১৯৮৪ সালের ৩১শে মে দিবাগত রাত আনুমানিক ৪টা থেকে পরদিন সকাল ৮টা ৩০মিনিট পর্যন্ত বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত হয়েছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম এক জেনোসাইড। মাত্র চার ঘণ্টার মধ্যে রাঙ্গামাটি জেলার বরকল উপজেলার ভূষণছড়া ও তার পাশ্ববর্তী এলাকার নারী-শিশুসহ সাড়ে চারশর বেশি নিরীহ বাঙালিকে নৃশংসভাবে হত্যা করা করেছিল শান্তিবাহিনী(পিসিজেএসএস)। গণহত্যার খবর প্রচারিত হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি অশান্ত হয়ে উঠতে পারে এমন আশঙ্কা থেকে তৎকালীন সরকার (হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ) গণহত্যার সংবাদ প্রচারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।
রাঙামাটি জেলার বরকল উপজেলার ভূষণছড়া ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার বাঙালিরা এই নির্মম গণহত্যার শিকার হন। এই ঘটনায় মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে চার শতাধিক মানুষকে হত্যা করা হয় এবং আহত করা হয় আরও সহস্রাধিক মানুষ। একটি জনপদ পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। সত্তরের দশকের শেষদিকে, জনসংখ্যার সুষম বণ্টন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ সরকার দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দরিদ্র ও ভূমিহীন মানুষদের চট্টগ্রামের সরকারি খাস জমিতে পুনর্বাসন করে। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) এবং এর সশস্ত্র সামরিক শাখা শান্তিবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের পুনর্বাসন মেনে নেয়নি। এর ফলস্বরূপই এই নৃশংসতা ঘটে।
কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী ভূষণছড়া তিন দিকে পাহাড়ঘেরা। এই ভৌগোলিক কারণেই গণহত্যার জন্য সেদিন শান্তিবাহিনী সন্ত্রাসীরা ভূষণছড়াকে বেছে নিয়েছিল বলে মনে করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। মনিস্বপন দেওয়ানের নেতৃত্বে শান্তিবাহিনীর(জেএসএস) একদল নারী-পুরুষ মিলে গভীর রাতে এই হত্যাকাণ্ড চালায়।
পার্বত্য বাঙালিদের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ হলো, গণহত্যার মাস্টারমাইন্ড মনিস্বপন দেওয়ান ও সন্ত লারমাদের বিচার আজও হয়নি। গণহত্যার শিকার হওয়া পরিবারগুলো নিরাপত্তার খাতিরে আজও ‘গুচ্ছগ্রামে’ (Cluster Villages) বসবাস করছে। তাদের স্বজন হারানোর বিচার না হওয়া এবং মৌলিক অধিকারের অভাব তাদের ক্ষোভকে আরও উসকে দিয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, যারা এই গণহত্যার পরিকল্পনা বা নির্দেশ দিয়েছিলেন, তারা আইনি প্রক্রিয়ার ঊর্ধ্বে থেকে গেছেন। মনিস্বপন দেওয়ান পরবর্তীকালে মন্ত্রীও হয়েছিলেন, যা নিহতদের স্বজনদের জন্য আরোও হতাশা ও বেদনাদায়ক ছিলো। অনেক সংবাদকর্মী তখন জানিয়েছিলেন, কাপ্তাই লেকের পানিতে বহু লাশ ভাসতে দেখা গিয়েছিল। মা তার সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরা অবস্থায় গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে পড়ে আছেন এমন দৃশ্য তখন সাধারণ মানুষকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।
