বর্ষার মেঘমল্লার রাগে আকাশ জুড়ে মেঘের ঘনঘটা, অথচ কিশোরগঞ্জের নিকলী হাওড়ে তার চেনা জলতরঙ্গ নেই। যে নদীমাতৃক হাওড় এই সময়ে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে দিগন্তজোড়া নীলিমার সাথে মিতালি করার কথা, সেখানে আজ এক অদ্ভুত শূন্যতা। প্রকৃতির খামখেয়ালিপনায় এবার মেঘের আঁচল থেকে ঝরেনি পর্যাপ্ত বারিধারা। ফলে, রূপের ডালি সাজিয়ে বসা নিকলী হাওড় তার চিরচেনা রূপ হারাতে বসেছে। আর হাওড়ের এই রুক্ষতার সাথে থমকে গেছে তার বুকে আশ্রিত হাজারো মানুষের জীবনের চাকা।
পর্যটনের ভরা মৌসুমে নিকলীতে এখন শুধুই নিঃশব্দ হাহাকার। থমকে গেছে জলনূপুর, অলস ঘাটে মাঝির দীর্ঘশ্বাস। বিগত বছরগুলোতে এই সময়ে নিকলীর বেড়িবাঁধ ও নৌঘাটগুলো মুখরিত থাকত হাজারো পর্যটকের কলকাকলিতে। ইঞ্জিনের ভটভট শব্দ, স্পিডবোটের জলকেলি আর তরঙ্গের নাচন হাওড়ের বাতাসকে উৎসবমুখর করে তুলত। অথচ এবারের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো।
জলবায়ু পরিবর্তনের অমোঘ নিয়তিতে এবার আগাম পানি নেমে গেছে হাওড় থেকে। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের অভাবে বিস্তীর্ণ জলরাশির বুকে জেগে উঠেছে চড়া। ঘাটজুড়ে সারিবদ্ধ নৌকাগুলো আজ নিস্পন্দ, অলস পড়ে আছে। যে মাঝিরা জলের বুকে স্বপ্ন বুনতেন, তাদের দিন কাটছে এখন ঘাটে বসে শূন্য দৃষ্টিতে আকাশের দিকে চেয়ে।
কোড়া নৌকার মাঝি সৈয়দ আলী কিংবা ঘাটের মাঝি করিমুল্লার মতো হাজারো মানুষের গল্পটা এখন একই রকম করুণ। ধারদেনা আর ঋণের কিস্তি মাথায় নিয়ে তারা বুক বেঁধেছিলেন এই বর্ষার আশায়। কিন্তু সারাদিনে একটি ট্রিপও না পেয়ে শূন্য হাতে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে তাদের। মাঝিদের ক্ষোভ আর হাহাকারে নিকলীর বাতাস আজ ভারী।
নিকলী হাওড়কে কেন্দ্র করে গত কয়েক বছরে গড়ে উঠেছিল এক বিশাল অর্থনৈতিক বৃত্ত। ২০২০ সালে ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম অলওয়েদার সড়ক উদ্বোধনের পর এই অঞ্চলের পর্যটন অর্থনীতি লাভ করেছিল নতুন গতি। প্রায় ১০ হাজার নৌকার মাঝির পাশাপাশি হোটেল, রেস্তোরাঁ, কফি শপ, মুদি দোকানদার, ফটোগ্রাফার এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সংসার চলত এই পর্যটকদের ঘিরে। কিন্তু এবার জল সংকটের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে পর্যটকদের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এবং কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভাড়ার অনাকাঙ্ক্ষিত অভিযোগ। ফলে পর্যটকেরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। ঘাটসংলগ্ন রেস্তোরাঁ ও কফি হাউসগুলো আজ ক্রেতাশূন্য। হোটেল কর্মচারী মুমিন কিংবা মুদি দোকানি ওসমানের কণ্ঠে ঝরে পড়ল ব্যবসা টিকিয়ে রাখার চরম আকুলতা। এভাবে চলতে থাকলে অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকেই ব্যবসা গুটিয়ে পথে বসতে হবে।
ঢাকা থেকে আগত মৌসুমী রায় বলেন,"অনেক দিন ধরেই নিকলী হাওড়ের বিস্তীর্ণ জলরাশির রূপ দেখার ইচ্ছে ছিল। জায়গাটা সুন্দর, কিন্তু পানি কম থাকায় হাওড়ের সেই আদিম, অতলান্ত রূপটা পুরোপুরি উপভোগ করতে পারলাম না।"
সবুজ প্রকৃতি আর আকাশ-পানির মিতালি দেখতে এখনও কিছু মানুষ ছুটে আসছেন দূর-দূরান্ত থেকে। মুন্সীগঞ্জ থেকে আসা মোহাম্মদ বেলাল হোসেন ও কামরুল হাসানরা জানালেন তাদের মুগ্ধতার কথা। তবে একই সাথে তারা রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রক্ষা এবং প্রশাসনের কঠোর নজরদারির মাধ্যমে অতিরিক্ত ভাড়া ও খাবারের দাম নিয়ন্ত্রণের দাবি জানান। স্থানীয় বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেনের মতেও, মুষ্টিমেয় অসাধু ব্যবসায়ীর লোভের কারণে যেন এই অপরূপ পর্যটন কেন্দ্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন না হয়, সেদিকে প্রশাসনের নজর দেওয়া জরুরি।
