অর্থনীতি

রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যাংক সংস্কার ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে জোর

রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যাংক সংস্কার ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে জোর

⎙ প্রিন্ট
রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যাংক সংস্কার ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে জোর
ছবি সংগৃহীত
রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যাংক সংস্কার ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে জোরআন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে নতুন করে বড় অঙ্কের ঋণ পেতে হলে অর্থনীতির কয়েকটি মৌলিক জায়গায় দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে বাংলাদেশকে। বিশেষ করে রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যাংক খাতের সংস্কার, ভর্তুকির চাপ কমানো এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফেরানোর বিষয়গুলো এবার গুরুত্ব পেতে পারে। নতুন ঋণ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশকে এসব ক্ষেত্রে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নিতে হবে।
সরকার আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আইএমএফের সঙ্গে ৪৫০ থেকে ৫০০ কোটি ডলারের নতুন ঋণচুক্তি চূড়ান্ত করার চেষ্টা করছে। এর পর আগামী বছরের শুরুতে ঋণের প্রথম কিস্তি পাওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। একই সঙ্গে চলমান ঋণ কর্মসূচির ষষ্ঠ কিস্তি ছাড়ের বিষয়টিও আলোচনায় থাকবে।
এ লক্ষ্যে আগামী ২৯ অক্টোবর ঢাকায় আসার কথা রয়েছে আইএমএফের একটি প্রতিনিধিদলের। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের উন্নয়ন সামষ্টিক অর্থনীতি বিভাগের প্রধান ক্রিস পাপাজিওর নেতৃত্বে দলটি প্রায় দুই সপ্তাহ বাংলাদেশে অবস্থান করবে। এ সময় বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বিদ্যুৎ বিভাগ এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন তারা।
রাজস্ব আয় বাড়ানোই বড় চ্যালেঞ্জ
নতুন ঋণ কর্মসূচির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হতে পারে সরকারের রাজস্ব আয়। সহজভাবে বললে, সরকারের আয় যত বাড়বে, উন্নয়ন ও জনসেবামূলক খাতে ব্যয় করার সক্ষমতাও তত বাড়বে। কিন্তু বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে কর আদায়ের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। অর্থনীতির আকারের তুলনায় সরকার যে পরিমাণ কর সংগ্রহ করে, তাকে কর-জিডিপি অনুপাত বলা হয়। বাংলাদেশের এই অনুপাত এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
রাজস্ব আয় কম থাকলে সরকারের ব্যয় চালাতে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ে। একই সঙ্গে বাজেট ঘাটতিও বাড়তে পারে। ফলে অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়। এ কারণে আইএমএফের আলোচনায় এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের অগ্রগতি, করের আওতা বাড়ানো এবং কর প্রশাসনের সংস্কার গুরুত্ব পেতে পারে।
বিশেষ করে করব্যবস্থাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও কার্যকর করার পাশাপাশি নতুন করদাতা শনাক্ত করা এবং কর ফাঁকি কমানোর বিষয়ে সরকারকে অগ্রগতি দেখাতে হতে পারে।
ব্যাংক খাতে সংস্কারে বাস্তব অগ্রগতি চায় আইএমএফ
নতুন ঋণের দ্বিতীয় বড় বিষয় হচ্ছে ব্যাংক খাত। দেশের ব্যাংকিং খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম, খেলাপি ঋণ, দুর্বল ব্যাংক, মূলধনের ঘাটতি এবং সুশাসনের ঘাটতি অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে।
ব্যাংক খাতকে অর্থনীতির রক্তসঞ্চালন ব্যবস্থা বলা হয়। ব্যাংকগুলো ভালোভাবে কাজ করলে ব্যবসা-বাণিজ্যে ঋণ প্রবাহ বাড়ে, বিনিয়োগ হয় এবং কর্মসংস্থান তৈরি হয়। বিপরীতে ব্যাংকের আর্থিক অবস্থা দুর্বল হলে নতুন বিনিয়োগে ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এতে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও ধীর হয়ে যায়।
জুলাইয়ে বাংলাদেশ সফর শেষে আইএমএফের পক্ষ থেকেও ব্যাংক খাতে চাপ অব্যাহত থাকার কথা বলা হয়েছিল। এ খাত পুনর্গঠনে একটি বিশ্বাসযোগ্য কৌশল প্রয়োজন বলেও তারা জানিয়েছিল।
তাই এবার শুধু সংস্কারের পরিকল্পনা বা নীতিগত ঘোষণা নয়, বাস্তবে কী পরিবর্তন এসেছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণ কমানো, মূলধন পরিস্থিতির উন্নতি এবং ব্যাংক পরিচালনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সরকারকে অগ্রগতি দেখাতে হতে পারে।
ভর্তুকির চাপ কমানোর কঠিন সিদ্ধান্ত
তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে ভর্তুকি। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ যাতে হঠাৎ বেড়ে না যায়, সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকার অনেক সময় বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি বা অন্যান্য খাতে ভর্তুকি দিয়ে থাকে। কিন্তু দীর্ঘদিন বেশি ভর্তুকি দিতে হলে সরকারের ব্যয়ের ওপর চাপ বাড়ে।
আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দামের ওঠানামা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের ব্যয়ের কারণে এই চাপ আরও বেড়েছে। সরকার এরই মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করেছে। এখন গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম এবং সংশ্লিষ্ট ভর্তুকির পরিমাণ যৌক্তিক পর্যায়ে আনার বিষয়টি আইএমএফের সঙ্গে আলোচনায় আসতে পারে।
তবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ নয়। কারণ ভর্তুকি কমাতে গিয়ে যদি বিদ্যুৎ, গ্যাস বা জ্বালানির দাম বাড়ে, তাহলে পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও দৈনন্দিন পণ্যের দামেও এর প্রভাব পড়তে পারে। ফলে সরকারকে অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা
চতুর্থ বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ওপর চাপ তৈরি করছে। এর সঙ্গে বিনিয়োগে ধীরগতি, বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে চাপ এবং তুলনামূলক কম প্রবৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। অর্থনীতির ভাষায় প্রবৃদ্ধি বলতে নির্দিষ্ট সময়ে একটি দেশের পণ্য ও সেবা উৎপাদন কতটা বেড়েছে, তা বোঝায়। প্রবৃদ্ধি কমে গেলে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মানুষের আয় বাড়ানোর সুযোগও কমে যায়।
এ অবস্থায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা এবং বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর জন্য কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নেও নজর
আইএমএফের পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকেও নতুন অর্থায়ন পাওয়ার চেষ্টা করছে সরকার। বাজেট সহায়তার পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা, খাদ্য ও সার আমদানি, ব্যাংক খাত পুনর্গঠন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় অর্থায়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদেশি ঋণ সাময়িকভাবে অর্থনীতির চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু ঋণের অর্থ দিয়ে অর্থনীতির মৌলিক দুর্বলতা স্থায়ীভাবে দূর করা সম্ভব নয়। এজন্য দেশের নিজস্ব রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যাংক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা, সরকারি ব্যয়ে দক্ষতা বাড়ানো এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করা জরুরি।
বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন এবং সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মুস্তাফিজুর রহমানও ঋণের সঠিক ব্যবহার এবং কাঠামোগত সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
সব মিলিয়ে আগামী ২৯ অক্টোবর থেকে শুরু হতে যাওয়া আইএমএফের পর্যালোচনা সফর বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। চলমান ঋণের ষষ্ঠ কিস্তি ছাড়ের পাশাপাশি নতুন ঋণ কর্মসূচির পথ কতটা সহজ হবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতির ওপর। 
নতুন ঋণ পাওয়া গেলে তা অর্থনীতির ওপর তাৎক্ষণিক চাপ কমাতে সহায়ক হবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হলে রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যাংক খাতকে কার্যকর করা এবং সরকারি ব্যয়ে শৃঙ্খলা আনার বিকল্প নেই।

সম্পর্কিত সংবাদ