আবুল হাশেম নামের এক ভূষণছড়ার একজন বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি বলেন, "সে রাতে আমার চোখের সামনে আমার বাবা আর ছোট ভাইকে কুপিয়ে মারা হলো। আমি ধানক্ষেতে লুকিয়ে ছিলাম। ভোরের আলো ফুটলে যখন ফিরে এলাম, দেখলাম পুরো গ্রাম শ্মশান হয়ে গেছে। কোনো বাড়ি আস্ত নেই। আজ ৪০ বছর হয়ে গেল, সরকার বদলায় কিন্তু আমাদের বিচার কেউ করে না। যারা আমাদের মারলো, তারা এখন পাহাড়ে বড় বড় নেতা।" মরিয়ম, বয়স ৬৫, তিনি নামের নানিয়ারচরের বিধবা নারী। তিনি জানান "আমার স্বামীকে বাজার থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরদিন তার ক্ষতবিক্ষত লাশ পাওয়া যায়। আমার সন্তানদের নিয়ে আমি গুচ্ছগ্রামে বড় করেছি। আমাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। খুনিরা এখন মন্ত্রী-এমপি হয়ে ঘুরে বেড়ায়, আর আমরা বিচারের আশায় পথ চেয়ে থাকি।"পার্বত্য চট্টগ্রামে সবচেয়ে বড় গণহত্যা বলে অভিহিত করা হয় এই হত্যাকান্ডকে। এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল- এর সংগৃহীত তালিকা অনুযায়ী এই হামলায় শিশুসহ সর্বমোট ৬৭ জন উপজাতীয় নিহত হয়েছিল। (এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ১৯৮৬, পৃষ্ঠা-১৩-১৯)।
উপজাতীয়দের মৃতের সংখ্যা নিয়ে যে বিতর্কই থাকুক না কেন, বর্তমান কালের পাহাড়ি তরুণ এবং শিক্ষিত প্রজন্মের কাছে ৩১ মে'র দিনটি একটি ভয়াবহ দিন হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই বাঙালিদের প্রতি ঘৃণা আর বিদ্বেষ নিয়েই এই প্রজন্ম বড় হতে থাকবে। কারণ, আপাতদৃষ্টিতে যাবতীয় তথ্য-প্রমাণ, যার সবচেয়ে বড় উৎস সোশ্যাল মিডিয়া, এই দিনের বিষয়ে বাঙালি কর্তৃক পাহাড়িদের উপর অত্যাচারের সাক্ষ্যই বহন করছে। যা সম্পূর্ণ বানোয়াট তথ্যাদি।
অপ্রয়োজনীয় তর্ক এড়ানোর জন্যে মাত্র দুটি সূত্র উল্লেখ করছি। দুজন ব্যক্তির দুটি বই, যেখানে ভূষণছড়ার গণহত্যার বিবরণ পাওয়া যায়। প্রথমজন হলেন, সৈয়দ মুরতজা আলী যার সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি হয় ১৯৬৯ সালে পাকিস্তানের করাচী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনাকালীন সময়ে সেখানকার স্থানীয় পত্রিকা 'ডন'-এ যোগদানের মাধ্যমে। বাংলাদেশ অবজারভার-এর সাথে কাজ করার সময় একজন জেলের ছদ্মবেশে তিনি ভূষণছড়ায় গিয়েছিলেন ১৯৮৪ সালের ৩ জুন। ভূষণছড়ার গণহত্যা পরবর্তী তিনিই ছিলেন প্রথম সাংবাদিক যিনি ঐ স্থানে গিয়েছিলেন। তবে যেতে পেরেছিলেন, ঘটনার তিন দিন পরে।