হাওড়ের এই দুঃসময়ে পর্যটকদের মনে আস্থা ফেরাতে তৎপর রয়েছে প্রশাসন। নিকলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহবুবুর রহমান জানান," নতুন পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় নিকলী ও করিমগঞ্জ প্রবেশপথে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। নদীপথে টহল বৃদ্ধি ও নৌ-পুলিশের সহায়তায় পর্যটকদের নির্বিঘ্ন ভ্রমণ নিশ্চিত করা হচ্ছে। এছাড়া
পর্যটকদের পোশাক পরিবর্তন ও সহায়তার জন্য একটি বিশেষ 'কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টার' স্থাপনের পরিকল্পনা চলছে "।
অন্যদিকে, নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শহীদউল্লাহ জানান, হাওড়ে পর্যাপ্ত পানি আসার সাথে সাথেই অংশীজনদের সাথে বসে নৌকার ভাড়া সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। এছাড়া হাওড়সংলগ্ন সড়কগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার কাজও শুরু হয়েছে।
প্রকৃতির এই সাময়িক বিরহ কাটিয়ে নিকলী আবার তার চেনা ঐশ্বর্যে ফিরবে—এমনটাই প্রত্যাশা সবার। আকাশ ভেঙে যদি আবার নামে কাঙ্ক্ষিত শ্রাবণের ধারা, তবেই হয়তো ধুয়ে যাবে মাঝিদের চোখের জল। জলতরঙ্গে আবারও নেচে উঠবে নিকলীর বুক, মুখরিত হবে ঘাট, আর বেঁচে থাকবে হাজারো শ্রমজীবী মানুষের স্বপ্ন ও জীবিকা। রূপসী নিকলী আবার ফিরে পাক তার চিরচেনা রূপ, এটাই এখন প্রকৃতি ও মানুষের যৌথ প্রার্থনা।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুলাই ২০২৬
বর্ষার মেঘমল্লার রাগে আকাশ জুড়ে মেঘের ঘনঘটা, অথচ কিশোরগঞ্জের নিকলী হাওড়ে তার চেনা জলতরঙ্গ নেই। যে নদীমাতৃক হাওড় এই সময়ে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে দিগন্তজোড়া নীলিমার সাথে মিতালি করার কথা, সেখানে আজ এক অদ্ভুত শূন্যতা। প্রকৃতির খামখেয়ালিপনায় এবার মেঘের আঁচল থেকে ঝরেনি পর্যাপ্ত বারিধারা। ফলে, রূপের ডালি সাজিয়ে বসা নিকলী হাওড় তার চিরচেনা রূপ হারাতে বসেছে। আর হাওড়ের এই রুক্ষতার সাথে থমকে গেছে তার বুকে আশ্রিত হাজারো মানুষের জীবনের চাকা।
পর্যটনের ভরা মৌসুমে নিকলীতে এখন শুধুই নিঃশব্দ হাহাকার। থমকে গেছে জলনূপুর, অলস ঘাটে মাঝির দীর্ঘশ্বাস। বিগত বছরগুলোতে এই সময়ে নিকলীর বেড়িবাঁধ ও নৌঘাটগুলো মুখরিত থাকত হাজারো পর্যটকের কলকাকলিতে। ইঞ্জিনের ভটভট শব্দ, স্পিডবোটের জলকেলি আর তরঙ্গের নাচন হাওড়ের বাতাসকে উৎসবমুখর করে তুলত। অথচ এবারের চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো।
জলবায়ু পরিবর্তনের অমোঘ নিয়তিতে এবার আগাম পানি নেমে গেছে হাওড় থেকে। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের অভাবে বিস্তীর্ণ জলরাশির বুকে জেগে উঠেছে চড়া। ঘাটজুড়ে সারিবদ্ধ নৌকাগুলো আজ নিস্পন্দ, অলস পড়ে আছে। যে মাঝিরা জলের বুকে স্বপ্ন বুনতেন, তাদের দিন কাটছে এখন ঘাটে বসে শূন্য দৃষ্টিতে আকাশের দিকে চেয়ে।
কোড়া নৌকার মাঝি সৈয়দ আলী কিংবা ঘাটের মাঝি করিমুল্লার মতো হাজারো মানুষের গল্পটা এখন একই রকম করুণ। ধারদেনা আর ঋণের কিস্তি মাথায় নিয়ে তারা বুক বেঁধেছিলেন এই বর্ষার আশায়। কিন্তু সারাদিনে একটি ট্রিপও না পেয়ে শূন্য হাতে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে তাদের। মাঝিদের ক্ষোভ আর হাহাকারে নিকলীর বাতাস আজ ভারী।
