চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার মোমিনপুর ইউনিয়নের কবিখালী গ্রামের মসজিদপাড়ার বাসিন্দা শতবর্ষী আব্দুল বারী। বয়সের ভারে নুয়ে পড়ার কথা। কিন্তু জীবনের তাগিদে এখনো সাইকেলের প্যাডেলে পা রেখে ছুটতে হয় তাকে। কখনো কড়াই-সাড়ার কাজ, কখনো হাড়ির কান্দা লাগানো, ছোটখাটো শ্রমেদিনভর পরিশ্রম করে যা আয় করেন, তা দিয়েই চাল-ডাল কিনে নিজ হাতে রান্না করে খান। নিজের বলতে নেই কোনো জমি, নেই নিরাপদ একটি ঘরও। পরের জমিতে ঝুপড়ি ঘর তুলে একাই বসবাস করছেন শতবর্ষী আব্দুল বারী।
বয়স নিয়ে আব্দুল বারীর দাবি, তিনি ১১৫ বছর বয়সী। তবে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী, তার জন্ম ১৯২১ সালে। সে হিসাবে বর্তমানে তার বয়স ১০৫ বছর।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে তার অসহায় জীবনযাপনের ছবি ও ভিডিও। তাকে সহযোগিতার জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগের কথাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত হয়। তবে এসব উদ্যোগের কোনো অর্থ বা সহায়তা এখনো তার হাতে পৌঁছায়নি বলে জানিয়েছেন আব্দুল বারী।
জানা গেছে, প্রায় সাত বছর আগে স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকে নিঃসঙ্গ জীবন কাটাচ্ছেন তিনি। দুই কন্যা থাকলেও তারা নিয়মিত খোঁজখবর নেন না বলে জানিয়েছেন আব্দুল বারী। ফলে জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও নিজের খাবার ও জীবনযাপনের খরচ নিজেকেই জোগাড় করতে হচ্ছে তাকে।
আব্দুল বারীর অসহায় জীবনযাপনের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর রোববার সকালে তার খোঁজ নিতে ও সংবাদ সংগ্রহ করতে তার বাড়িতে যান চ্যানেল ওয়ানের জেলা প্রতিনিধি শেখ সাদিক, নাগরিক টিভির জেলা প্রতিনিধি শামসুজ্জোহা পলাশ, এনটিভি অনলাইন ও দৈনিক মাথাভাঙ্গার রিপোর্টার মো. আব্দুল্লাহ হক এবং দৈনিক আমাদের সংবাদ ও উন্নয়নে বাংলাদেশ পত্রিকার রিপোর্টার বালাদুল আমিন।
সাংবাদিকরা সরেজমিনে আব্দুল বারীর জীবনযাপনের চিত্র দেখার পর আব্দুল বাড়িতে দাড়িয়ে বিষয়টি চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তিথি মিত্রকে অবহিত করেন। বিষয়টি জানার পর তাৎক্ষণিকভাবে গুরুত্বের সঙ্গে নেন ইউএনও।
পরে উপজেলা প্রশাসনের ত্রাণ তহবিল থেকে শুকনা খাদ্যসামগ্রী নিয়ে (৬ সেপ্টেম্বর) রবিবার দুপুর ১:৩০ মিনিটের দিকে আব্দুল বারীর বাড়িতে ছুটে যান সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তিথি মিত্র। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নাহিদা ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
আব্দুল বারীর সঙ্গে কথা বলে তার জীবনযাপন ও থাকার জায়গা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। তার সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেন তারা। এ সময় আব্দুল বারীর থাকার ব্যবস্থা করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন ইউএনও তিথি মিত্র।
তাৎক্ষণিক সহায়তা হিসেবে আব্দুল বারীর হাতে তুলে দেওয়া হয় ১০ কেজি চাল, ১ কেজি ডালসহ শুকনা খাবারের মোট আটটি আইটেম। সহায়তা পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। কয়েকদিন ধরে অসুস্থ থাকায় ঠিকমতো খাবারও খেতে পারছেন না বলে জানান শতবর্ষী এই বৃদ্ধ।
সহায়তা পেয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তিথি মিত্রসহ উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান আব্দুল বারী।
আব্দুল বারী বলেন, “বিভিন্ন লোকজন আমাকে সহযোগিতা করার কথা বলেছেন। কিন্তু আমার কাছে কোনো কিছু আসেনি। এলাকার মানুষ বিভিন্ন সময় সহযোগিতা করেন। আমি বয়স্ক ভাতাও পাই। আজ উপজেলা নির্বাহী অফিসার এসেছিলেন। আমি খুব খুশি হয়েছি।”
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তিথি মিত্র বলেন, “আব্দুল বারী দাবি করেন, তার বয়স ১১৫ বছর। তবে আমরা তার এনআইডি কার্ডে দেখেছি, তার জন্ম ১৯২১ সালে। সে হিসেবে তার বয়স ১০৫ বছর। তিনি এখনো যথেষ্ট সক্ষম ও সচল আছেন।”