১৯৯৬ সালে প্রকাশিত 'দি হিচ ইন দি হিলস' বইয়ে সৈয়দ মুরতজা আলী তার সেই অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন। যেহেতু সরকারি কর্তৃপক্ষ ভূষণছড়ার গণহত্যার ঘটনাটি সংবাদ মাধ্যমে প্রচার করতে চাচ্ছিলেন না, তাই কোনো সাংবাদিক ঐখানে যেতে পারছিলেন না।
কাগজ, কলম, মিনি রেকর্ডার আর কিছু ব্যক্তিগত জিনিসপত্র পলিথিনে পেঁচিয়ে নৌকার পাটাতনের তলায় লুকিয়ে, তিনি জেলের ছদ্মবেশে ময়লা গেঞ্জি আর ছেঁড়া লুঙ্গি পরে গিয়েছিলেন। কাপ্তাই লেকের জায়গায় জায়গায় নিরাপত্তা বাহিনীর চেকপোস্ট ফাঁকি দিয়ে যাওয়ার আর কোনো উপায় ছিলো না। তিনি যেদিন পৌঁছেছিলেন, সেদিন সেখানে তিনটি হেলিকপ্টার এসেছিল। যার একটাতে ছিলেন, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এইচএম এরশাদ। ঘটনার তিনদিন পরে গিয়েও তিনি অনেক মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেছেন। এগুলো পড়েছিল, কারণ এগুলোর দাফনকার্যের জন্যে কোনো নিকটজনকে পাওয়া যাচ্ছিল না।
আব্দুল করিম নামের ৬৮ বছর বয়স্ক এক ব্যক্তির উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি জানিয়েছেন যে, সেহেরী খেয়ে লোকজন তখনো একটু ঘুমের জন্য বিছানায়, এমন সময় হঠাৎ গুলির শব্দ চারপাশের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে খান খান করে দেয়। কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই শান্তিবাহিনীর গুলি আর যুদ্ধের হুংকার শুনতে পেল তারা। শান্তিবাহিনীর(জেএসএস) গুলি বিদীর্ণ করে দেয় ভয়ে কম্পমান এমনকি পলায়নরত বাঙালিদেরকেও। অনেক বাঙালিকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে, আবার অনেকের মস্তক বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। এমনকি, শিশুদেরকে হত্যার জন্যে টুকরো পর্যন্ত করা হয়।
বীভৎস আর লোমহর্ষক কিছু দৃশ্যের বর্ণনার পাশাপাশি তিনি জানিয়েছেন যে, ৩৪ জন নারী, ২৬ জন শিশুসহ ঐ ঘটনায় ৩১৫ জনকে হত্যা করা হয়, আহত হয়েছিল প্রায় ৬০০ জনের মতো। তখন পর্যন্ত ৩৫ জন নিখোঁজ
"ভূষণছড়া গণহত্যা পরিদর্শনে প্রেসিডেন্ট এরশাদ স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন। কয়েক দিন যাবৎ একটানা গণকবর রচনার প্রক্রিয়া চলেছে। জীবিত বাঙালিদের আহার, নিদ্রা ও বিশ্রামের ফুরসত ছিলো না। গর্তে গর্তে গণকবর রচনা করে, একেক সাথে ৩০/৪০টি লাশকে চাপা দেয়া হয়েছে। এভাবে লোকালয়গুলো পচা লাশ ও দুর্গন্ধ থেকে মুক্ত হলেও, পাহাড়ে ও বনে অবস্থিত বিক্ষিপ্ত লাশগুলো দাফন-কাফনহীন অবস্থায় পঁচতে থাকে ও শিয়াল কুকুরের খাদ্য হয়। দুর্গত পরিবারগুলো পোড়াভিটায় খাদ্য ও আচ্ছাদনহীন দিন যাপনে বাধ্য হয়।"
ঘটনার একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর সূত্রমতে, মোট ৩৭০ জন নিহত ব্যক্তির তালিকা উক্ত বইয়ে সন্নিবেশিত করেছেন। গুরুতর আহত ৮৫ জনকে চিকিৎসার জন্যে চট্টগ্রামের সিএমএইচে পাঠানো হয়েছিল। অর্থ্যাৎ পাহাড়ি ৬৫ জন ও বাঙালি ২৪৫ জন সহ সন্ত লারমা গ্রুপ জেএসএস এর এই গণহত্যায় সর্বমোট ৪০০ জন নিহত হয়েছে।