নিকলী হাওড়কে কেন্দ্র করে গত কয়েক বছরে গড়ে উঠেছিল এক বিশাল অর্থনৈতিক বৃত্ত। ২০২০ সালে ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম অলওয়েদার সড়ক উদ্বোধনের পর এই অঞ্চলের পর্যটন অর্থনীতি লাভ করেছিল নতুন গতি। প্রায় ১০ হাজার নৌকার মাঝির পাশাপাশি হোটেল, রেস্তোরাঁ, কফি শপ, মুদি দোকানদার, ফটোগ্রাফার এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের সংসার চলত এই পর্যটকদের ঘিরে। কিন্তু এবার জল সংকটের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে পর্যটকদের নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি এবং কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভাড়ার অনাকাঙ্ক্ষিত অভিযোগ। ফলে পর্যটকেরা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। ঘাটসংলগ্ন রেস্তোরাঁ ও কফি হাউসগুলো আজ ক্রেতাশূন্য। হোটেল কর্মচারী মুমিন কিংবা মুদি দোকানি ওসমানের কণ্ঠে ঝরে পড়ল ব্যবসা টিকিয়ে রাখার চরম আকুলতা। এভাবে চলতে থাকলে অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকেই ব্যবসা গুটিয়ে পথে বসতে হবে।
ঢাকা থেকে আগত মৌসুমী রায় বলেন,"অনেক দিন ধরেই নিকলী হাওড়ের বিস্তীর্ণ জলরাশির রূপ দেখার ইচ্ছে ছিল। জায়গাটা সুন্দর, কিন্তু পানি কম থাকায় হাওড়ের সেই আদিম, অতলান্ত রূপটা পুরোপুরি উপভোগ করতে পারলাম না।"
সবুজ প্রকৃতি আর আকাশ-পানির মিতালি দেখতে এখনও কিছু মানুষ ছুটে আসছেন দূর-দূরান্ত থেকে। মুন্সীগঞ্জ থেকে আসা মোহাম্মদ বেলাল হোসেন ও কামরুল হাসানরা জানালেন তাদের মুগ্ধতার কথা। তবে একই সাথে তারা রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রক্ষা এবং প্রশাসনের কঠোর নজরদারির মাধ্যমে অতিরিক্ত ভাড়া ও খাবারের দাম নিয়ন্ত্রণের দাবি জানান। স্থানীয় বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেনের মতেও, মুষ্টিমেয় অসাধু ব্যবসায়ীর লোভের কারণে যেন এই অপরূপ পর্যটন কেন্দ্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন না হয়, সেদিকে প্রশাসনের নজর দেওয়া জরুরি।
হাওড়ের এই দুঃসময়ে পর্যটকদের মনে আস্থা ফেরাতে তৎপর রয়েছে প্রশাসন। নিকলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহবুবুর রহমান জানান," নতুন পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় নিকলী ও করিমগঞ্জ প্রবেশপথে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। নদীপথে টহল বৃদ্ধি ও নৌ-পুলিশের সহায়তায় পর্যটকদের নির্বিঘ্ন ভ্রমণ নিশ্চিত করা হচ্ছে। এছাড়া
পর্যটকদের পোশাক পরিবর্তন ও সহায়তার জন্য একটি বিশেষ 'কমান্ড ও কন্ট্রোল সেন্টার' স্থাপনের পরিকল্পনা চলছে "।
অন্যদিকে, নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শহীদউল্লাহ জানান, হাওড়ে পর্যাপ্ত পানি আসার সাথে সাথেই অংশীজনদের সাথে বসে নৌকার ভাড়া সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। এছাড়া হাওড়সংলগ্ন সড়কগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার কাজও শুরু হয়েছে।
প্রকৃতির এই সাময়িক বিরহ কাটিয়ে নিকলী আবার তার চেনা ঐশ্বর্যে ফিরবে—এমনটাই প্রত্যাশা সবার। আকাশ ভেঙে যদি আবার নামে কাঙ্ক্ষিত শ্রাবণের ধারা, তবেই হয়তো ধুয়ে যাবে মাঝিদের চোখের জল। জলতরঙ্গে আবারও নেচে উঠবে নিকলীর বুক, মুখরিত হবে ঘাট, আর বেঁচে থাকবে হাজারো শ্রমজীবী মানুষের স্বপ্ন ও জীবিকা। রূপসী নিকলী আবার ফিরে পাক তার চিরচেনা রূপ, এটাই এখন প্রকৃতি ও মানুষের যৌথ প্রার্থনা।

আপনার মতামত লিখুন