ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

​নিকলীতে আনন্দের ভ্রমণ বিষাদে রূপ: ৪০ ঘণ্টা পর পর্যটক তুলুর মরদেহ উদ্ধার


সৈয়দ মইনুল হোসেন, কিশোরগঞ্জ
সৈয়দ মইনুল হোসেন, কিশোরগঞ্জ
প্রকাশ : ১২ জুলাই ২০২৬

​নিকলীতে আনন্দের ভ্রমণ বিষাদে রূপ: ৪০ ঘণ্টা পর পর্যটক তুলুর মরদেহ উদ্ধার

নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি কিশোরগঞ্জের নিকলী হাওর। বিস্তীর্ণ জলরাশির বুকে ভেসে বেড়ানোর আজন্ম সাধ নিয়ে বন্ধুদের সাথে আনন্দ ভ্রমণে এসেছিলেন গাজীপুরের তরুণ শফিকুল ইসলাম তুলু (২৮)। ট্রলারের ছাদে বন্ধুদের সাথে গান, আড্ডা আর সেলফিতে মেতে থাকা সেই তরুণের আনন্দ-উচ্ছ্বাস যে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মহা-বিষাদে রূপ নেবে, তা কে জানতো! নিখোঁজের দীর্ঘ ৪০ ঘণ্টা পর অবসান ঘটলো সব অপেক্ষার। তবে কোনো অলৌকিক বেঁচে ফেরার গল্প নয়, ঘোড়াউত্রা নদীর জল বুক চিরে ভেসে উঠলো তুলুর নিথর দেহ।


​আজ রবিবার (১২ জুলাই) সকাল সাড়ে ৬টার দিকে নিকলী উপজেলার দামপাড়া ইউনিয়নের কাঁঠালিয়া এলাকার ঘোড়াউত্রা নদী থেকে ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় জেলেদের সহায়তায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত শফিকুল ইসলাম তুলু গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলার কান্দানিয়া গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে।


​পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার সকালে গাজীপুরের কাপাসিয়া থেকে ২০-২৫ জনের একটি প্রাণবন্ত পর্যটক দল নিকলী হাওরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেন। হাওরের উত্তাল ঢেউ আর নীল জলরাশির মায়ায় মেতে ওঠেন তারা। কিন্তু দুপুরের পর হঠাৎ করেই ভাগ্যদেবী মুখ ফিরিয়ে নেয়। ​বিকেল ৩টার দিকে দামপাড়া ইউনিয়নের কাঁঠালিয়া এলাকায় পৌঁছালে পর্যটকদের বহনকারী নৌকার ইঞ্জিনটি বিকল হয়ে মাঝ-হাওরেই থমকে যায়। চারদিকে থৈ থৈ পানি। এমন সময় গরম আর ক্লান্তি দূর করতে শফিকুল ইসলাম তুলুসহ তিন বন্ধু হাওরের পানিতে গোসলে নামেন। কিন্তু প্রকৃতির নির্মম নিয়তি! সাতার কাটার একপর্যায়ে পানির প্রবল টানে চোখের পলকে তলিয়ে যান তুলু। সঙ্গের বন্ধুরা আপ্রাণ চেষ্টা করেও তাকে আর টেনে তুলতে পারেননি। মুহূর্তেই আনন্দের চিৎকার রূপ নেয় কান্নায়, স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো হাওর।


​ঘটনা জানার পরপরই নিকলী ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল স্থানীয় প্রশাসনকে সাথে নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। শুরু হয় নিখোঁজ তরুণকে খোঁজার রুদ্ধশ্বাস অভিযান। তবে শুক্রবার বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে আসায় প্রথম দিনের মতো উদ্ধারকাজ স্থগিত করতে হয়। ​শনিবার ভোর থেকে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল এবং স্থানীয় জেলেরা কাঁঠালিয়া এলাকার চারপাশের জলসীমায় চিরুনি তল্লাশি চালায়। কিন্তু দিনভর অক্লান্ত চেষ্টার পরও তুলুর কোনো সন্ধান মেলেনি। স্বজন আর বন্ধুদের চোখ তখন অশ্রুসজল, বুকভরা আশা কখন মিলবে প্রিয় মানুষের খোঁজ।

​অবশেষে আজ রবিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে নিখোঁজ হওয়ার স্থান থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে ঘোড়াউত্রা নদীতে একটি মরদেহ ভাসতে দেখেন স্থানীয় জেলেরা। খবর পেয়ে নিকলী ফায়ার সার্ভিসের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে শফিকুলের মরদেহ উদ্ধার করে তীরে নিয়ে আসে।

​নিকলী ফায়ার সার্ভিসের ফায়ার ফাইটার আহসান হাবীব ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, নিখোঁজের পর থেকেই ফায়ার সার্ভিস সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েছে। আজ সকালে নদী থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।


​নিকলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুবুর রহমান জানান, বন্ধুদের সাথে ঘুরতে এসে ইঞ্জিন বিকল হওয়ার পর গোসলে নেমেই এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

​এদিকে তুলুর মৃত্যুর খবর কাপাসিয়ার কান্দানিয়া গ্রামে পৌঁছালে সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। সন্তানকে হারিয়ে বুক ফেটে কাঁদছেন মা-বাবা। যে ছেলে বন্ধুদের সাথে হাসিমুখে ঘুরতে বেরিয়েছিল, সে যে এভাবে খাটিয়ায় চড়ে ফিরবে—তা যেন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না স্বজন ও প্রতিবেশীরা। এই মর্মান্তিক মৃত্যুতে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬


​নিকলীতে আনন্দের ভ্রমণ বিষাদে রূপ: ৪০ ঘণ্টা পর পর্যটক তুলুর মরদেহ উদ্ধার

প্রকাশের তারিখ : ১২ জুলাই ২০২৬

featured Image

নৈসর্গিক সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি কিশোরগঞ্জের নিকলী হাওর। বিস্তীর্ণ জলরাশির বুকে ভেসে বেড়ানোর আজন্ম সাধ নিয়ে বন্ধুদের সাথে আনন্দ ভ্রমণে এসেছিলেন গাজীপুরের তরুণ শফিকুল ইসলাম তুলু (২৮)। ট্রলারের ছাদে বন্ধুদের সাথে গান, আড্ডা আর সেলফিতে মেতে থাকা সেই তরুণের আনন্দ-উচ্ছ্বাস যে মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে মহা-বিষাদে রূপ নেবে, তা কে জানতো! নিখোঁজের দীর্ঘ ৪০ ঘণ্টা পর অবসান ঘটলো সব অপেক্ষার। তবে কোনো অলৌকিক বেঁচে ফেরার গল্প নয়, ঘোড়াউত্রা নদীর জল বুক চিরে ভেসে উঠলো তুলুর নিথর দেহ।


​আজ রবিবার (১২ জুলাই) সকাল সাড়ে ৬টার দিকে নিকলী উপজেলার দামপাড়া ইউনিয়নের কাঁঠালিয়া এলাকার ঘোড়াউত্রা নদী থেকে ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় জেলেদের সহায়তায় তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত শফিকুল ইসলাম তুলু গাজীপুর জেলার কাপাসিয়া উপজেলার কান্দানিয়া গ্রামের হাবিবুর রহমানের ছেলে।


​পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার সকালে গাজীপুরের কাপাসিয়া থেকে ২০-২৫ জনের একটি প্রাণবন্ত পর্যটক দল নিকলী হাওরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেন। হাওরের উত্তাল ঢেউ আর নীল জলরাশির মায়ায় মেতে ওঠেন তারা। কিন্তু দুপুরের পর হঠাৎ করেই ভাগ্যদেবী মুখ ফিরিয়ে নেয়। ​বিকেল ৩টার দিকে দামপাড়া ইউনিয়নের কাঁঠালিয়া এলাকায় পৌঁছালে পর্যটকদের বহনকারী নৌকার ইঞ্জিনটি বিকল হয়ে মাঝ-হাওরেই থমকে যায়। চারদিকে থৈ থৈ পানি। এমন সময় গরম আর ক্লান্তি দূর করতে শফিকুল ইসলাম তুলুসহ তিন বন্ধু হাওরের পানিতে গোসলে নামেন। কিন্তু প্রকৃতির নির্মম নিয়তি! সাতার কাটার একপর্যায়ে পানির প্রবল টানে চোখের পলকে তলিয়ে যান তুলু। সঙ্গের বন্ধুরা আপ্রাণ চেষ্টা করেও তাকে আর টেনে তুলতে পারেননি। মুহূর্তেই আনন্দের চিৎকার রূপ নেয় কান্নায়, স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো হাওর।


​ঘটনা জানার পরপরই নিকলী ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল স্থানীয় প্রশাসনকে সাথে নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। শুরু হয় নিখোঁজ তরুণকে খোঁজার রুদ্ধশ্বাস অভিযান। তবে শুক্রবার বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে আসায় প্রথম দিনের মতো উদ্ধারকাজ স্থগিত করতে হয়। ​শনিবার ভোর থেকে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল এবং স্থানীয় জেলেরা কাঁঠালিয়া এলাকার চারপাশের জলসীমায় চিরুনি তল্লাশি চালায়। কিন্তু দিনভর অক্লান্ত চেষ্টার পরও তুলুর কোনো সন্ধান মেলেনি। স্বজন আর বন্ধুদের চোখ তখন অশ্রুসজল, বুকভরা আশা কখন মিলবে প্রিয় মানুষের খোঁজ।

​অবশেষে আজ রবিবার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে নিখোঁজ হওয়ার স্থান থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে ঘোড়াউত্রা নদীতে একটি মরদেহ ভাসতে দেখেন স্থানীয় জেলেরা। খবর পেয়ে নিকলী ফায়ার সার্ভিসের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে শফিকুলের মরদেহ উদ্ধার করে তীরে নিয়ে আসে।

​নিকলী ফায়ার সার্ভিসের ফায়ার ফাইটার আহসান হাবীব ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, নিখোঁজের পর থেকেই ফায়ার সার্ভিস সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়েছে। আজ সকালে নদী থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।


​নিকলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহবুবুর রহমান জানান, বন্ধুদের সাথে ঘুরতে এসে ইঞ্জিন বিকল হওয়ার পর গোসলে নেমেই এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে।

​এদিকে তুলুর মৃত্যুর খবর কাপাসিয়ার কান্দানিয়া গ্রামে পৌঁছালে সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। সন্তানকে হারিয়ে বুক ফেটে কাঁদছেন মা-বাবা। যে ছেলে বন্ধুদের সাথে হাসিমুখে ঘুরতে বেরিয়েছিল, সে যে এভাবে খাটিয়ায় চড়ে ফিরবে—তা যেন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না স্বজন ও প্রতিবেশীরা। এই মর্মান্তিক মৃত্যুতে পুরো এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