পাহাড়ের এই তরুণ উপজাতি সমাজ হয়ত কোনোদিনও জানতে পারবে না যে, তাকে জন্মের পর হতেই ব্রেইনওয়াশ করা হয়েছে, প্রকৃত সত্য আড়াল করে বা ঘটনার একপেশে বিবরণে কিংবা আংশিক বা পুরোপুরি মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে। তাই, অজ্ঞাতসারেই তাদের বাংলাদেশ বিরোধী মনোভাব গড়ে উঠছে এবং তাদের একাংশ ক্রমেই বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী মনোভাব পোষণ ও কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে দ্বিধাবোধ করছে না। অন্যদিকে, দেশ ও সমাজের বেশির ভাগ মানুষের অগোচরেই পাহাড়ের তরুণ প্রজন্মের মনে আজ জাতীয় চেতনা, জাতীয়তাবোধ, দেশপ্রেমবিরোধী ও বাঙালি বিদ্বেষের বীজ রোপণ করা হচ্ছে দীর্ঘদিনের ধারাবাহিকতায় অত্যন্ত সুচতুরতার সাথে, কৌশলে।
এ কারণেই, পাহাড়িদের আপন করে নেয়ার অভিপ্রায়ে দেশের সাধারণ মানুষের উদারতা আর তাদের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্যে সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টার পরেও কিছু কিছু পাহাড়ির দেশ ও সমাজবিরোধী কার্যকলাপ দেখে অনেকে হতাশ হয়ে ভাবে- মানুষ এত অকৃতজ্ঞ কী করে হতে পারে!
নোট- শান্তিবাহিনী..পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সংগঠন। এটি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(জেএসএস) এর স*শস্ত্র গ্রুপ। বর্তমান লিডার সন্ত লারমা। প্রতিষ্ঠাতা এম এন লারমা।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩১ মে ২০২৬
১৯৮৪ সালের ৩১শে মে দিবাগত রাত আনুমানিক ৪টা থেকে পরদিন সকাল ৮টা ৩০মিনিট পর্যন্ত বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত হয়েছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম এক জেনোসাইড। মাত্র চার ঘণ্টার মধ্যে রাঙ্গামাটি জেলার বরকল উপজেলার ভূষণছড়া ও তার পাশ্ববর্তী এলাকার নারী-শিশুসহ সাড়ে চারশর বেশি নিরীহ বাঙালিকে নৃশংসভাবে হত্যা করা করেছিল শান্তিবাহিনী(পিসিজেএসএস)। গণহত্যার খবর প্রচারিত হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি অশান্ত হয়ে উঠতে পারে এমন আশঙ্কা থেকে তৎকালীন সরকার (হোসাইন মোহাম্মদ এরশাদ) গণহত্যার সংবাদ প্রচারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।
রাঙামাটি জেলার বরকল উপজেলার ভূষণছড়া ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার বাঙালিরা এই নির্মম গণহত্যার শিকার হন। এই ঘটনায় মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে চার শতাধিক মানুষকে হত্যা করা হয় এবং আহত করা হয় আরও সহস্রাধিক মানুষ। একটি জনপদ পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। সত্তরের দশকের শেষদিকে, জনসংখ্যার সুষম বণ্টন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ সরকার দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে দরিদ্র ও ভূমিহীন মানুষদের চট্টগ্রামের সরকারি খাস জমিতে পুনর্বাসন করে। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) এবং এর সশস্ত্র সামরিক শাখা শান্তিবাহিনী পার্বত্য চট্টগ্রামে বাঙালিদের পুনর্বাসন মেনে নেয়নি। এর ফলস্বরূপই এই নৃশংসতা ঘটে।
কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী ভূষণছড়া তিন দিকে পাহাড়ঘেরা। এই ভৌগোলিক কারণেই গণহত্যার জন্য সেদিন শান্তিবাহিনী সন্ত্রাসীরা ভূষণছড়াকে বেছে নিয়েছিল বলে মনে করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। মনিস্বপন দেওয়ানের নেতৃত্বে শান্তিবাহিনীর(জেএসএস) একদল নারী-পুরুষ মিলে গভীর রাতে এই হত্যাকাণ্ড চালায়।
পার্বত্য বাঙালিদের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ হলো, গণহত্যার মাস্টারমাইন্ড মনিস্বপন দেওয়ান ও সন্ত লারমাদের বিচার আজও হয়নি। গণহত্যার শিকার হওয়া পরিবারগুলো নিরাপত্তার খাতিরে আজও ‘গুচ্ছগ্রামে’ (Cluster Villages) বসবাস করছে। তাদের স্বজন হারানোর বিচার না হওয়া এবং মৌলিক অধিকারের অভাব তাদের ক্ষোভকে আরও উসকে দিয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, যারা এই গণহত্যার পরিকল্পনা বা নির্দেশ দিয়েছিলেন, তারা আইনি প্রক্রিয়ার ঊর্ধ্বে থেকে গেছেন। মনিস্বপন দেওয়ান পরবর্তীকালে মন্ত্রীও হয়েছিলেন, যা নিহতদের স্বজনদের জন্য আরোও হতাশা ও বেদনাদায়ক ছিলো। অনেক সংবাদকর্মী তখন জানিয়েছিলেন, কাপ্তাই লেকের পানিতে বহু লাশ ভাসতে দেখা গিয়েছিল। মা তার সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরা অবস্থায় গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে পড়ে আছেন এমন দৃশ্য তখন সাধারণ মানুষকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।
আবুল হাশেম নামের এক ভূষণছড়ার একজন বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি বলেন, "সে রাতে আমার চোখের সামনে আমার বাবা আর ছোট ভাইকে কুপিয়ে মারা হলো। আমি ধানক্ষেতে লুকিয়ে ছিলাম। ভোরের আলো ফুটলে যখন ফিরে এলাম, দেখলাম পুরো গ্রাম শ্মশান হয়ে গেছে। কোনো বাড়ি আস্ত নেই। আজ ৪০ বছর হয়ে গেল, সরকার বদলায় কিন্তু আমাদের বিচার কেউ করে না। যারা আমাদের মারলো, তারা এখন পাহাড়ে বড় বড় নেতা।" মরিয়ম, বয়স ৬৫, তিনি নামের নানিয়ারচরের বিধবা নারী। তিনি জানান "আমার স্বামীকে বাজার থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পরদিন তার ক্ষতবিক্ষত লাশ পাওয়া যায়। আমার সন্তানদের নিয়ে আমি গুচ্ছগ্রামে বড় করেছি। আমাদের কোনো ভবিষ্যৎ নেই। খুনিরা এখন মন্ত্রী-এমপি হয়ে ঘুরে বেড়ায়, আর আমরা বিচারের আশায় পথ চেয়ে থাকি।"পার্বত্য চট্টগ্রামে সবচেয়ে বড় গণহত্যা বলে অভিহিত করা হয় এই হত্যাকান্ডকে। এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল- এর সংগৃহীত তালিকা অনুযায়ী এই হামলায় শিশুসহ সর্বমোট ৬৭ জন উপজাতীয় নিহত হয়েছিল। (এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ১৯৮৬, পৃষ্ঠা-১৩-১৯)।
