কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী পাকুন্দিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে এখন আর শুধু ধানের সবুজ সমারোহ চোখে পড়ে না। বর্ষার ভেজা আবহ কিংবা শরৎ-হেমন্তের অসময়েও মাঠজুড়ে দেখা মিলছে সারিবদ্ধ মাচায় ঝুলে থাকা টকটকে লাল, রসালো তরমুজের। প্রতিটি ফল ডাবল নেটের মাধ্যমে সুরক্ষিতভাবে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, যা একদিকে যেমন দৃষ্টিনন্দন, অন্যদিকে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তিরও উজ্জ্বল উদাহরণ। যে সময়ে একসময় তরমুজ চাষের কথা কল্পনাও করা হতো না, সেই সময়েই এখন পাকুন্দিয়ার চণ্ডিপাশা, এগারসিন্দুর, আঙ্গিয়াদী ও ষাইটকাহনসহ বিভিন্ন গ্রামের কৃষকরা বাণিজ্যিকভাবে অফ-সিজন তরমুজ উৎপাদন করছেন। প্রথাগত ফসল চাষে বারবার লোকসানের মুখে পড়া কৃষকদের জীবনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে উচ্চফলনশীল হাইব্রিড বীজ ও আধুনিক মালচিং প্রযুক্তি। কৃষকদের ভাষ্য, আগে বর্ষা মৌসুমে অনেক জমি জলাবদ্ধ বা অনাবাদি পড়ে থাকত। এখন সেই জমিতেই লাখ লাখ টাকার তরমুজ উৎপাদন হচ্ছে। প্রচলিত ফসলের তুলনায় এই চাষে লাভও কয়েকগুণ বেশি হওয়ায় দিন দিন বাড়ছে আগ্রহ। অসময়ে তরমুজ চাষে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার কারণে রোগবালাইয়ের ঝুঁকি। কৃষকদের দাবি, উন্নতমানের হাইব্রিড বীজ ব্যবহারের ফলে এসব ঝুঁকি অনেকটাই কমে এসেছে। বিশেষ করে ভাইরাস সহনশীল ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় টিকে থাকতে সক্ষম জাতগুলো ভালো ফলন দিচ্ছে। মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, জমিতে সিলভার ও কালো মালচিং পেপার ব্যবহার করা হয়েছে। এতে আগাছা কম জন্মায়, মাটির আর্দ্রতা বজায় থাকে এবং পোকামাকড়ের আক্রমণও কম হয়। তরমুজ গাছ মাচার ওপর উঠিয়ে চাষ করা হচ্ছে। ফল বড় হওয়ার পর বিশেষ জালি বা নেট দিয়ে প্রতিটি তরমুজ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, যাতে ফলের ওজনে লতা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। পাশাপাশি রাসায়নিক কীটনাশকের পরিবর্তে ফেরোমোন ট্র্যাপ ও ইয়েলো ট্র্যাপ ব্যবহারের ফলে উৎপাদিত তরমুজ তুলনামূলক নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত থাকছে। পাকুন্দিয়া উপজেলার চণ্ডিপাশা ইউনিয়নের কৃষক আবু বকর সিদ্দিক জানান, প্রায় এক বিঘা জমিতে প্রথমবারের মতো অফ-সিজন তরমুজ চাষ করে তিনি আশাতীত সফলতা পেয়েছেন। তিনি বলেন, "শুরুতে ভয় ছিল অসময়ে তরমুজ হবে কি না। কিন্তু ভালো মানের বীজ ও কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে সফল হয়েছি। প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ইতোমধ্যে জমি থেকেই ভালো দামে তরমুজ বিক্রি করেছি। পুরো খেত বিক্রি শেষ হলে দেড় লাখ টাকারও বেশি নিট লাভ হবে।" মাঠ পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বিঘা জমিতে বীজ, জমি প্রস্তুত, মালচিং পেপার, মাচা নির্মাণ, পরিচর্যা ও সারসহ মোট ব্যয় হয় প্রায় ৪৫ থেকে ৫৫ হাজার টাকা। অন্যদিকে অফ-সিজনে বাজারে তরমুজের চাহিদা বেশি থাকায় একই জমি থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি সম্ভব হচ্ছে। সব ব্যয় বাদ দিয়ে কৃষকের হাতে থাকছে ১ লাখ ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট লাভ। বর্তমানে অফ-সিজনের তরমুজ খেত থেকেই প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৯০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা সরাসরি কৃষকের মাঠে এসে তরমুজ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। একজন পাইকারি ফল ব্যবসায়ী বলেন, "মৌসুমের বাইরে ভালো মানের তরমুজের চাহিদা অনেক বেশি। মিষ্টি ও আকর্ষণীয় হওয়ায় ক্রেতারাও আগ্রহ নিয়ে কিনছেন।" পাকুন্দিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার ভাষ্য, চলতি মৌসুমে উপজেলায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমিতে অফ-সিজন তরমুজের আবাদ হয়েছে। অন্যান্য প্রচলিত ফসলের তুলনায় অধিক লাভজনক হওয়ায় কৃষকদের আগ্রহও বাড়ছে। তিনি বলেন, "উন্নত জাতের বীজ নির্বাচন এবং আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি কৃষি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কৃষি বিভাগ নিয়মিত মাঠপর্যায়ে প্রযুক্তিগত পরামর্শ ও সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।" একসময় যে জমিগুলো বছরের একটি বড় সময় অনাবাদি পড়ে থাকত, আজ সেখানেই উৎপাদিত হচ্ছে উচ্চমূল্যের তরমুজ। কৃষকের পরিশ্রম, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উন্নত বীজের সমন্বয়ে পাকুন্দিয়ায় গড়ে উঠছে অফ-সিজন তরমুজ চাষের নতুন সম্ভাবনা। প্রয়োজনীয় সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এই অঞ্চল দেশের অন্যতম অফ-সিজন তরমুজ উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ জুলাই ২০২৬
কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী পাকুন্দিয়া উপজেলার বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে এখন আর শুধু ধানের সবুজ সমারোহ চোখে পড়ে না। বর্ষার ভেজা আবহ কিংবা শরৎ-হেমন্তের অসময়েও মাঠজুড়ে দেখা মিলছে সারিবদ্ধ মাচায় ঝুলে থাকা টকটকে লাল, রসালো তরমুজের। প্রতিটি ফল ডাবল নেটের মাধ্যমে সুরক্ষিতভাবে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, যা একদিকে যেমন দৃষ্টিনন্দন, অন্যদিকে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তিরও উজ্জ্বল উদাহরণ। যে সময়ে একসময় তরমুজ চাষের কথা কল্পনাও করা হতো না, সেই সময়েই এখন পাকুন্দিয়ার চণ্ডিপাশা, এগারসিন্দুর, আঙ্গিয়াদী ও ষাইটকাহনসহ বিভিন্ন গ্রামের কৃষকরা বাণিজ্যিকভাবে অফ-সিজন তরমুজ উৎপাদন করছেন। প্রথাগত ফসল চাষে বারবার লোকসানের মুখে পড়া কৃষকদের জীবনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে উচ্চফলনশীল হাইব্রিড বীজ ও আধুনিক মালচিং প্রযুক্তি। কৃষকদের ভাষ্য, আগে বর্ষা মৌসুমে অনেক জমি জলাবদ্ধ বা অনাবাদি পড়ে থাকত। এখন সেই জমিতেই লাখ লাখ টাকার তরমুজ উৎপাদন হচ্ছে। প্রচলিত ফসলের তুলনায় এই চাষে লাভও কয়েকগুণ বেশি হওয়ায় দিন দিন বাড়ছে আগ্রহ। অসময়ে তরমুজ চাষে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, উচ্চ তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার কারণে রোগবালাইয়ের ঝুঁকি। কৃষকদের দাবি, উন্নতমানের হাইব্রিড বীজ ব্যবহারের ফলে এসব ঝুঁকি অনেকটাই কমে এসেছে। বিশেষ করে ভাইরাস সহনশীল ও প্রতিকূল আবহাওয়ায় টিকে থাকতে সক্ষম জাতগুলো ভালো ফলন