ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

কিশোরগঞ্জে বাইক পার্টসের প্যাকেটে ‘গোপন কোড’ ও মনগড়া দাম: অসহায় ক্রেতা, নীরব প্রশাসন


সৈয়দ মইনুল হোসেন, কিশোরগঞ্জ
সৈয়দ মইনুল হোসেন, কিশোরগঞ্জ
প্রকাশ : ২২ জুলাই ২০২৬

কিশোরগঞ্জে বাইক পার্টসের প্যাকেটে ‘গোপন কোড’ ও মনগড়া দাম: অসহায় ক্রেতা, নীরব প্রশাসন

কিশোরগঞ্জ শহরের ব্যস্ততম কালীবাড়ি মোড়। দুই চাকার স্বপ্ন নিয়ে নিত্যদিন এখানে ছুটে আসেন শত শত মোটরসাইকেল চালক। কালক্রমে এলাকাটি বাইকের খুচরা যন্ত্রাংশ বা পার্টসের একটি অন্যতম নির্ভরযোগ্য কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকা ১০-১২টি পার্টসের দোকানে সকাল থেকে রাত অবধি জমে ওঠে কেনাকাটার হাঁকডাক। দূর থেকে  চকচকে আকর্ষণীয় প্যাকেট আর পছন্দের ব্র্যান্ডের নাম দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন ক্রেতারা। কিন্তু এই মনকাড়া মোড়কের আড়ালেই কি লুকিয়ে আছে কোনো অদৃশ্য জালিয়াতির ফাঁদ? চাকচিক্যময় মোড়কের গায়ে লেখা গোপন কোড আর দোকানদারদের মনগড়া দামের কাছে প্রতিনিয়ত জিম্মি ও চরমভাবে প্রতারিত হচ্ছেন সাধারণ বাইকাররা—এমনই এক চাঞ্চল্যকর সত্য ফুটে উঠেছে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে।

​সাধারণত বাজার থেকে আমরা যখন কোনো ওষুধ, প্রসাধনসামগ্রী কিংবা খাদ্যপণ্য কিনি, তখন প্যাকেটের গায়ে সর্বোচ্চ খুচরা বিক্রয়মূল্য (MRP), উৎপাদনের তারিখ ও মেয়াদ সুস্পষ্টভাবে লেখা থাকে। এটাই আইন, এটাই নিয়ম। কিন্তু কিশোরগঞ্জের কালীবাড়ি মোড়ের মোটরসাইকেল পার্টসের দোকানগুলোতে এই আইনি বাধ্যবাধকতার যেন কোনো অস্তিত্বই নেই! ​পার্টসের আকর্ষণীয় প্লাস্টিক বা কার্টনের গায়ে পণ্যের রঙিন ছবি শোভা পেলেও উধাও হয়ে গেছে পণ্যের আসল দামের ঘর। কোনো প্যাকেটে দামের জায়গাটি ফাঁকা, আবার কোনোটিতে লেখা নেই কোনো উৎপাদন তারিখ। কিন্তু দাম না থাকলে দোকানদাররা কীভাবে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করেন? ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই প্রশ্নটিই এখন কিশোরগঞ্জের প্রতিটি নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত বাইকারকে তাড়া করে ফিরছে।


