ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

দুই শতাব্দীর ঐতিহ্যের ধারক পত্নীতলা থানা


মো. মানিক হোসেন
মো. মানিক হোসেন
প্রকাশ : ০৭ আগস্ট ২০২৬

দুই শতাব্দীর ঐতিহ্যের ধারক পত্নীতলা থানা
ছবি: প্রতিনিধি

বাংলাদেশের প্রাচীনতম থানাগুলোর অন্যতম নওগাঁ জেলার পত্নীতলা থানা। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই থানা দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সীমান্ত এলাকায় অপরাধ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ঐতিহাসিক এই থানাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে বর্তমান নজিপুর শহর এবং পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পত্নীতলা উপজেলা।

নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম জানান, ১৭৯২ সালের ৭ নভেম্বর বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি সরকারের অধীনে ভারতবর্ষে আধুনিক থানা ব্যবস্থা চালু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮০৭ সালে অবিভক্ত ভারতের পশ্চিম দিনাজপুর জেলার অংশ হিসেবে পত্নীতলা থানা প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে ১৯১১-১২ সালের দিকে থানার উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে ধামইরহাট থানা গঠন করা হয়।

দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে র‍্যাডক্লিফ রোয়েদাদ অনুযায়ী পত্নীতলা থানা বগুড়া জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৫০ সালে এটি নওগাঁ মহকুমায় যুক্ত হয় এবং ১৯৮৩ সালে পুলিশি থানাকে ভিত্তি করে পত্নীতলা উপজেলা গঠিত হয়। বর্তমানে উপজেলাটি একটি পৌরসভা ও ১১টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত।

ইতিহাস-ঐতিহ্যের ক্ষেত্রেও পত্নীতলার রয়েছে বিশেষ পরিচিতি। উপজেলার দিবর দিঘী ও দিব্যক জয়স্তম্ভ একাদশ শতাব্দীর কৈবর্ত বিদ্রোহের স্মৃতিবিজড়িত নিদর্শন হিসেবে আজও ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। ইতিহাসবিদদের মতে, বিদ্রোহের নেতা দিব্যকের বিজয় স্মরণে তাঁর অনুসারীরা বিশাল এই দিঘী খনন এবং গ্রানাইট পাথরের জয়স্তম্ভ নির্মাণ করেছিলেন।

সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী, পত্নীতলা উপজেলার জনসংখ্যা প্রায় পৌনে তিন লাখ। এর মধ্যে প্রায় ৭৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ মুসলিম, ১৭ দশমিক ৮২ শতাংশ হিন্দু, ২ দশমিক ০৯ শতাংশ খ্রিস্টান এবং অবশিষ্ট অন্যান্য ধর্মাবলম্বী। এ উপজেলায় প্রায় ১৭ থেকে ১৮ হাজার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন। তাঁদের মধ্যে ওরাওঁ, সাঁওতাল ও মুন্ডা সম্প্রদায় উল্লেখযোগ্য।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার সীমান্তঘেঁষা হওয়ায় উপজেলার নিরমইল ও শিহাড়া ইউনিয়ন আন্তর্জাতিক সীমান্তের সঙ্গে সংযুক্ত। ফলে সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান, মাদক পাচার প্রতিরোধ এবং সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ, মারামারি, চুরি, ছিনতাই ও মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধ দমনেও নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে পুলিশ।

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, "পত্নীতলা থানা শুধু একটি প্রশাসনিক ইউনিট নয়, এটি দুই শতাব্দীর ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক। সীমান্ত এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, চোরাচালান ও মাদক প্রতিরোধ এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নওগাঁ জেলা পুলিশ ও পত্নীতলা থানা সর্বোচ্চ আন্তরিকতা, পেশাদারিত্ব ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিংয়ের মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।"

দুই শতাব্দীর ঐতিহ্য, ইতিহাস, প্রত্নসম্পদ এবং সীমান্ত নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে পত্নীতলা থানা আজও উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী পুলিশি ইউনিট হিসেবে পরিচিত।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


