ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

১ টাকার বঁড়শিতে ৩৭ বছরের সংসার, নীলফামারীর দীনেশ রায়ের জীবনসংগ্রাম


সেলিম রেজা, স্টাফ রিপোর্টার
সেলিম রেজা, স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০২৬

১ টাকার বঁড়শিতে ৩৭ বছরের সংসার, নীলফামারীর দীনেশ রায়ের জীবনসংগ্রাম

মাত্র এক টাকায় কেনা বঁড়শি দিয়ে শুরু হয়েছিল জীবিকার লড়াই। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ৩৭ বছর। নদী, নালা, খাল, বিল, ডোবা ও জলাশয়ে বঁড়শি ফেলে দেশীয় প্রজাতির মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করেই পাঁচ সদস্যের সংসার চালিয়ে আসছেন নীলফামারীর দীনেশ রায় (৫৭)। সময় বদলেছে, কমেছে দেশীয় মাছ, বেড়েছে সংসারের খরচ—তবু বঁড়শি আর টোপের সঙ্গে তার সম্পর্ক আজও অটুট।

দীনেশ রায় নীলফামারী সদর উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের বেহারাপাড়া এলাকার মৃত ধীরেন রায়ের ছেলে। অভাব-অনটনের সংসারে জীবিকার তাগিদে তরুণ বয়সেই বেছে নেন মাছ ধরার পেশা। বঁড়শি, মাটির কলস আর পোকামাকড়ের ডিম বা টোপ—এই সামান্য উপকরণ নিয়েই বছরের পর বছর ছুটে বেড়িয়েছেন বিভিন্ন জলাশয়ে।

শুক্রবার (২১ আগস্ট) সরেজমিনে কথা হয় দীনেশ রায়ের সঙ্গে। তিনি জানান, একসময় মাত্র এক টাকায় কেনা বঁড়শিই হয়ে ওঠে তার জীবিকা নির্বাহের প্রধান হাতিয়ার। সেই বঁড়শি দিয়ে মাছ ধরেই ধীরে ধীরে সংসারের দায়িত্ব সামলেছেন তিনি।

দীনেশ রায় বলেন, পাঁচ থেকে দশ বছর আগেও নদী-নালা, ডোবা ও জলাশয়ে প্রচুর দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা মাছ ধরে দেড় থেকে দুই হাজার টাকার মাছ বিক্রি করতে পারতেন। শিং, মাগুর, টেংরা ও কৈসহ বিভিন্ন দেশীয় মাছ ধরতেন তিনি। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি পাড়া-মহল্লাতেও এসব মাছের ব্যাপক চাহিদা ছিল।

একসময় শুধু টাকার বিনিময়েই নয়, চাল ও সবজির বিনিময়েও তার কাছ থেকে মাছ নিতেন অনেকে। মাছ বিক্রির আয় দিয়েই তখন সংসারের প্রয়োজনীয় খরচ মোটামুটি মেটানো সম্ভব হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে।

দীনেশ রায়ের অভিযোগ, বিভিন্ন জলাশয়ে নিষিদ্ধ জাল ও ক্ষতিকর উপায়ে মাছ ধরার কারণে দেশীয় মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে আগের মতো মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। এতে তার মতো প্রথাগত পদ্ধতিতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা মানুষের আয়ও কমে গেছে।

তিনি বলেন, আগের তুলনায় এখন বঁড়শি দিয়ে মাছ ধরে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবে দীর্ঘদিনের পেশা একসময় নেশায় পরিণত হয়েছে। তাই মাছ ধরা পুরোপুরি ছেড়ে দিতে পারেননি। সংসারের প্রয়োজন মেটাতে মাঝেমধ্যে অন্যের জমিতে দিনমজুর হিসেবেও কাজ করতে হয় তাকে।

সদরের সাবেক স্কুলশিক্ষক আহসান হাবীব (৭০) বলেন, আধুনিক যুগে অনেকেই বিভিন্ন আধুনিক উপকরণ ব্যবহার করে মাছ শিকার করছেন। অথচ দীনেশ রায় এখনো বঁড়শি ও টোপ ব্যবহার করে পুরোনো পদ্ধতিতে মাছ ধরছেন। এর মাধ্যমে তিনি গ্রামবাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একটি অংশ ধরে রেখেছেন।

দীনেশের মতো প্রথাগতভাবে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা মানুষদের পাশে সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার আহ্বানও জানান তিনি।

হাজী চয়েন উদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুবাশ চন্দ্র রায় বলেন, আধুনিকতার এই সময়ে দীনেশ রায় যেন পুরোনো দিনের মাছ ধরার ঐতিহ্যের এক জীবন্ত সাক্ষী। বঁড়শিই তার সংসারের উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম। তাই তার জীবন-জীবিকা টিকিয়ে রাখতে সমাজের সচেতন ও বিত্তবান মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।

জীবনের ৩৭টি বছর কেটে গেছে জলাশয়ের পাড়ে। একসময় যে এক টাকার বঁড়শি দিয়ে শুরু হয়েছিল দীনেশ রায়ের জীবনসংগ্রাম, সেই বঁড়শিই আজও তার সঙ্গী। দেশীয় মাছের প্রাচুর্য কমে যাওয়ায় আয় আগের মতো নেই, তবুও জীবিকার প্রয়োজন আর দীর্ঘদিনের অভ্যাসে বঁড়শি হাতে ছুটে চলেছেন তিনি।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