​সম্প্রতি এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন এক স্থানীয় বাইকার। নিজের মোটরসাইকেলের একটি সাধারণ ইগনিশন সুইচ (মিটারের) কিনতে একটি দোকানে গেলে দোকানি দাম হাঁকেন ৪৮০ টাকা। দাম শুনে খটকা লাগায় তিনি পাশের আরেকটি দোকানে গিয়ে একই সুইচ যাচাই করেন। সেখানে সেটির দাম চাওয়া হয় মাত্র ৩০০ টাকা! মাত্র কয়েক গজ ব্যবধানে একই পণ্যের দামে ১৮০ টাকার এই বিশাল ফারাক যেকোনো সচেতন মানুষকে স্তম্ভিত করার জন্য যথেষ্ট। ​ঘটনার ভয়াবহতা এখানেই শেষ নয়। মাত্র দু’দিন আগে কিশোরগঞ্জের প্রবীণ লেখক ও বিশিষ্ট সাংবাদিক আতাউর রহমান বাচ্চু কালীবাড়ি মোড়ের ‘ঊষা এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি স্বনামধন্য দোকান থেকে ৮,৫০০ টাকা দিয়ে মোট ২১টি পার্টস ক্রয় করেন। কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো, কেনা ২১টি যন্ত্রাংশের কোনো একটির প্যাকেটেও কোনো অফিসিয়াল দাম বা মেয়াদের তারিখ লেখা ছিল না। ​তাহলে দোকানদার কীভাবে এই ৮,৫০০ টাকার হিসাব মেলালেন? পার্টসের প্যাকেটগুলো ভালো করে নিরীক্ষা করে মিলল এক রহস্যময় সংকেতের সন্ধান।ক্রেতা আতাউর রহমান বাচ্চু বলেন, ​"প্যাকেটের গায়ে কোনো মুদ্রিত মূল্য ছিল না। ছিল কেবল কালো মার্কার কলম দিয়ে হাতে লেখা কিছু অস্পষ্ট গোপন কোড— যেমন Lx\ 2, XB2, ACE\ 2, B2, কিংবা XX\ 2। ক্রেতার মুখের দিকে তাকিয়ে আর এই গোপন কোড দেখে চোখের পলকে নির্ধারিত হয়ে যায় পণ্যের দাম!" 

​ব্যবসায়ীদের এই ‘মার্কার কোড’ বা গোপন সাংকেতিক ভাষা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা গুঞ্জন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওয়াকিবহাল মহল ও অভিজ্ঞদের মতে, এই কোডগুলোর মাধ্যমে মূলত পাইকারি কেনাদাম অথবা ব্যবসায়ীদের নিজেদের নির্ধারণ করা একটি লাভজনক গাণিতিক সূত্র লুকিয়ে রাখা হয়, যা সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে বোঝা একেবারেই অসম্ভব। সাধারণ বা অসচেতন ক্রেতা দেখলে কোড অনুযায়ী পণ্যের গায়ে দ্বিগুণ বা তিনগুণ দাম বসিয়ে দেওয়া হয়। ক্রেতা কিছুটা দরদাম করলে তথাকথিত 'ছাড়' দিয়ে যে দামে বিক্রি করা হয়, সেটিও আসল মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি। দোকানদাররা এই কোড দেখিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলেন, কিন্তু মূল চালান বা ইমপোর্ট ডকুমেন্টের তথ্য প্রকাশে তাদের চরম অনিহা। ​ফলাফল? নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের যেসব মানুষ কষ্টার্জিত টাকায় একটি মোটরসাইকেল কিনে যাতায়াত বা জীবিকা নির্বাহ করছেন, তারা বছরের পর বছর ধরে নিভৃতে পকেট কাটা যাচ্ছেন। একেকজন ক্রেতার কাছ থেকে যার যেমন খুশি মূল্য আদায়ের এক নগ্ন ও অশুভ প্রতিযোগিতা চলছে পুরো কিশোরগঞ্জ জুড়ে।

​এসব মনগড়া দাম ও রহস্যজনক সংকেতের বিষয়ে কালীবাড়ি মোড়ের কয়েকজন ব্যবসায়ীর কাছে জানতে চাওয়া হলে তারা কোনো সুনির্দিষ্ট ও যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বিক্রেতা দাবি করেন, "আমদানিকারকরাই প্যাকেটে দাম লিখে দেন না, তাই আমাদের হিসাব রাখার সুবিধার জন্য মার্কার দিয়ে সংকেত লিখে রাখতে হয়।" ​তবে ব্যবসায়ীদের এই অজুহাতকে ভিত্তিহীন ও ভুয়া বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন ভুক্তভোগী বাইকাররা। তাদের মতে, সঠিক হিসাব রাখার জন্য কাস্টমার ইনভয়েস বা সফটওয়্যার থাকতে পারে, কিন্তু প্রকাশ্যে মার্কার দিয়ে লিখে পণ্যের দাম গোপন রাখার মধ্যে স্পষ্ট প্রতারণার অভিসন্ধি রয়েছে।


​এক ক্ষুব্ধ বাইক চালক বলেন, "আমরা মেকানিকের মজুরি দিতে আপত্তি করি না। কিন্তু পার্টসের আসল দাম না জেনে মনগড়া দামে কেনাকাটা করাটা সোজা ভাষায় ডাকাতি। এ যেন এক অরাজক মগের মুল্লুক!"


