ইফতেখার আহমেদ, সোনারগাঁও, নারায়ণগঞ্জ
ভারতীয় উপমহাদেশে বিশেষ করে আমাদের বাংলাদেশে বেশ প্রচলিত একটি কথা আছে- রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। সোনারগাঁয়ের সাম্প্রতিক একটি ঘটনা যেন তারই জীবন্ত উদাহরণ হয়ে সামনে এসেছে। নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন আওয়ামী লীগের সোনারগাঁও পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি হিসেবে পরিচিত আব্দুল মালেককে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন এবং তার পক্ষে প্রকাশ্যে সাফাই গাওয়ার ঘটনায় এলাকায় শুরু হয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ওই সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যেও নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে আব্দুল মালেকের বক্তব্য—তিনি নাকি জানতেন না যে তিনি আওয়ামী লীগের একজন ওয়ার্ড সভাপতি—নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক হাস্যরস ও সমালোচনা চলছে। অনেকেই বিষয়টিকে ‘অবিশ্বাস্য’ ও ‘হাস্যকর’ বলে মন্তব্য করেছেন। কেউ কেউ তাকে ‘বেইমান’ আখ্যা দিয়েও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
স্থানীয় অনলাইন পোর্টাল নিউজঅফসোনারগাঁও এর ফেসবুক পোস্টে আপলোডকৃত ভিডিও কমেন্ট বক্সে আনোয়ার হোসেন নামে একজন কমেন্ট করেছেন- “সোনারগাঁও বিএনপি নেতাকর্মী খুব অভাব। অন্য দল থেকে নেতা ভাগিয়ে না আনলে চলেই না”। মোঃ ইমাম হোসেন সৌরভ নামে একজন কমেন্ট করেছেন- মানুষ লক্ষ লক্ষ টাকা দিয়া ও সরকারি দল এর পদ পদবী পায় না, কাকায় অটো সভাপতি হইয়া যায়”।
এছাড়া ঐ পোস্টে ফরহাদ হাসান রাহাত নামের একজন “চু* ভাই” বলেও মন্তব্য করেছেন। তবে কে চু* ভাই? আওয়ামী লীগের নেতা আব্দুল মান্নান নাকি বিএনপি’র যেসকল নেতা-কর্মী তার পাশে ছিল তারা? সেই বিষয়টি সুস্পষ্ট উল্লেখ করেননি।
আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের একাধিক নেতাকর্মীর কাছেও তার এমন বক্তব্য বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে বলে জানা গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন মন্তব্যে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের পলাতক ও আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের কেউ কেউ আব্দুল মালেকের অবস্থানের কঠোর সমালোচনা করছেন। ফলে তার রাজনৈতিক অবস্থান ও সাম্প্রতিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
অন্যদিকে, বিএনপির স্থানীয় কিছু নেতাকর্মীর আব্দুল মালেকের পাশে অবস্থান নেওয়া বিষয়টিকে ঘিরেও তৈরি হয়েছে নতুন প্রশ্ন। রাজনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থানে থাকা দুই পক্ষের এমন ঘনিষ্ঠতা কী কারণে—তা নিয়ে এলাকায় চলছে নানা আলোচনা। অনেকে মনে করছেন, অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় স্থানীয় বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর সঙ্গে আব্দুল মালেকের ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক সম্পর্ক থাকতে পারে। এমনকি কেউ কেউ দাবি করছেন, সে সময় তিনি তাদের বিভিন্ন ঝামেলা বা মামলা-মোকদ্দমা থেকে সহযোগিতা করে থাকতে পারেন। তবে এসব দাবির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা যায়নি।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবে পরিচিত একজন ব্যক্তির অবস্থান পরিবর্তন কিংবা অন্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে প্রকাশ্য ঘনিষ্ঠতা স্বাভাবিকভাবেই জনমনে প্রশ্ন তৈরি করে। বিশেষ করে যে সময়ে রাজনৈতিক পরিচয়, অতীত ভূমিকা ও বর্তমান অবস্থান নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক চলছে, তখন এ ধরনের ঘটনা আরও বেশি তাৎপর্য বহন করে।
সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, রাজনৈতিক সুবিধা কিংবা স্থানীয় আধিপত্য ধরে রাখার স্বার্থে যদি নীতি-আদর্শ এভাবে পথভ্রষ্ট হয়ে যায়, তাহলে সাধারণ মানুষের কাছে রাজনীতির বিশ্বাসযোগ্যতা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? আবার বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশ যদি অতীত রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বিতর্কিত একজন আওয়ামী লীগ নেতার পক্ষে প্রকাশ্যে এভাবে অবস্থান নেয়, তাহলে তাদের নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান ও আদর্শ নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
আমাদের দেশের পেক্ষাপটে রাজনীতিতে ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং পারস্পরিক সহযোগিতা থাকতেই পারে। কিন্তু সেই সম্পর্ক যখন প্রকাশ্য রাজনৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, তখন তার ব্যাখ্যাও রাজনৈতিকভাবেই দিতে হয়। আব্দুল মালেকের বক্তব্য এবং তার পাশে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের অবস্থান—দুই ঘটনাকে ঘিরে সোনারগাঁয়ের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে।
আব্দুল মালেক ও বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের সাম্প্রতিক এই সমীকরণকে অনেকেই ‘রাজনীতিতে শেষ বলে কিছু নেই’—এই পুরোনো কথাটির নতুন বাস্তবায়ন হিসেবে দেখছেন। তবে এটি নিছক রাজনৈতিক সমঝোতা, পুরোনো সম্পর্কের প্রতিফলন, নাকি স্থানীয় প্রভাব-প্রতিপত্তি ধরে রাখার কৌশল—তার উত্তর সময়ই দেবে।








