মেঘ, পাহাড় আর সবুজ প্রকৃতির অপরূপ মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা সাজেক ভ্যালি দীর্ঘদিন ধরেই দেশি-বিদেশি পর্যটকদের অন্যতম প্রিয় গন্তব্য। রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নে অবস্থিত এই পর্যটনকেন্দ্রে প্রতিবছর হাজারো দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখর থাকে পাহাড়ি জনপদ। আর সেই সাজেকেই এখন নতুন এক আকর্ষণের নাম ‘দারুস সালাম জামে মসজিদ’। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই মসজিদটি ধর্মীয় উপাসনালয় হলেও এটি এখন সম্প্রীতি ও সৌন্দর্যের এক অনন্য প্রতীক। নামাজের সময় মুসল্লিদের উপস্থিতির পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মের পর্যটকরাও মসজিদের সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভিড় করেন। অনেকেই স্মৃতি ধরে রাখতে ছবি ও সেলফি তুলছেন। একসময় সাজেকে বেড়াতে এসে মুসলিম পর্যটকদের নামাজ আদায়ে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হতো। পর্যটকদের দীর্ঘদিনের সেই দাবি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত হয় দারুস সালাম জামে মসজিদ। ফলে এখন ভ্রমণের পাশাপাশি নির্বিঘ্নে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে পারছেন ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা। রংপুর থেকে সাজেকে বেড়াতে আসা পর্যটক আব্দুল কাদের বলেন, "পাহাড়ের চূড়ায় এত সুন্দর একটি মসজিদ দেখে সত্যিই মন ভরে গেছে। সাজেকে পৌঁছেই এখানে জোহরের নামাজ আদায় করেছি। কয়েকদিন অবস্থান করলেও নামাজ নিয়ে আর কোনো দুশ্চিন্তা নেই।" ঢাকা থেকে আসা পর্যটক আনিস মাহমুদ বলেন, "আগে হোটেলে নামাজ পড়তে হতো। এখন এখানে জুমার নামাজ আদায় করতে পারছি। মসজিদের সৌন্দর্য এবং পরিবেশ আমাকে সত্যিই মুগ্ধ করেছে।" জানা যায়, ২০২০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সাজেকের রুইলুইপাড়ায় হেলিপ্যাড সংলগ্ন স্থানে মসজিদটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল এস এম মতিউর রহমান। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত এই মসজিদের নাম রাখা হয় দারুস সালাম জামে মসজিদ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১ হাজার ৭০০ ফুট উচ্চতায় এক একর জায়গাজুড়ে নির্মিত এই মসজিদে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৮৫ লাখ ৬৫ হাজার ৭৮৮ টাকা। প্রায় ৫ হাজার ২৬৫ বর্গফুট আয়তনের মসজিদটিতে রয়েছে চারটি গম্বুজ, একটি সুউচ্চ মিনার এবং চারতলা ফাউন্ডেশনের শক্তিশালী কাঠামো। পূর্ব-পশ্চিমে এর দৈর্ঘ্য ৬৫ ফুট এবং উত্তর-দক্ষিণে প্রস্থ ৮১ ফুট। প্রায় দুই বছরের নির্মাণকাজ শেষে এটি বর্তমানে সেনাবাহিনীর বাঘাইহাট জোনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্য মোহাম্মদ জহির জানান, প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করা হয়। প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজে স্থানীয়দের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক পর্যটক অংশ নেন। রমজান মাসে খতমে তারাবির নামাজও অনুষ্ঠিত হয়। ২০২২ সালের রমজানেই এ মসজিদে আনুষ্ঠানিকভাবে তারাবির নামাজ শুরু হয়। মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. জাফর আলম বলেন, সেনাবাহিনীর বাঘাইহাট জোন নিয়মিত অর্থসহ বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা করে থাকে। এছাড়া স্থানীয় হোটেল-মোটেল ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের দান-অনুদানেই মসজিদের দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করা হয়। তিনি জানান, পাহাড়ি এলাকায় অবস্থানের কারণে মসজিদে পানির সংকট একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ওজু ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহারের জন্য প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ হাজার লিটার পানি কিনে আনতে হয়। তবে সবার সহযোগিতায় এ ব্যয় নির্বাহে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। মেঘে মোড়া সাজেকের বুকজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা দারুস সালাম জামে মসজিদ এখন শুধু মুসল্লিদের ইবাদতের স্থানই নয়, বরং সম্প্রীতি, নান্দনিক স্থাপত্য ও পাহাড়ি সৌন্দর্যের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে পর্যটকদের হৃদয়েও বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ আগস্ট ২০২৬