​বর্তমান সরকার ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর’ ইতোমধ্যে দেশের সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে তারা দেশের হোটেল-রেস্তোরাঁ, পাইকারি ও খুচরা চাল-ডালের বাজার, প্রসাধনসামগ্রীর দোকান এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। ভুয়া পণ্যের কেনাবেচা থামানো এবং সঠিক মূল্য নিশ্চিতকরণে তাদের কঠোর ভূমিকা আজ সর্বত্র স্বীকৃত। ​এখন প্রশ্ন উঠেছে— খাদ্য ও ওষুধের বাজারে যদি ভোক্তা অধিকারের অভিযান চলতে পারে, তবে মোটরসাইকেল পার্টসের দোকানগুলো কেন আওতার বাইরে থাকবে?


​কিশোরগঞ্জের সচেতন নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক ও ভুক্তভোগী বাইকারদের এখন একটাই জোর দাবি— অবিলম্বে কালীবাড়ি মোড়সহ জেলার বিভিন্ন পার্টসের দোকানগুলোতে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের সরেজমিনে অভিযান পরিচালনা করা হোক। ​তদন্তের মাধ্যমে উন্মোচিত হোক প্যাকেটের গায়ে থাকা সেই গোপন মার্কার কোডের আসল রহস্য। নিশ্চিত করা হোক প্রতিটি পার্টসের গায়ে বাধ্যতামূলক প্রদেয় সর্বোচ্চ খুচরা বিক্রয়মূল্য (MRP) এবং ইমপোর্ট চালানের সত্যতা। কিশোরগঞ্জের সাধারণ বাইকারদের এই নীরব শোষণের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং পার্টস বাজারের অরাজকতার লাগাম টেনে ধরতে দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ এখন শুধুই সময়ের দাবি।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


কিশোরগঞ্জে বাইক পার্টসের প্যাকেটে ‘গোপন কোড’ ও মনগড়া দাম: অসহায় ক্রেতা, নীরব প্রশাসন

প্রকাশের তারিখ : ২২ জুলাই ২০২৬

featured Image

কিশোরগঞ্জ শহরের ব্যস্ততম কালীবাড়ি মোড়। দুই চাকার স্বপ্ন নিয়ে নিত্যদিন এখানে ছুটে আসেন শত শত মোটরসাইকেল চালক। কালক্রমে এলাকাটি বাইকের খুচরা যন্ত্রাংশ বা পার্টসের একটি অন্যতম নির্ভরযোগ্য কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সারি সারি দাঁড়িয়ে থাকা ১০-১২টি পার্টসের দোকানে সকাল থেকে রাত অবধি জমে ওঠে কেনাকাটার হাঁকডাক। দূর থেকে  চকচকে আকর্ষণীয় প্যাকেট আর পছন্দের ব্র্যান্ডের নাম দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন ক্রেতারা। কিন্তু এই মনকাড়া মোড়কের আড়ালেই কি লুকিয়ে আছে কোনো অদৃশ্য জালিয়াতির ফাঁদ? চাকচিক্যময় মোড়কের গায়ে লেখা গোপন কোড আর দোকানদারদের মনগড়া দামের কাছে প্রতিনিয়ত জিম্মি ও চরমভাবে প্রতারিত হচ্ছেন সাধারণ বাইকাররা—এমনই এক চাঞ্চল্যকর সত্য ফুটে উঠেছে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে।

