ঢাকা    বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

কিশোরগঞ্জে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে জনসমুদ্র: বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের মধ্য দিয়ে উদযাপিত।


সৈয়দ মইনুল হোসেন
সৈয়দ মইনুল হোসেন
প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কিশোরগঞ্জে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে জনসমুদ্র: বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের মধ্য দিয়ে উদযাপিত।
বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর বিশাল শোভাযাত্রায় কিশোরগঞ্জে নেতৃত্ব দেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও কিশোরগঞ্জ -১ এর সাংসদ মোঃ মাজহারুল ইসলাম।

শুভাদয় আর প্রত্যয়ের দীপশিখা জ্বেলে আজ ইতিহাসের পাতায় যোগ হলো এক অনবদ্য অধ্যায়। আজ ঐতিহাসিক ১ সেপ্টেম্বর—বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি, জাতীয়তাবাদ ও সার্বভৌমত্বের সুদৃঢ় অতন্দ্র প্রহরী হয়ে টিকে থাকা এই রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মটির জন্মলগ্নের স্মৃতি আজ পুরো দেশজুড়ে নতুন এক প্রাণের সঞ্চার করেছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে কিশোরগঞ্জের রাজপথ রূপ নিয়েছিল জনসমুদ্র ও রঙিন রূপকথায়। জেলা বিএনপি ও এর সর্বস্তরের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত বিশাল শোভাযাত্রা, উদ্দীপনাঘন আলোচনা সভা এবং বিশেষ দোয়া মাহফিলের মধ্য দিয়ে অত্যন্ত সাড়ম্বরে উদযাপিত হয়েছে প্রিয় দলের এই গৌরবোজ্জ্বল জন্মদিন।

​আজকের এই শুভ দিনে স্মৃতির ক্যানভাসে ভেসে ওঠে ১৯৭৮ সালের সেই ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের এক নতুন চেতনাকে বুকে ধারণ করে, বহুদলীয় গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র লালন করে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি। স্বাধীন বাংলাদেশ যখন দিকনির্দেশনাহীন এক রাজনৈতিক ট্রানজিশনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন জিয়াউর রহমান এ দেশের মানুষের মেধা, শ্রম, স্বকীয়তা ও মাটির সোঁদা গন্ধকে একসুতোয় বেঁধে উপহার দিয়েছিলেন এক নতুন দর্শন। উৎপাদনমুখী রাজনীতি, কৃষি বিপ্লব, আর স্বাবলম্বী বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে যে বীজ রোপণ করেছিলেন তিনি, তা আজ সাড়ে চার দশকের পরিক্রমায় এক মহীরুহে পরিণত হয়েছে।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই বিশেষ দিনে এক বাণীতে বিএনপি চেয়ারম্যান ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের সর্বস্তরের নেতাকর্মী, সমর্থক, শুভানুধ্যায়ী এবং দেশবাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। বাণীতে তিনি জাতীয়তাবাদী চেতনার আলোয় দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার সুসংহত করা এবং এক আধুনিক ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

​সকাল থেকেই কিশোরগঞ্জের আবহাওয়া যেন এক উৎসবের পসরা সাজিয়ে বসেছিল। ভোরের আলো ফোটার পরপরই জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে নেতাকর্মীরা ব্যানার, ফেস্টুন, আর প্লেকার্ড হাতে নিয়ে ছোট ছোট মিছিল নিয়ে জমায়েত হতে থাকেন জেলা বিএনপির কার্যালয় প্রাঙ্গণে। মুহূর্তের মধ্যেই সেই ছোট ছোট জলধারা এসে মিশে যায় এক মহাসমুদ্রে। ড্রামের তাল, স্লোগানের তোড় আর জাতীয় ও দলীয় পতাকার পতপত শব্দে মুখরিত হয়ে ওঠে প্রাক-শরতের আকাশ-বাতাস। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আয়োজিত হয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মূল আকর্ষণ—বিশাল ও বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রার শুভ সূচনা হতেই কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক রাজপথ যেন রূপ নেয় এক বর্ণিল ক্যানভাসে। মিছিলে অংশ নেন হাজার হাজার উন্মুখ সমর্থক ও দলীয় কর্মী। 'জিয়া তোর মনে পড়ে, 'জাতীয়তাবাদ জিন্দাবাদ', 'তারেক রহমানের সালাম নিন'—এসব স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে পুরো শহর। ​উচ্ছ্বসিত এই শোভাযাত্রায় অগ্রভাগে থেকে নেতৃত্ব দেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও কিশোরগঞ্জ-১ আসনের জনপ্রিয় সংসদ সদস্য মো: মাজহারুল ইসলাম। তাঁর সঙ্গে শোভাযাত্রায় পা মেলান জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ খান সোহেল এবং জেলা বিএনপির শীর্ষ সারির নেতৃবৃন্দ। প্রবীণদের সুচিন্তিত দিকনির্দেশনা আর নবীনদের উদ্যমী পদচারণায় পুরো শোভাযাত্রাটি এক অপূর্ব মেলবন্ধনে পরিণত হয়।