তিনি বলেন, “আমরা তার ঘরটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি। আমার সঙ্গে সদর উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাও ছিলেন। তিনি জানিয়েছেন, তার নিজস্ব কোনো জমি নেই। তবে তিনি যে জমিতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন, সেই জমির মালিক যদি লিখিতভাবে আবেদন করেন অথবা একটি চুক্তিপত্র দেন যে, সরকারি সহায়তায় ওই জমিতে ঘর করে দিলে আব্দুল বারী আজীবন সেখানে থাকতে পারবেন, তাহলে ভবিষ্যতে যে প্রকল্প আসবে, সেখান থেকে সরকারি বরাদ্দের মাধ্যমে তার থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।”
ইউএনও আরও বলেন, “আপাতত উপজেলা প্রশাসনের ত্রাণ তহবিল থেকে ১০ কেজি চাল, ১ কেজি ডালসহ শুকনা খাবারের আটটি আইটেম তাকে দেওয়া হয়েছে। তিনি সরকারি বয়স্ক ভাতাও পান। তবে এই সহায়তা একজন মানুষের জন্য যথেষ্ট নয়। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা চেষ্টা করব, তাকে যতটুকু সম্ভব সহায়তা করা যায়। আমরা সবসময় তার পাশে থাকার চেষ্টা করব।”
জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও নিজের জীবিকার ভার নিজ কাঁধে বহন করে চলেছেন আব্দুল বারী। এক হাতে সাইকেলের হ্যান্ডেল, অন্য হাতে জীবনের সংগ্রাম—তার গল্প যেন সমাজের প্রান্তিক প্রবীণদের কঠিন বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার জীবনকাহিনি ছড়িয়ে পড়া যেমন মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, তেমনি সাংবাদিকদের উদ্যোগে উপজেলা প্রশাসনের তাৎক্ষণিক সহায়তা কিছুটা স্বস্তি এনেছে তার জীবনে। তবে স্থানীয়দের মতে, এককালীন খাদ্যসহায়তার পাশাপাশি একজন শতবর্ষী অসহায় মানুষের জন্য স্থায়ী আবাসন ও নিয়মিত সহায়তার ব্যবস্থা করাই হবে সবচেয়ে বড় মানবিক উদ্যোগ।

সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার মোমিনপুর ইউনিয়নের কবিখালী গ্রামের মসজিদপাড়ার বাসিন্দা শতবর্ষী আব্দুল বারী। বয়সের ভারে নুয়ে পড়ার কথা। কিন্তু জীবনের তাগিদে এখনো সাইকেলের প্যাডেলে পা রেখে ছুটতে হয় তাকে। কখনো কড়াই-সাড়ার কাজ, কখনো হাড়ির কান্দা লাগানো, ছোটখাটো শ্রমেদিনভর পরিশ্রম করে যা আয় করেন, তা দিয়েই চাল-ডাল কিনে নিজ হাতে রান্না করে খান। নিজের বলতে নেই কোনো জমি, নেই নিরাপদ একটি ঘরও। পরের জমিতে ঝুপড়ি ঘর তুলে একাই বসবাস করছেন শতবর্ষী আব্দুল বারী।
বয়স নিয়ে আব্দুল বারীর দাবি, তিনি ১১৫ বছর বয়সী। তবে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য অনুযায়ী, তার জন্ম ১৯২১ সালে। সে হিসাবে বর্তমানে তার বয়স ১০৫ বছর।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে তার অসহায় জীবনযাপনের ছবি ও ভিডিও। তাকে সহযোগিতার জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগের কথাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত হয়। তবে এসব উদ্যোগের কোনো অর্থ বা সহায়তা এখনো তার হাতে পৌঁছায়নি বলে জানিয়েছেন আব্দুল বারী।
জানা গেছে, প্রায় সাত বছর আগে স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকে নিঃসঙ্গ জীবন কাটাচ্ছেন তিনি। দুই কন্যা থাকলেও তারা নিয়মিত খোঁজখবর নেন না বলে জানিয়েছেন আব্দুল বারী। ফলে জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও নিজের খাবার ও জীবনযাপনের খরচ নিজেকেই জোগাড় করতে হচ্ছে তাকে।
আব্দুল বারীর অসহায় জীবনযাপনের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর রোববার সকালে তার খোঁজ নিতে ও সংবাদ সংগ্রহ করতে তার বাড়িতে যান চ্যানেল ওয়ানের জেলা প্রতিনিধি শেখ সাদিক, নাগরিক টিভির জেলা প্রতিনিধি শামসুজ্জোহা পলাশ, এনটিভি অনলাইন ও দৈনিক মাথাভাঙ্গার রিপোর্টার মো. আব্দুল্লাহ হক এবং দৈনিক আমাদের সংবাদ ও উন্নয়নে বাংলাদেশ পত্রিকার রিপোর্টার বালাদুল আমিন।