​সাধারণত বাজার থেকে আমরা যখন কোনো ওষুধ, প্রসাধনসামগ্রী কিংবা খাদ্যপণ্য কিনি, তখন প্যাকেটের গায়ে সর্বোচ্চ খুচরা বিক্রয়মূল্য (MRP), উৎপাদনের তারিখ ও মেয়াদ সুস্পষ্টভাবে লেখা থাকে। এটাই আইন, এটাই নিয়ম। কিন্তু কিশোরগঞ্জের কালীবাড়ি মোড়ের মোটরসাইকেল পার্টসের দোকানগুলোতে এই আইনি বাধ্যবাধকতার যেন কোনো অস্তিত্বই নেই! ​পার্টসের আকর্ষণীয় প্লাস্টিক বা কার্টনের গায়ে পণ্যের রঙিন ছবি শোভা পেলেও উধাও হয়ে গেছে পণ্যের আসল দামের ঘর। কোনো প্যাকেটে দামের জায়গাটি ফাঁকা, আবার কোনোটিতে লেখা নেই কোনো উৎপাদন তারিখ। কিন্তু দাম না থাকলে দোকানদাররা কীভাবে পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করেন? ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই প্রশ্নটিই এখন কিশোরগঞ্জের প্রতিটি নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত বাইকারকে তাড়া করে ফিরছে।


​সম্প্রতি এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন এক স্থানীয় বাইকার। নিজের মোটরসাইকেলের একটি সাধারণ ইগনিশন সুইচ (মিটারের) কিনতে একটি দোকানে গেলে দোকানি দাম হাঁকেন ৪৮০ টাকা। দাম শুনে খটকা লাগায় তিনি পাশের আরেকটি দোকানে গিয়ে একই সুইচ যাচাই করেন। সেখানে সেটির দাম চাওয়া হয় মাত্র ৩০০ টাকা! মাত্র কয়েক গজ ব্যবধানে একই পণ্যের দামে ১৮০ টাকার এই বিশাল ফারাক যেকোনো সচেতন মানুষকে স্তম্ভিত করার জন্য যথেষ্ট। ​ঘটনার ভয়াবহতা এখানেই শেষ নয়। মাত্র দু’দিন আগে কিশোরগঞ্জের প্রবীণ লেখক ও বিশিষ্ট সাংবাদিক আতাউর রহমান বাচ্চু কালীবাড়ি মোড়ের ‘ঊষা এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি স্বনামধন্য দোকান থেকে ৮,৫০০ টাকা দিয়ে মোট ২১টি পার্টস ক্রয় করেন। কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো, কেনা ২১টি যন্ত্রাংশের কোনো একটির প্যাকেটেও কোনো অফিসিয়াল দাম বা মেয়াদের তারিখ লেখা ছিল না। ​তাহলে দোকানদার কীভাবে এই ৮,৫০০ টাকার হিসাব মেলালেন? পার্টসের প্যাকেটগুলো ভালো করে নিরীক্ষা করে মিলল এক রহস্যময় সংকেতের সন্ধান।ক্রেতা আতাউর রহমান বাচ্চু বলেন, ​"প্যাকেটের গায়ে কোনো মুদ্রিত মূল্য ছিল না। ছিল কেবল কালো মার্কার কলম দিয়ে হাতে লেখা কিছু অস্পষ্ট গোপন কোড— যেমন Lx\ 2, XB2, ACE\ 2, B2, কিংবা XX\ 2। ক্রেতার মুখের দিকে তাকিয়ে আর এই গোপন কোড দেখে চোখের পলকে নির্ধারিত হয়ে যায় পণ্যের দাম!" 

​ব্যবসায়ীদের এই ‘মার্কার কোড’ বা গোপন সাংকেতিক ভাষা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা গুঞ্জন। সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওয়াকিবহাল মহল ও অভিজ্ঞদের মতে, এই কোডগুলোর মাধ্যমে মূলত পাইকারি কেনাদাম অথবা ব্যবসায়ীদের নিজেদের নির্ধারণ করা একটি লাভজনক গাণিতিক সূত্র লুকিয়ে রাখা হয়, যা সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে বোঝা একেবারেই অসম্ভব। সাধারণ বা অসচেতন ক্রেতা দেখলে কোড অনুযায়ী পণ্যের গায়ে দ্বিগুণ বা তিনগুণ দাম বসিয়ে দেওয়া হয়। ক্রেতা কিছুটা দরদাম করলে তথাকথিত 'ছাড়' দিয়ে যে দামে বিক্রি করা হয়, সেটিও আসল মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি। দোকানদাররা এই কোড দেখিয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলেন, কিন্তু মূল চালান বা ইমপোর্ট ডকুমেন্টের তথ্য প্রকাশে তাদের চরম অনিহা। ​ফলাফল? নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের যেসব মানুষ কষ্টার্জিত টাকায় একটি মোটরসাইকেল কিনে যাতায়াত বা জীবিকা নির্বাহ করছেন, তারা বছরের পর বছর ধরে নিভৃতে পকেট কাটা যাচ্ছেন। একেকজন ক্রেতার কাছ থেকে যার যেমন খুশি মূল্য আদায়ের এক নগ্ন ও অশুভ প্রতিযোগিতা চলছে পুরো কিশোরগঞ্জ জুড়ে।