দুই শতাব্দীর ঐতিহ্যের ধারক পত্নীতলা থানা

প্রকাশের তারিখ : ০৭ আগস্ট ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশের প্রাচীনতম থানাগুলোর অন্যতম নওগাঁ জেলার পত্নীতলা থানা। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই থানা দুই শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সীমান্ত এলাকায় অপরাধ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ঐতিহাসিক এই থানাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে বর্তমান নজিপুর শহর এবং পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পত্নীতলা উপজেলা।

নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম জানান, ১৭৯২ সালের ৭ নভেম্বর বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি সরকারের অধীনে ভারতবর্ষে আধুনিক থানা ব্যবস্থা চালু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮০৭ সালে অবিভক্ত ভারতের পশ্চিম দিনাজপুর জেলার অংশ হিসেবে পত্নীতলা থানা প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে ১৯১১-১২ সালের দিকে থানার উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে ধামইরহাট থানা গঠন করা হয়।

দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে র‍্যাডক্লিফ রোয়েদাদ অনুযায়ী পত্নীতলা থানা বগুড়া জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৫০ সালে এটি নওগাঁ মহকুমায় যুক্ত হয় এবং ১৯৮৩ সালে পুলিশি থানাকে ভিত্তি করে পত্নীতলা উপজেলা গঠিত হয়। বর্তমানে উপজেলাটি একটি পৌরসভা ও ১১টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত।

ইতিহাস-ঐতিহ্যের ক্ষেত্রেও পত্নীতলার রয়েছে বিশেষ পরিচিতি। উপজেলার দিবর দিঘী ও দিব্যক জয়স্তম্ভ একাদশ শতাব্দীর কৈবর্ত বিদ্রোহের স্মৃতিবিজড়িত নিদর্শন হিসেবে আজও ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। ইতিহাসবিদদের মতে, বিদ্রোহের নেতা দিব্যকের বিজয় স্মরণে তাঁর অনুসারীরা বিশাল এই দিঘী খনন এবং গ্রানাইট পাথরের জয়স্তম্ভ নির্মাণ করেছিলেন।

সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী, পত্নীতলা উপজেলার জনসংখ্যা প্রায় পৌনে তিন লাখ। এর মধ্যে প্রায় ৭৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ মুসলিম, ১৭ দশমিক ৮২ শতাংশ হিন্দু, ২ দশমিক ০৯ শতাংশ খ্রিস্টান এবং অবশিষ্ট অন্যান্য ধর্মাবলম্বী। এ উপজেলায় প্রায় ১৭ থেকে ১৮ হাজার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন। তাঁদের মধ্যে ওরাওঁ, সাঁওতাল ও মুন্ডা সম্প্রদায় উল্লেখযোগ্য।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার সীমান্তঘেঁষা হওয়ায় উপজেলার নিরমইল ও শিহাড়া ইউনিয়ন আন্তর্জাতিক সীমান্তের সঙ্গে সংযুক্ত। ফলে সীমান্ত এলাকায় চোরাচালান, মাদক পাচার প্রতিরোধ এবং সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ। পাশাপাশি ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ, মারামারি, চুরি, ছিনতাই ও মাদক-সংশ্লিষ্ট অপরাধ দমনেও নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে পুলিশ।

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, "পত্নীতলা থানা শুধু একটি প্রশাসনিক ইউনিট নয়, এটি দুই শতাব্দীর ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক। সীমান্ত এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, চোরাচালান ও মাদক প্রতিরোধ এবং জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নওগাঁ জেলা পুলিশ ও পত্নীতলা থানা সর্বোচ্চ আন্তরিকতা, পেশাদারিত্ব ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিংয়ের মাধ্যমে জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।"

দুই শতাব্দীর ঐতিহ্য, ইতিহাস, প্রত্নসম্পদ এবং সীমান্ত নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে পত্নীতলা থানা আজও উত্তরাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী পুলিশি ইউনিট হিসেবে পরিচিত।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