আলোচিত “জুলাই যোদ্ধা” তাহরিমা জান্নাত সুরভীকে ঘিরে গত কয়েক সপ্তাহে তৈরি হওয়া উত্তেজনা, বিতর্ক ও আইনি নাটকের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে আদালত তার জামিন মঞ্জুর করেছেন। সোমবার (৫ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এই আদেশ দেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে তা নিশ্চিত হওয়ার পর বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে।
২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর গাজীপুরের টঙ্গী এলাকার বাসা থেকে সুরভীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, সুরভী ও তার সহযোগীরা গুলশানের এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে জুলাই আন্দোলনে ‘মামলায় জড়ানোর ভয়’ দেখিয়ে এক কোটি টাকারও বেশি অর্থ আদায়ের চেষ্টা করেন। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, শুধু ওই ব্যবসায়ী নয়, আরও কয়েকজনকে টার্গেট করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র মোট প্রায় ৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল। ব্ল্যাকমেইলিং, প্রতারণা ও চাঁদাবাজির অভিযোগের ভিত্তিতেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানায় পুলিশ।
গ্রেপ্তারের পরদিন পুলিশ তাকে আদালতে হাজির করে দুই দিনের রিমান্ড আবেদন করে। তদন্ত কর্মকর্তার দাবি ছিল, ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করার জন্য রিমান্ড প্রয়োজন। আদালত শুনানি শেষে রিমান্ড মঞ্জুর করেন। তবে সুরভীর আইনজীবীরা যুক্তি দেন, মামলায় কোনো জব্দ তালিকা, সাক্ষীর নির্দিষ্ট বিবরণ কিংবা প্রাথমিক চার্জশিট নেই। তারা আরও জানান, সুরভীর বয়স ১৮ বছরের নিচে হওয়ায় তাকে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে রিমান্ডে নেওয়া আইনগতভাবেও প্রশ্নবিদ্ধ।
গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের খবর প্রকাশের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ সুরভীর রিমান্ড বাতিল ও দ্রুত জামিনের দাবি জানান। জন্মসনদের তথ্যানুযায়ী তার বয়স ১৭ বছর পূর্ণ হয়নি—এ দাবি সামনে আসায় বিতর্ক আরও জোরালো হয়। অনেকেই অভিযোগ করেন, অপ্রাপ্তবয়স্ককে রিমান্ডে নেওয়া শিশু আইন লঙ্ঘনের শামিল।
এমন বিতর্ক ও আইনি যুক্তিগুলো বিবেচনায় নিয়ে আদালত অবশেষে সুরভীর জামিন মঞ্জুর করেন। জামিনের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর আন্দোলনকারীদের মধ্যে স্বস্তির অনুভূতি দেখা দেয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে বলা হয়, “সত্যের জয় হয়েছে, সামনে আইনি লড়াই চলবে।” সুরভীর পরিবারেরও দাবি, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
অন্যদিকে পুলিশ জানিয়েছে, তদন্ত পুরোপুরি চলমান। তারা বলছে, জামিন মানেই অভিযোগ খারিজ নয়। তদন্তে যেসব তথ্য এসেছে সেগুলো যাচাই করে যথাসময়ে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। তদন্ত কর্মকর্তারা আরও জানান, সুরভীর সঙ্গে যুক্ত আরও কয়েকজনকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে এবং প্রয়োজনে তাদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
তাহরিমা জান্নাত সুরভীকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তিকে কেন্দ্র করেই নয়; এটি সামাজিক আন্দোলনের প্রভাব, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়তা, রাজনৈতিক পরিবেশ এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে ঘিরে জাতীয় আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। অভিযোগগুলো তদন্তাধীন থাকায় মামলার ভবিষ্যত কী হবে, তা এখন সময়ই বলে দেবে।
আপনার মতামত লিখুন