মেঘ, পাহাড় আর সবুজ প্রকৃতির অপরূপ মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা সাজেক ভ্যালি দীর্ঘদিন ধরেই দেশি-বিদেশি পর্যটকদের অন্যতম প্রিয় গন্তব্য। রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক ইউনিয়নে অবস্থিত এই পর্যটনকেন্দ্রে প্রতিবছর হাজারো দর্শনার্থীর পদচারণায় মুখর থাকে পাহাড়ি জনপদ। আর সেই সাজেকেই এখন নতুন এক আকর্ষণের নাম ‘দারুস সালাম জামে মসজিদ’। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই মসজিদটি ধর্মীয় উপাসনালয় হলেও এটি এখন সম্প্রীতি ও সৌন্দর্যের এক অনন্য প্রতীক। নামাজের সময় মুসল্লিদের উপস্থিতির পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মের পর্যটকরাও মসজিদের সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভিড় করেন। অনেকেই স্মৃতি ধরে রাখতে ছবি ও সেলফি তুলছেন। একসময় সাজেকে বেড়াতে এসে মুসলিম পর্যটকদের নামাজ আদায়ে নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হতো। পর্যটকদের দীর্ঘদিনের সেই দাবি বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত হয় দারুস সালাম জামে মসজিদ। ফলে এখন ভ্রমণের পাশাপাশি নির্বিঘ্নে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে পারছেন ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা। রংপুর থেকে সাজেকে বেড়াতে আসা পর্যটক আব্দুল কাদের বলেন, "পাহাড়ের চূড়ায় এত সুন্দর একটি মসজিদ দেখে সত্যিই মন ভরে গেছে। সাজেকে পৌঁছেই এখানে জোহরের নামাজ আদায় করেছি। কয়েকদিন অবস্থান করলেও নামাজ নিয়ে আর কোনো দুশ্চিন্তা নেই।" ঢাকা থেকে আসা পর্যটক আনিস মাহমুদ বলেন, "আগে হোটেলে নামাজ পড়তে হতো। এখন এখানে জুমার নামাজ আদায় করতে পারছি। মসজিদের সৌন্দর্য এবং পরিবেশ আমাকে সত্যিই মুগ্ধ করেছে।" জানা যায়, ২০২০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সাজেকের রুইলুইপাড়ায় হেলিপ্যাড সংলগ্ন স্থানে মসজিদটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল এস এম মতিউর রহমান। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের যৌথ উদ্যোগে নির্মিত এই মসজিদের নাম রাখা হয় দারুস সালাম জামে মসজিদ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১ হাজার ৭০০ ফুট উচ্চতায় এক একর জায়গাজুড়ে নির্মিত এই মসজিদে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৮৫ লাখ ৬৫ হাজার ৭৮৮ টাকা। প্রায় ৫ হাজার ২৬৫ বর্গফুট আয়তনের মসজিদটিতে রয়েছে চারটি গম্বুজ, একটি সুউচ্চ মিনার এবং চারতলা ফাউন্ডেশনের শক্তিশালী কাঠামো। পূর্ব-পশ্চিমে এর দৈর্ঘ্য ৬৫ ফুট এবং উত্তর-দক্ষিণে প্রস্থ ৮১ ফুট। প্রায় দুই বছরের নির্মাণকাজ শেষে এটি বর্তমানে সেনাবাহিনীর বাঘাইহাট জোনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্য মোহাম্মদ জহির জানান, প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করা হয়। প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজে স্থানীয়দের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক পর্যটক অংশ নেন। রমজান মাসে খতমে তারাবির নামাজও অনুষ্ঠিত হয়। ২০২২ সালের রমজানেই এ মসজিদে আনুষ্ঠানিকভাবে তারাবির নামাজ শুরু হয়। মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি মো. জাফর আলম বলেন, সেনাবাহিনীর বাঘাইহাট জোন নিয়মিত অর্থসহ বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা করে থাকে। এছাড়া স্থানীয় হোটেল-মোটেল ব্যবসায়ী ও পর্যটকদের দান-অনুদানেই মসজিদের দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহ করা হয়। তিনি জানান, পাহাড়ি এলাকায় অবস্থানের কারণে মসজিদে পানির সংকট একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ওজু ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহারের জন্য প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ হাজার লিটার পানি কিনে আনতে হয়। তবে সবার সহযোগিতায় এ ব্যয় নির্বাহে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। মেঘে মোড়া সাজেকের বুকজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা দারুস সালাম জামে মসজিদ এখন শুধু মুসল্লিদের ইবাদতের স্থানই নয়, বরং সম্প্রীতি, নান্দনিক স্থাপত্য ও পাহাড়ি সৌন্দর্যের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে পর্যটকদের হৃদয়েও বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে।

আপনার মতামত লিখুন