দিচ্ছে। মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, জমিতে সিলভার ও কালো মালচিং পেপার ব্যবহার করা হয়েছে। এতে আগাছা কম জন্মায়, মাটির আর্দ্রতা বজায় থাকে এবং পোকামাকড়ের আক্রমণও কম হয়। তরমুজ গাছ মাচার ওপর উঠিয়ে চাষ করা হচ্ছে। ফল বড় হওয়ার পর বিশেষ জালি বা নেট দিয়ে প্রতিটি তরমুজ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, যাতে ফলের ওজনে লতা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। পাশাপাশি রাসায়নিক কীটনাশকের পরিবর্তে ফেরোমোন ট্র্যাপ ও ইয়েলো ট্র্যাপ ব্যবহারের ফলে উৎপাদিত তরমুজ তুলনামূলক নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত থাকছে। পাকুন্দিয়া উপজেলার চণ্ডিপাশা ইউনিয়নের কৃষক আবু বকর সিদ্দিক জানান, প্রায় এক বিঘা জমিতে প্রথমবারের মতো অফ-সিজন তরমুজ চাষ করে তিনি আশাতীত সফলতা পেয়েছেন। তিনি বলেন, "শুরুতে ভয় ছিল অসময়ে তরমুজ হবে কি না। কিন্তু ভালো মানের বীজ ও কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে সফল হয়েছি। প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ইতোমধ্যে জমি থেকেই ভালো দামে তরমুজ বিক্রি করেছি। পুরো খেত বিক্রি শেষ হলে দেড় লাখ টাকারও বেশি নিট লাভ হবে।" মাঠ পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বিঘা জমিতে বীজ, জমি প্রস্তুত, মালচিং পেপার, মাচা নির্মাণ, পরিচর্যা ও সারসহ মোট ব্যয় হয় প্রায় ৪৫ থেকে ৫৫ হাজার টাকা। অন্যদিকে অফ-সিজনে বাজারে তরমুজের চাহিদা বেশি থাকায় একই জমি থেকে ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি সম্ভব হচ্ছে। সব ব্যয় বাদ দিয়ে কৃষকের হাতে থাকছে ১ লাখ ২৫ হাজার থেকে ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নিট লাভ। বর্তমানে অফ-সিজনের তরমুজ খেত থেকেই প্রতি কেজি ৭০ থেকে ৯০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার পাইকাররা সরাসরি কৃষকের মাঠে এসে তরমুজ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। একজন পাইকারি ফল ব্যবসায়ী বলেন, "মৌসুমের বাইরে ভালো মানের তরমুজের চাহিদা অনেক বেশি। মিষ্টি ও আকর্ষণীয় হওয়ায় ক্রেতারাও আগ্রহ নিয়ে কিনছেন।" পাকুন্দিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার ভাষ্য, চলতি মৌসুমে উপজেলায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমিতে অফ-সিজন তরমুজের আবাদ হয়েছে। অন্যান্য প্রচলিত ফসলের তুলনায় অধিক লাভজনক হওয়ায় কৃষকদের আগ্রহও বাড়ছে। তিনি বলেন, "উন্নত জাতের বীজ নির্বাচন এবং আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি কৃষি উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কৃষি বিভাগ নিয়মিত মাঠপর্যায়ে প্রযুক্তিগত পরামর্শ ও সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।" একসময় যে জমিগুলো বছরের একটি বড় সময় অনাবাদি পড়ে থাকত, আজ সেখানেই উৎপাদিত হচ্ছে উচ্চমূল্যের তরমুজ। কৃষকের পরিশ্রম, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উন্নত বীজের সমন্বয়ে পাকুন্দিয়ায় গড়ে উঠছে অফ-সিজন তরমুজ চাষের নতুন সম্ভাবনা। প্রয়োজনীয় সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এই অঞ্চল দেশের অন্যতম অফ-সিজন তরমুজ উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন