একসময় দুর্গাপূজা এলেই পানাম নগরের বাতাসে ভেসে বেড়াত ঢাকের শব্দ আর ধূপের গন্ধ। আজ সেই নগরের শতবর্ষী "শ্রীশ্রী সার্বজনীন দুর্গা মন্দির" প্রায় ভক্তশূন্য। সরেজমিনে দেখা গেছে, উৎসবের আমেজ নেই, নেই আগের সেই জাঁকজমক। ২০০৩ সালে সরকার পানাম নগরকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে গেজেটভুক্ত করে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে নেওয়ার পর থেকে এক সময়ের জনবহুল এই জনপদ প্রায় "ভুতুড়ে নগরে" পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
সোনারগাঁও পৌরসভার সবচেয়ে প্রাচীন মন্দিরগুলোর একটি এই দুর্গা মন্দির। নথি অনুযায়ী, পানাম নগরের মূল সড়কের উত্তর পাশে ৩১টি এবং দক্ষিণ পাশে ২১টি অর্থাৎ মোট ৫২টি ভবন এখনো টিকে আছে। তবে একসময় এখানে আরও বেশ কিছু ভবন ছিল, যার অনেকগুলোই কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। এই নগরে হিন্দু ও মুসলমান উভয় ধর্মের মানুষই বসবাস করতেন, তবে তুলনামূলকভাবে হিন্দু জনগোষ্ঠীর সংখ্যাই ছিল বেশি। তাই পূজার সময় গোটা এলাকা উৎসবমুখর হয়ে উঠত।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সংস্কার ও সংরক্ষণের কারণ দেখিয়ে বাসিন্দাদের উচ্ছেদ করার পর হিন্দুদের একটি বড় অংশ এলাকা ছেড়ে চলে যান। ফলে মন্দিরের নিয়মিত ভক্তসংখ্যা কমে গেছে, কমেছে পূজার আয়োজনের পরিধিও।
জনসাধারণের অবাধ যাতায়াত না থাকায় স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে পানাম নগরের নিত্যদিনের সংযোগও ক্ষীণ হয়ে এসেছে। অনেকে যেন এই ঐতিহাসিক নগরকে ভুলতেই বসেছেন।
শনিবার মহাসপ্তমীর দিনে মন্দিরে গিয়ে দেখা যায়, ভক্তদের উপস্থিতি অত্যন্ত সামান্য। মন্দির-সংশ্লিষ্ট একজন দাবি করেন, অষ্টমী ও নবমীতে ভক্ত ও স্থানীয় মানুষের উপস্থিতি বাড়বে। তবে সরেজমিনে এই দাবির সত্যতা পাওয়া যায়নি কারণ কাছেই আমিনপুর মাঠে মঠের পাশে আয়োজিত পূজামণ্ডপে ছিল ভক্তদের উল্লেখযোগ্য সমাগম। অর্থাৎ ভক্তদের আগ্রহ কমেনি, বরং তাঁরা অন্যত্র সরে গেছেন।
স্থানীয়দের মতে, লোকসমাগম কম হওয়ার প্রধান কারণ হলো এটি একটি সংরক্ষিত এলাকা। পুরাকীর্তি রক্ষায় এখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সার্বক্ষণিক কড়া পাহারা থাকে। ফলে সাধারণ ভক্তরা, বিশেষ করে পরিবার ও নারী-শিশুরা, সেখানে যেতে স্বস্তি বোধ করেন না। উৎসবের স্বতঃস্ফূর্ততা এমন পরিবেশে টিকে থাকা কঠিন।
সনাতন ধর্মের সুধীর নামের একজন স্থানীয় বাসিন্দার দাবি, সোনারগাঁওয়ের পূজা উদযাপন কমিটি ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে যদি এই ঐতিহাসিক মন্দির নিয়ে পুজার অন্তত একসপ্তাহ আগে থেকে প্রচার-প্রচারণা চালাত, তবে দূর-দূরান্ত থেকেও আরও অনেক ভক্ত আসতেন।
দৈনিক দেশবার্তা পত্রিকার সোনারগাঁও প্রতিনিধি ও ‘আজকের সোনারগাঁও’ নিউজ পোর্টালের বার্তা সম্পাদক এরশাদ হুসাইন অন্য বলেন, “পূজার দিনগুলোতে পানাম নগরের প্রতিটি প্রবেশদ্বারে ‘সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত’ কথাটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলে স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য সুবিধা হতো। কারণ, পানাম নগরে প্রবেশ করতে টিকিট লাগে—এমন ধারণা স্থানীয় মানুষের মধ্যে প্রচলিত রয়েছে। তাই পূজার দিনগুলোতে প্রবেশ উন্মুক্ত রাখার বিষয়টি আগেই যথাযথ প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে জানানো প্রয়োজন ছিল। এতে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে বিভ্রান্তি দূর হতো এবং তারা সহজেই পানাম নগরে অবস্থিত পুরনো এই দূর্গা মন্দিরে যাওয়া-আসার সুযোগ পেতেন।”
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবি অ্যাডভোকেট সবুর প্রধান বলেন, পুরাকীর্তি রক্ষা জরুরি হলেও তা যেন জীবন্ত সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিয়ে না হয়। বিশ্বের বহু দেশে ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণের পাশাপাশি সেখানে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চালু রাখার ব্যবস্থা থাকে। নিরাপত্তা ও সংরক্ষণের নিয়ম বজায় রেখেও উৎসবের সময় দর্শনার্থী ও ভক্তদের জন্য সহজ প্রবেশাধিকার দেওয়া সম্ভব।
পানাম নগর বাংলার সমৃদ্ধ নগরসভ্যতার স্মারক। কিন্তু ইট-পাথরের স্থাপত্য রক্ষা করতে গিয়ে যদি সেখানকার মানুষ, বিশ্বাস ও উৎসবের প্রাণস্পন্দন হারিয়ে যায়, তবে সংরক্ষণ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। শতবর্ষী এই দুর্গা মন্দিরের এই ভক্তশূণ্য উৎসব তাই শুধু একটি মন্দিরের গল্প নয়; এটি ঐতিহ্য সংরক্ষণের ধরন নিয়ে নীতিনির্ধারকদের নতুন করে ভাবার বিষয়।