উপজাতীয়দের মৃতের সংখ্যা নিয়ে যে বিতর্কই থাকুক না কেন, বর্তমান কালের পাহাড়ি তরুণ এবং শিক্ষিত প্রজন্মের কাছে ৩১ মে'র দিনটি একটি ভয়াবহ দিন হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই বাঙালিদের প্রতি ঘৃণা আর বিদ্বেষ নিয়েই এই প্রজন্ম বড় হতে থাকবে। কারণ, আপাতদৃষ্টিতে যাবতীয় তথ্য-প্রমাণ, যার সবচেয়ে বড় উৎস সোশ্যাল মিডিয়া, এই দিনের বিষয়ে বাঙালি কর্তৃক পাহাড়িদের উপর অত্যাচারের সাক্ষ্যই বহন করছে। যা সম্পূর্ণ বানোয়াট তথ্যাদি।
অপ্রয়োজনীয় তর্ক এড়ানোর জন্যে মাত্র দুটি সূত্র উল্লেখ করছি। দুজন ব্যক্তির দুটি বই, যেখানে ভূষণছড়ার গণহত্যার বিবরণ পাওয়া যায়। প্রথমজন হলেন, সৈয়দ মুরতজা আলী যার সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি হয় ১৯৬৯ সালে পাকিস্তানের করাচী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনাকালীন সময়ে সেখানকার স্থানীয় পত্রিকা 'ডন'-এ যোগদানের মাধ্যমে। বাংলাদেশ অবজারভার-এর সাথে কাজ করার সময় একজন জেলের ছদ্মবেশে তিনি ভূষণছড়ায় গিয়েছিলেন ১৯৮৪ সালের ৩ জুন। ভূষণছড়ার গণহত্যা পরবর্তী তিনিই ছিলেন প্রথম সাংবাদিক যিনি ঐ স্থানে গিয়েছিলেন। তবে যেতে পেরেছিলেন, ঘটনার তিন দিন পরে।
১৯৯৬ সালে প্রকাশিত 'দি হিচ ইন দি হিলস' বইয়ে সৈয়দ মুরতজা আলী তার সেই অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন। যেহেতু সরকারি কর্তৃপক্ষ ভূষণছড়ার গণহত্যার ঘটনাটি সংবাদ মাধ্যমে প্রচার করতে চাচ্ছিলেন না, তাই কোনো সাংবাদিক ঐখানে যেতে পারছিলেন না।
কাগজ, কলম, মিনি রেকর্ডার আর কিছু ব্যক্তিগত জিনিসপত্র পলিথিনে পেঁচিয়ে নৌকার পাটাতনের তলায় লুকিয়ে, তিনি জেলের ছদ্মবেশে ময়লা গেঞ্জি আর ছেঁড়া লুঙ্গি পরে গিয়েছিলেন। কাপ্তাই লেকের জায়গায় জায়গায় নিরাপত্তা বাহিনীর চেকপোস্ট ফাঁকি দিয়ে যাওয়ার আর কোনো উপায় ছিলো না। তিনি যেদিন পৌঁছেছিলেন, সেদিন সেখানে তিনটি হেলিকপ্টার এসেছিল। যার একটাতে ছিলেন, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এইচএম এরশাদ। ঘটনার তিনদিন পরে গিয়েও তিনি অনেক মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখেছেন। এগুলো পড়েছিল, কারণ এগুলোর দাফনকার্যের জন্যে কোনো নিকটজনকে পাওয়া যাচ্ছিল না।
আব্দুল করিম নামের ৬৮ বছর বয়স্ক এক ব্যক্তির উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি জানিয়েছেন যে, সেহেরী খেয়ে লোকজন তখনো একটু ঘুমের জন্য বিছানায়, এমন সময় হঠাৎ গুলির শব্দ চারপাশের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে খান খান করে দেয়। কেউ কিছু বুঝে উঠার আগেই শান্তিবাহিনীর গুলি আর যুদ্ধের হুংকার শুনতে পেল তারা। শান্তিবাহিনীর(জেএসএস) গুলি বিদীর্ণ করে দেয় ভয়ে কম্পমান এমনকি পলায়নরত বাঙালিদেরকেও। অনেক বাঙালিকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে, আবার অনেকের মস্তক বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়। এমনকি, শিশুদেরকে হত্যার জন্যে টুকরো পর্যন্ত করা হয়।