১ টাকার বঁড়শিতে ৩৭ বছরের সংসার, নীলফামারীর দীনেশ রায়ের জীবনসংগ্রাম

প্রকাশের তারিখ : ২২ আগস্ট ২০২৬

featured Image

মাত্র এক টাকায় কেনা বঁড়শি দিয়ে শুরু হয়েছিল জীবিকার লড়াই। এরপর কেটে গেছে দীর্ঘ ৩৭ বছর। নদী, নালা, খাল, বিল, ডোবা ও জলাশয়ে বঁড়শি ফেলে দেশীয় প্রজাতির মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করেই পাঁচ সদস্যের সংসার চালিয়ে আসছেন নীলফামারীর দীনেশ রায় (৫৭)। সময় বদলেছে, কমেছে দেশীয় মাছ, বেড়েছে সংসারের খরচ—তবু বঁড়শি আর টোপের সঙ্গে তার সম্পর্ক আজও অটুট।

দীনেশ রায় নীলফামারী সদর উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের বেহারাপাড়া এলাকার মৃত ধীরেন রায়ের ছেলে। অভাব-অনটনের সংসারে জীবিকার তাগিদে তরুণ বয়সেই বেছে নেন মাছ ধরার পেশা। বঁড়শি, মাটির কলস আর পোকামাকড়ের ডিম বা টোপ—এই সামান্য উপকরণ নিয়েই বছরের পর বছর ছুটে বেড়িয়েছেন বিভিন্ন জলাশয়ে।

শুক্রবার (২১ আগস্ট) সরেজমিনে কথা হয় দীনেশ রায়ের সঙ্গে। তিনি জানান, একসময় মাত্র এক টাকায় কেনা বঁড়শিই হয়ে ওঠে তার জীবিকা নির্বাহের প্রধান হাতিয়ার। সেই বঁড়শি দিয়ে মাছ ধরেই ধীরে ধীরে সংসারের দায়িত্ব সামলেছেন তিনি।

দীনেশ রায় বলেন, পাঁচ থেকে দশ বছর আগেও নদী-নালা, ডোবা ও জলাশয়ে প্রচুর দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা মাছ ধরে দেড় থেকে দুই হাজার টাকার মাছ বিক্রি করতে পারতেন। শিং, মাগুর, টেংরা ও কৈসহ বিভিন্ন দেশীয় মাছ ধরতেন তিনি। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি পাড়া-মহল্লাতেও এসব মাছের ব্যাপক চাহিদা ছিল।

একসময় শুধু টাকার বিনিময়েই নয়, চাল ও সবজির বিনিময়েও তার কাছ থেকে মাছ নিতেন অনেকে। মাছ বিক্রির আয় দিয়েই তখন সংসারের প্রয়োজনীয় খরচ মোটামুটি মেটানো সম্ভব হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে।

দীনেশ রায়ের অভিযোগ, বিভিন্ন জলাশয়ে নিষিদ্ধ জাল ও ক্ষতিকর উপায়ে মাছ ধরার কারণে দেশীয় মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে আগের মতো মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। এতে তার মতো প্রথাগত পদ্ধতিতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা মানুষের আয়ও কমে গেছে।

তিনি বলেন, আগের তুলনায় এখন বঁড়শি দিয়ে মাছ ধরে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তবে দীর্ঘদিনের পেশা একসময় নেশায় পরিণত হয়েছে। তাই মাছ ধরা পুরোপুরি ছেড়ে দিতে পারেননি। সংসারের প্রয়োজন মেটাতে মাঝেমধ্যে অন্যের জমিতে দিনমজুর হিসেবেও কাজ করতে হয় তাকে।

সদরের সাবেক স্কুলশিক্ষক আহসান হাবীব (৭০) বলেন, আধুনিক যুগে অনেকেই বিভিন্ন আধুনিক উপকরণ ব্যবহার করে মাছ শিকার করছেন। অথচ দীনেশ রায় এখনো বঁড়শি ও টোপ ব্যবহার করে পুরোনো পদ্ধতিতে মাছ ধরছেন। এর মাধ্যমে তিনি গ্রামবাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একটি অংশ ধরে রেখেছেন।

দীনেশের মতো প্রথাগতভাবে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা মানুষদের পাশে সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার আহ্বানও জানান তিনি।

হাজী চয়েন উদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুবাশ চন্দ্র রায় বলেন, আধুনিকতার এই সময়ে দীনেশ রায় যেন পুরোনো দিনের মাছ ধরার ঐতিহ্যের এক জীবন্ত সাক্ষী। বঁড়শিই তার সংসারের উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম। তাই তার জীবন-জীবিকা টিকিয়ে রাখতে সমাজের সচেতন ও বিত্তবান মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন।

জীবনের ৩৭টি বছর কেটে গেছে জলাশয়ের পাড়ে। একসময় যে এক টাকার বঁড়শি দিয়ে শুরু হয়েছিল দীনেশ রায়ের জীবনসংগ্রাম, সেই বঁড়শিই আজও তার সঙ্গী। দেশীয় মাছের প্রাচুর্য কমে যাওয়ায় আয় আগের মতো নেই, তবুও জীবিকার প্রয়োজন আর দীর্ঘদিনের অভ্যাসে বঁড়শি হাতে ছুটে চলেছেন তিনি।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