ঢাকা    বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

পাঁচ মাস ধরে কাজ বন্ধ, মেঘনার বুকে আটকে কয়েক লাখ মানুষের ভাগ্যোন্নয়ন

হাওরবাসীর স্বপ্নের সেতু এখন শুধুই পিলার, ৪০% কাজেই উধাও ঠিকাদার


সৈয়দ মইনুল হোসেন, কিশোরগঞ্জ
সৈয়দ মইনুল হোসেন, কিশোরগঞ্জ
প্রকাশ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

হাওরবাসীর স্বপ্নের সেতু এখন শুধুই পিলার, ৪০% কাজেই উধাও ঠিকাদার

মেঘনা নদীর বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা নিঃসঙ্গ কয়েকটা কংক্রিটের পিলার—বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে কোনো ধ্বংসাবশেষ। অথচ এই পিলারগুলোই হওয়ার কথা ছিল কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দূরবর্তী হাওরাঞ্চলের ভাগ্য বদলের সেতুবন্ধ। ১৭৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘বাঙালপাড়া-চাতলপাড় সেতু’র কাজ ৪০ শতাংশ পেরোতেই থমকে গেছে। গত পাঁচ মাস ধরে কাজ বন্ধ রেখে মালামাল গুটিয়ে রাতের আঁধারে উধাও হয়ে গেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। হাওরের লাখ লাখ মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন এখন থমকে গেছে মেঘনার মাঝদরিয়ায়।  


​কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার বাঙালপাড়া ইউনিয়নের নোয়াগাঁও থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার চাতলপাড় ইউনিয়নের দুর্গাপুর পর্যন্ত মেঘনা নদীর ওপর এই দীর্ঘ সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেতুটি সম্পন্ন হলে অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইন—এই তিন হাওর উপজেলার সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রামের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হবে। তাছাড়া​ হাওরে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ ধান, মাছ ও কৃষিপণ্য সরাসরি রাজধানীসহ দেশের বড় বাজারগুলোতে সহজে পৌঁছানো সম্ভব হতো। এছাড়া বর্ষায় ট্রলার আর শুষ্ক মৌসুমে হেঁটে বা ডিঙি নৌকায় নদী পার হতে গিয়ে মুমূর্ষু রোগী ও সাধারণ মানুষ যে অপরিসীম ভোগান্তিতে পড়েন, তার স্থায়ী সমাধান ছিল এই সেতু।

​স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের পর ১৭৭ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের এই প্রকল্পের কার্যাদেশ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘তমা কনস্ট্রাকশন’। কাজের শুরুর দিকে অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো হলেও দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সুবিধাভোগী শীর্ষ কর্তা (তমা কনস্ট্রাকশনের মালিক) রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আত্মগোপনে চলে যান। ঠিকাদার গা-ঢাকা দেওয়ার পরপরই প্রকল্পের কাজের গতি ধীর হতে থাকে। একপর্যায়ে গত পাঁচ মাস আগে নির্মাণকাজে নিয়োজিত প্রকৌশলী ও শ্রমিকেরা সাইটে থাকা দামি যন্ত্রপাতি, রড, সিমেন্টসহ অধিকাংশ মালামাল গুটিয়ে রাতের আঁধারে কেটে পড়েন। স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজের গুণগত মান তদারকি এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টিতে সংশ্লিষ্ট সরকারি তদারকি সংস্থার চরম গাফিলতি ছিল।  

​সরেজমিনে অষ্টগ্রামের বাঙালপাড়া নোয়াগাঁও এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মেঘনার পাড়ে নির্মাণসামগ্রীর কোনো চিহ্ন নেই। নদীর বুকে কেবল কয়েকটা অর্ধনির্মিত পিলার দাঁড়িয়ে আছে। ​বাঙালপাড়া এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “হাওরের মানুষের দুঃখ ঘোচাতে এই সেতুটিই ছিল সবচেয়ে বড় আশা। কিন্তু ঠিকাদার কোটি কোটি টাকার কাজ ঝুলিয়ে রেখে পালিয়ে গেল, আর আমাদের কপালে ঝুলে রইল আবার সেই নৌকা পারাপারের কষ্ট।”


​বর্ষা মৌসুমে উত্তাল মেঘনায় ছোট নৌকা বা ট্রলারে যাতায়াত করতে গিয়ে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। অন্যদিকে, শুষ্ক মৌসুমে কাদা-জল পেরিয়ে যাতায়াতে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা।

​ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তমা কনস্ট্রাকশনের সংশ্লিষ্টদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। ​তবে স্থানীয় প্রোকৌশল বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্ধারিত সময়ে কাজ না করা এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সাইট ছেড়ে চলে যাওয়ায় চুক্তি বাতিলের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে আইনি পদক্ষেপ শেষ করে পুনরায় দরপত্র (টেন্ডার) আহ্বানের মাধ্যমে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে কাজ শুরুর আশ্বাস দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।  


​হাওরবাসীর এখন একটাই দাবি—আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও টেন্ডার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করে নদীর বুকে আটকে থাকা পিলারে পুনরায় কাজ শুরু করা হোক এবং স্বপ্নের সেতু দৃশ্যমান করে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘব করা হোক।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬


হাওরবাসীর স্বপ্নের সেতু এখন শুধুই পিলার, ৪০% কাজেই উধাও ঠিকাদার

প্রকাশের তারিখ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

মেঘনা নদীর বুক চিরে দাঁড়িয়ে থাকা নিঃসঙ্গ কয়েকটা কংক্রিটের পিলার—বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে কোনো ধ্বংসাবশেষ। অথচ এই পিলারগুলোই হওয়ার কথা ছিল কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দূরবর্তী হাওরাঞ্চলের ভাগ্য বদলের সেতুবন্ধ। ১৭৭ কোটি ৮৪ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন ১ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘বাঙালপাড়া-চাতলপাড় সেতু’র কাজ ৪০ শতাংশ পেরোতেই থমকে গেছে। গত পাঁচ মাস ধরে কাজ বন্ধ রেখে মালামাল গুটিয়ে রাতের আঁধারে উধাও হয়ে গেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। হাওরের লাখ লাখ মানুষের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন এখন থমকে গেছে মেঘনার মাঝদরিয়ায়।  


​কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার বাঙালপাড়া ইউনিয়নের নোয়াগাঁও থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার চাতলপাড় ইউনিয়নের দুর্গাপুর পর্যন্ত মেঘনা নদীর ওপর এই দীর্ঘ সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেতুটি সম্পন্ন হলে অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইন—এই তিন হাওর উপজেলার সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে ঢাকা, সিলেট ও চট্টগ্রামের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপিত হবে। তাছাড়া​ হাওরে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ ধান, মাছ ও কৃষিপণ্য সরাসরি রাজধানীসহ দেশের বড় বাজারগুলোতে সহজে পৌঁছানো সম্ভব হতো। এছাড়া বর্ষায় ট্রলার আর শুষ্ক মৌসুমে হেঁটে বা ডিঙি নৌকায় নদী পার হতে গিয়ে মুমূর্ষু রোগী ও সাধারণ মানুষ যে অপরিসীম ভোগান্তিতে পড়েন, তার স্থায়ী সমাধান ছিল এই সেতু।

​স্থানীয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের পর ১৭৭ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ের এই প্রকল্পের কার্যাদেশ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘তমা কনস্ট্রাকশন’। কাজের শুরুর দিকে অগ্রগতি চোখে পড়ার মতো হলেও দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে যায়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সুবিধাভোগী শীর্ষ কর্তা (তমা কনস্ট্রাকশনের মালিক) রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আত্মগোপনে চলে যান। ঠিকাদার গা-ঢাকা দেওয়ার পরপরই প্রকল্পের কাজের গতি ধীর হতে থাকে। একপর্যায়ে গত পাঁচ মাস আগে নির্মাণকাজে নিয়োজিত প্রকৌশলী ও শ্রমিকেরা সাইটে থাকা দামি যন্ত্রপাতি, রড, সিমেন্টসহ অধিকাংশ মালামাল গুটিয়ে রাতের আঁধারে কেটে পড়েন। স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজের গুণগত মান তদারকি এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টিতে সংশ্লিষ্ট সরকারি তদারকি সংস্থার চরম গাফিলতি ছিল।  

​সরেজমিনে অষ্টগ্রামের বাঙালপাড়া নোয়াগাঁও এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, মেঘনার পাড়ে নির্মাণসামগ্রীর কোনো চিহ্ন নেই। নদীর বুকে কেবল কয়েকটা অর্ধনির্মিত পিলার দাঁড়িয়ে আছে। ​বাঙালপাড়া এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “হাওরের মানুষের দুঃখ ঘোচাতে এই সেতুটিই ছিল সবচেয়ে বড় আশা। কিন্তু ঠিকাদার কোটি কোটি টাকার কাজ ঝুলিয়ে রেখে পালিয়ে গেল, আর আমাদের কপালে ঝুলে রইল আবার সেই নৌকা পারাপারের কষ্ট।”


​বর্ষা মৌসুমে উত্তাল মেঘনায় ছোট নৌকা বা ট্রলারে যাতায়াত করতে গিয়ে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। অন্যদিকে, শুষ্ক মৌসুমে কাদা-জল পেরিয়ে যাতায়াতে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা।

​ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তমা কনস্ট্রাকশনের সংশ্লিষ্টদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। ​তবে স্থানীয় প্রোকৌশল বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নির্ধারিত সময়ে কাজ না করা এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সাইট ছেড়ে চলে যাওয়ায় চুক্তি বাতিলের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে আইনি পদক্ষেপ শেষ করে পুনরায় দরপত্র (টেন্ডার) আহ্বানের মাধ্যমে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ দিয়ে কাজ শুরুর আশ্বাস দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।  


​হাওরবাসীর এখন একটাই দাবি—আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও টেন্ডার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করে নদীর বুকে আটকে থাকা পিলারে পুনরায় কাজ শুরু করা হোক এবং স্বপ্নের সেতু দৃশ্যমান করে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘব করা হোক।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