বীভৎস আর লোমহর্ষক কিছু দৃশ্যের বর্ণনার পাশাপাশি তিনি জানিয়েছেন যে, ৩৪ জন নারী, ২৬ জন শিশুসহ ঐ ঘটনায় ৩১৫ জনকে হত্যা করা হয়, আহত হয়েছিল প্রায় ৬০০ জনের মতো। তখন পর্যন্ত ৩৫ জন নিখোঁজ
"ভূষণছড়া গণহত্যা পরিদর্শনে প্রেসিডেন্ট এরশাদ স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন। কয়েক দিন যাবৎ একটানা গণকবর রচনার প্রক্রিয়া চলেছে। জীবিত বাঙালিদের আহার, নিদ্রা ও বিশ্রামের ফুরসত ছিলো না। গর্তে গর্তে গণকবর রচনা করে, একেক সাথে ৩০/৪০টি লাশকে চাপা দেয়া হয়েছে। এভাবে লোকালয়গুলো পচা লাশ ও দুর্গন্ধ থেকে মুক্ত হলেও, পাহাড়ে ও বনে অবস্থিত বিক্ষিপ্ত লাশগুলো দাফন-কাফনহীন অবস্থায় পঁচতে থাকে ও শিয়াল কুকুরের খাদ্য হয়। দুর্গত পরিবারগুলো পোড়াভিটায় খাদ্য ও আচ্ছাদনহীন দিন যাপনে বাধ্য হয়।"
ঘটনার একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর সূত্রমতে, মোট ৩৭০ জন নিহত ব্যক্তির তালিকা উক্ত বইয়ে সন্নিবেশিত করেছেন। গুরুতর আহত ৮৫ জনকে চিকিৎসার জন্যে চট্টগ্রামের সিএমএইচে পাঠানো হয়েছিল। অর্থ্যাৎ পাহাড়ি ৬৫ জন ও বাঙালি ২৪৫ জন সহ সন্ত লারমা গ্রুপ জেএসএস এর এই গণহত্যায় সর্বমোট ৪০০ জন নিহত হয়েছে।
পাহাড়ের এই তরুণ উপজাতি সমাজ হয়ত কোনোদিনও জানতে পারবে না যে, তাকে জন্মের পর হতেই ব্রেইনওয়াশ করা হয়েছে, প্রকৃত সত্য আড়াল করে বা ঘটনার একপেশে বিবরণে কিংবা আংশিক বা পুরোপুরি মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে। তাই, অজ্ঞাতসারেই তাদের বাংলাদেশ বিরোধী মনোভাব গড়ে উঠছে এবং তাদের একাংশ ক্রমেই বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী মনোভাব পোষণ ও কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে দ্বিধাবোধ করছে না। অন্যদিকে, দেশ ও সমাজের বেশির ভাগ মানুষের অগোচরেই পাহাড়ের তরুণ প্রজন্মের মনে আজ জাতীয় চেতনা, জাতীয়তাবোধ, দেশপ্রেমবিরোধী ও বাঙালি বিদ্বেষের বীজ রোপণ করা হচ্ছে দীর্ঘদিনের ধারাবাহিকতায় অত্যন্ত সুচতুরতার সাথে, কৌশলে।
এ কারণেই, পাহাড়িদের আপন করে নেয়ার অভিপ্রায়ে দেশের সাধারণ মানুষের উদারতা আর তাদের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্যে সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টার পরেও কিছু কিছু পাহাড়ির দেশ ও সমাজবিরোধী কার্যকলাপ দেখে অনেকে হতাশ হয়ে ভাবে- মানুষ এত অকৃতজ্ঞ কী করে হতে পারে!
নোট- শান্তিবাহিনী..পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র সংগঠন। এটি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি(জেএসএস) এর স*শস্ত্র গ্রুপ। বর্তমান লিডার সন্ত লারমা। প্রতিষ্ঠাতা এম এন লারমা।

আপনার মতামত লিখুন