সাংবাদিকরা সরেজমিনে আব্দুল বারীর জীবনযাপনের চিত্র দেখার পর আব্দুল বাড়িতে দাড়িয়ে বিষয়টি চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তিথি মিত্রকে অবহিত করেন। বিষয়টি জানার পর তাৎক্ষণিকভাবে গুরুত্বের সঙ্গে নেন ইউএনও।
পরে উপজেলা প্রশাসনের ত্রাণ তহবিল থেকে শুকনা খাদ্যসামগ্রী নিয়ে (৬ সেপ্টেম্বর) রবিবার দুপুর ১:৩০ মিনিটের দিকে আব্দুল বারীর বাড়িতে ছুটে যান সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তিথি মিত্র। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নাহিদা ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
আব্দুল বারীর সঙ্গে কথা বলে তার জীবনযাপন ও থাকার জায়গা সরেজমিনে পরিদর্শন করেন উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা। তার সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেন তারা। এ সময় আব্দুল বারীর থাকার ব্যবস্থা করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন ইউএনও তিথি মিত্র।
তাৎক্ষণিক সহায়তা হিসেবে আব্দুল বারীর হাতে তুলে দেওয়া হয় ১০ কেজি চাল, ১ কেজি ডালসহ শুকনা খাবারের মোট আটটি আইটেম। সহায়তা পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। কয়েকদিন ধরে অসুস্থ থাকায় ঠিকমতো খাবারও খেতে পারছেন না বলে জানান শতবর্ষী এই বৃদ্ধ।
সহায়তা পেয়ে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তিথি মিত্রসহ উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান আব্দুল বারী।
আব্দুল বারী বলেন, “বিভিন্ন লোকজন আমাকে সহযোগিতা করার কথা বলেছেন। কিন্তু আমার কাছে কোনো কিছু আসেনি। এলাকার মানুষ বিভিন্ন সময় সহযোগিতা করেন। আমি বয়স্ক ভাতাও পাই। আজ উপজেলা নির্বাহী অফিসার এসেছিলেন। আমি খুব খুশি হয়েছি।”
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তিথি মিত্র বলেন, “আব্দুল বারী দাবি করেন, তার বয়স ১১৫ বছর। তবে আমরা তার এনআইডি কার্ডে দেখেছি, তার জন্ম ১৯২১ সালে। সে হিসেবে তার বয়স ১০৫ বছর। তিনি এখনো যথেষ্ট সক্ষম ও সচল আছেন।”
তিনি বলেন, “আমরা তার ঘরটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছি। আমার সঙ্গে সদর উপজেলার প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাও ছিলেন। তিনি জানিয়েছেন, তার নিজস্ব কোনো জমি নেই। তবে তিনি যে জমিতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন, সেই জমির মালিক যদি লিখিতভাবে আবেদন করেন অথবা একটি চুক্তিপত্র দেন যে, সরকারি সহায়তায় ওই জমিতে ঘর করে দিলে আব্দুল বারী আজীবন সেখানে থাকতে পারবেন, তাহলে ভবিষ্যতে যে প্রকল্প আসবে, সেখান থেকে সরকারি বরাদ্দের মাধ্যমে তার থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।”
ইউএনও আরও বলেন, “আপাতত উপজেলা প্রশাসনের ত্রাণ তহবিল থেকে ১০ কেজি চাল, ১ কেজি ডালসহ শুকনা খাবারের আটটি আইটেম তাকে দেওয়া হয়েছে। তিনি সরকারি বয়স্ক ভাতাও পান। তবে এই সহায়তা একজন মানুষের জন্য যথেষ্ট নয়। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা চেষ্টা করব, তাকে যতটুকু সম্ভব সহায়তা করা যায়। আমরা সবসময় তার পাশে থাকার চেষ্টা করব।”
জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও নিজের জীবিকার ভার নিজ কাঁধে বহন করে চলেছেন আব্দুল বারী। এক হাতে সাইকেলের হ্যান্ডেল, অন্য হাতে জীবনের সংগ্রাম—তার গল্প যেন সমাজের প্রান্তিক প্রবীণদের কঠিন বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার জীবনকাহিনি ছড়িয়ে পড়া যেমন মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে, তেমনি সাংবাদিকদের উদ্যোগে উপজেলা প্রশাসনের তাৎক্ষণিক সহায়তা কিছুটা স্বস্তি এনেছে তার জীবনে। তবে স্থানীয়দের মতে, এককালীন খাদ্যসহায়তার পাশাপাশি একজন শতবর্ষী অসহায় মানুষের জন্য স্থায়ী আবাসন ও নিয়মিত সহায়তার ব্যবস্থা করাই হবে সবচেয়ে বড় মানবিক উদ্যোগ।

আপনার মতামত লিখুন