​এসব মনগড়া দাম ও রহস্যজনক সংকেতের বিষয়ে কালীবাড়ি মোড়ের কয়েকজন ব্যবসায়ীর কাছে জানতে চাওয়া হলে তারা কোনো সুনির্দিষ্ট ও যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বিক্রেতা দাবি করেন, "আমদানিকারকরাই প্যাকেটে দাম লিখে দেন না, তাই আমাদের হিসাব রাখার সুবিধার জন্য মার্কার দিয়ে সংকেত লিখে রাখতে হয়।" ​তবে ব্যবসায়ীদের এই অজুহাতকে ভিত্তিহীন ও ভুয়া বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন ভুক্তভোগী বাইকাররা। তাদের মতে, সঠিক হিসাব রাখার জন্য কাস্টমার ইনভয়েস বা সফটওয়্যার থাকতে পারে, কিন্তু প্রকাশ্যে মার্কার দিয়ে লিখে পণ্যের দাম গোপন রাখার মধ্যে স্পষ্ট প্রতারণার অভিসন্ধি রয়েছে।


​এক ক্ষুব্ধ বাইক চালক বলেন, "আমরা মেকানিকের মজুরি দিতে আপত্তি করি না। কিন্তু পার্টসের আসল দাম না জেনে মনগড়া দামে কেনাকাটা করাটা সোজা ভাষায় ডাকাতি। এ যেন এক অরাজক মগের মুল্লুক!"


​বর্তমান সরকার ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর’ ইতোমধ্যে দেশের সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে তারা দেশের হোটেল-রেস্তোরাঁ, পাইকারি ও খুচরা চাল-ডালের বাজার, প্রসাধনসামগ্রীর দোকান এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। ভুয়া পণ্যের কেনাবেচা থামানো এবং সঠিক মূল্য নিশ্চিতকরণে তাদের কঠোর ভূমিকা আজ সর্বত্র স্বীকৃত। ​এখন প্রশ্ন উঠেছে— খাদ্য ও ওষুধের বাজারে যদি ভোক্তা অধিকারের অভিযান চলতে পারে, তবে মোটরসাইকেল পার্টসের দোকানগুলো কেন আওতার বাইরে থাকবে?


​কিশোরগঞ্জের সচেতন নাগরিক সমাজ, সাংবাদিক ও ভুক্তভোগী বাইকারদের এখন একটাই জোর দাবি— অবিলম্বে কালীবাড়ি মোড়সহ জেলার বিভিন্ন পার্টসের দোকানগুলোতে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের সরেজমিনে অভিযান পরিচালনা করা হোক। ​তদন্তের মাধ্যমে উন্মোচিত হোক প্যাকেটের গায়ে থাকা সেই গোপন মার্কার কোডের আসল রহস্য। নিশ্চিত করা হোক প্রতিটি পার্টসের গায়ে বাধ্যতামূলক প্রদেয় সর্বোচ্চ খুচরা বিক্রয়মূল্য (MRP) এবং ইমপোর্ট চালানের সত্যতা। কিশোরগঞ্জের সাধারণ বাইকারদের এই নীরব শোষণের হাত থেকে রক্ষা করতে এবং পার্টস বাজারের অরাজকতার লাগাম টেনে ধরতে দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ এখন শুধুই সময়ের দাবি।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