যা ‘বাই-ক্যাচ’ বা অপ্রয়োজনীয় আহরণের মাত্রা বৃদ্ধি করছে এবং ছোট মৎস্যজীবীদের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করছে।
গত ডিসেম্বরে রাজধানী ঢাকায় আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে বঙ্গোপসাগরের মাছের সংখ্যা গত সাত বছরে প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে, যা ওভারফিশিং ও পরিবেশগত চাপের ফল। তিনি বলেন, “সমুদ্র আমাদের অমূল্য সম্পদ, কিন্তু আমাদের ভুল ব্যবস্থাপনা এবং অনিয়ন্ত্রিত আহরণ এই সম্পদকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। যদি এখনই সতর্ক ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই সম্পদের সুফল থেকে বঞ্চিত হবে।”
প্রধান উপদেষ্টা জানিয়েছেন, জরিপ এবং এতে পাওয়া উপাত্ত ভবিষ্যতে টেকসই সমুদ্রসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এছাড়াও সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে একটি আধুনিক হাইড্রোগ্রাফিক ও ওশেনোগ্রাফিক সার্ভে ভেসেল — HMS Enterprise বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা, যা সমুদ্রের তলদেশ, গভীরতা এবং অন্যান্য তথ্য সংগ্রহে সহায়তা করবে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এবং নরওয়ের সহযোগিতায় এই জরিপ সঞ্চালিত হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা জানিয়েছেন, জাপান, ইন্দোনেশিয়া ও মালদ্বীপসহ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে গবেষণা সমন্বয় বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যাতে বাংলাদেশের সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতি বা ‘ব্লু ইকোনমি’ ত্বরান্বিত করা যায়।
গভীর সমুদ্রের এই গবেষণা ও সমস্যা শনাক্তকরণের মাধ্যমে সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ভবিষ্যতে পরিকল্পিত নীতি গ্রহণের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষা, সমুদ্র সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং সঠিক আহরণের জন্য উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাপ করেছে।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রসম্পদ সম্পর্কে গবেষণা ও সমস্যা চিহ্নিতকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, দেশের স্থলভাগের সমান জলভাগ থাকা সত্ত্বেও গভীর সমুদ্রসম্পদ ব্যবস্থাপনা এখনও অপ্রতুল, ফলে এগুলো যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারিনি। এজন্য পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক গবেষণা, তথ্যভিত্তিক পলিসি সাপোর্ট এবং আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের প্রয়োজন রয়েছে।
এক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছরের ২১ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নরওয়ের গবেষণা জাহাজ R.V. Dr. Fridtjof Nansen বঙ্গোপসাগরের সমুদ্র জুড়ে বাংলাদেশি জলসীমায় মৎস্যসম্পদ ও ইকোসিস্টেম জরিপ পরিচালনা করে। এতে ২৫ জন গবেষক, যার মধ্যে ১৩ জন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী অংশ নেন। জরিপের ফলাফল অনুযায়ী ৬৫টি নতুন জলজ প্রাণীর প্রজাতি শনাক্ত হয়েছে, এর মধ্যে কিছু হয়তো বিশ্বব্যাপী নতুন আবিষ্কারও হতে পারে।
গবেষকদের মতে, বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে প্লাস্টিক দূষণের প্রমাণ ২,০০০ মিটার গভীরতায়ও পাওয়া গেছে, যা পরিবেশগত ভারসাম্যের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। পাশাপাশি জেলিফিশ (উর্ধ্বস্তরীয় উদ্ভিজ্জ প্রাণী) এর অস্বাভাবিক বৃদ্ধি একটি ইকোসিস্টেম ইমব্যালেন্সের লক্ষ্যসূচক। আরও দেখা গেছে গত কয়েক বছরে বড় বড় মাছের প্রজাতির সংখ্যা কমে গেছে এবং স্বল্প গভীর পানিতে মৎস্য আহরণের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
গভীর সমুদ্রে মাছ ধরে আনার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত ওভারফিশিং, অবৈধ জাল ও শব্দ-নির্ভর টার্গেটেড ফিশিং পদ্ধতি ব্যবহারের কারণে মাছের সংখ্যা এবং ইকোসিস্টেমের ভারসাম্য বিঘ্নিত হচ্ছে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। দেশটির ২৭০–২৮০টি শিল্পিক ট্রলারের মধ্যে প্রায় ৭০টি উন্নত প্রযুক্তির ট্রলার সোনার (Sonar) ব্যবহার করে মাছ ধরছে, যা ‘বাই-ক্যাচ’ বা অপ্রয়োজনীয় আহরণের মাত্রা বৃদ্ধি করছে এবং ছোট মৎস্যজীবীদের জন্য ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করছে।
গত ডিসেম্বরে রাজধানী ঢাকায় আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে বঙ্গোপসাগরের মাছের সংখ্যা গত সাত বছরে প্রায় ৮০ শতাংশ কমে গেছে, যা ওভারফিশিং ও পরিবেশগত চাপের ফল। তিনি বলেন, “সমুদ্র আমাদের অমূল্য সম্পদ, কিন্তু আমাদের ভুল ব্যবস্থাপনা এবং অনিয়ন্ত্রিত আহরণ এই সম্পদকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। যদি এখনই সতর্ক ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই সম্পদের সুফল থেকে বঞ্চিত হবে।”
প্রধান উপদেষ্টা জানিয়েছেন, জরিপ এবং এতে পাওয়া উপাত্ত ভবিষ্যতে টেকসই সমুদ্রসম্পদ ব্যবস্থাপনা ও নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এছাড়াও সরকারের পরিকল্পনায় রয়েছে একটি আধুনিক হাইড্রোগ্রাফিক ও ওশেনোগ্রাফিক সার্ভে ভেসেল — HMS Enterprise বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা, যা সমুদ্রের তলদেশ, গভীরতা এবং অন্যান্য তথ্য সংগ্রহে সহায়তা করবে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এবং নরওয়ের সহযোগিতায় এই জরিপ সঞ্চালিত হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা জানিয়েছেন, জাপান, ইন্দোনেশিয়া ও মালদ্বীপসহ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে গবেষণা সমন্বয় বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যাতে বাংলাদেশের সমুদ্রভিত্তিক অর্থনীতি বা ‘ব্লু ইকোনমি’ ত্বরান্বিত করা যায়।
গভীর সমুদ্রের এই গবেষণা ও সমস্যা শনাক্তকরণের মাধ্যমে সরকার ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ভবিষ্যতে পরিকল্পিত নীতি গ্রহণের মাধ্যমে পরিবেশ রক্ষা, সমুদ্র সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং সঠিক আহরণের জন্য উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাপ করেছে।

আপনার মতামত লিখুন