জেলা যুবদল, ছাত্রদল, কৃষকদল, শ্রমিকদল ও মৎস্যজীবী দলসহ বিএনপির প্রতিটি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের হাজার হাজার নেতাকর্মী তাঁদের সুনির্দিষ্ট ব্যানার ও সাজসজ্জা নিয়ে মিছিলে নতুন মাত্রা যোগ করেন। মিছিলটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলো প্রদক্ষিণ করে। রাজপথের দু'পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আপামর জনসাধারণ হাত নেড়ে ও অভিবাদন জানিয়ে এই বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রাকে স্বাগত জানায়। উৎসবের এই জোয়ারে যেন ভেসে যায় শহরের চেনা কোলাহল। দীর্ঘ পথ পরিক্রমা শেষে মহাসমুদ্রসম মিছিলটি পুনরায় জেলা বিএনপির কার্যালয় প্রাঙ্গণে এসে সমাপ্ত হয়।

​শোভাযাত্রা শেষে জেলা কার্যালয়ের উন্মুক্ত মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় এক ভাবগম্ভীর অথচ প্রাণবন্ত আলোচনা সভা। সভার শুরুতেই বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিটের নীরবতা পালন করা হয়। ​আলোচনা সভায় প্রধান বক্তা ও সভাপতির বক্তব্য দিতে গিয়ে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো: মাজহারুল ইসলাম আবেগপ্লুত কণ্ঠে বলেন- ​"বিএনপি শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নাম নয়; বিএনপি এ দেশের ১৭ কোটি মানুষের আবেগ, অস্তিত্ব আর সংগ্রামের অন্য এক প্রতিচ্ছবি। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন আমাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। আজ তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরি, দলের চেয়ারম্যান ও আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গতিশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে চলেছে। দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম আর ত্যাগের বিনিময়ে আমরা যে অর্জনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছি, তাকে রক্ষা করাই আজ আমাদের মূল দায়িত্ব।" তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, কিশোরগঞ্জের মাটি চিরকালই জাতীয়তাবাদী চেতনার উর্বর ঘাঁটি। দলের যেকোনো ক্রান্তিলগ্নে এখানকার নেতাকর্মীরা যেভাবে বুক চিতিয়ে লড়াই করেছেন, আগামী দিনেও এ দেশের সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখতে কিশোরগঞ্জ বিএনপি একইভাবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।

আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ খান সোহেল বলেন—​"৪৮ বছরের এই দীর্ঘ যাত্রাপথ মোটেও মসৃণ ছিল না। রাজপথের রক্ত, ত্যাগ আর সহস্র নেতাকর্মীর আত্মদানের বিনিময়ে বিএনপি আজকের এই শক্তিশালী অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। আমাদের মূল শক্তি হলো সাধারণ জনগণ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে কিশোরগঞ্জের সর্বস্তরের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আমরা এক বৈষম্যহীন, উন্নত ও মানবিক কিশোরগঞ্জ গড়ে তুলব।"

​আলোচনা সভায় জেলা যুবদল, ছাত্রদল, কৃষকদল, শ্রমিকদল ও অন্যান্য অঙ্গ-সংগঠনের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য রাখেন। বক্তারা তুলে ধরেন দলের চার দশকের দীর্ঘ পথচলার ইতিহাস, বিগত দিনগুলোর আত্মত্যাগ এবং একটি স্বাবলম্বী বাংলাদেশ নির্মাণের ভবিষ্যৎ রূপরেখা। নতুন প্রজন্মের তরুণদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করে কীভাবে জাতীয় সমৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা যায়, সে বিষয়েও আলোকপাত করা হয়।

​আলোচনা পর্বের সমাপ্তিতে আয়োজিত হয় এক আবেগঘন দোয়া ও মোনাজাত। সমগ্র কার্যালয় প্রাঙ্গণজুড়ে নেমে আসে এক অপার্থিব নীরবতা ও পরম পবিত্র পরিবেশ। হাত তোলেন উপস্থিত হাজারো সাধারণ মানুষ ও নেতাকর্মীরা। মোনাজাতে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ কামনায় পরম করুণাময় আল্লাহর দরবারে আকুল প্রার্থনা জানানো হয়। বিশেষ মোনাজাতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করা হয়। একই সাথে, দলের দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিক্রমায় যে সকল দেশপ্রেমিক নেতাকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন, আত্মত্যাগ করেছেন, তাঁদের বিদেহী আত্মার চিরশান্তি প্রার্থনা করা হয়। মোনাজাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও দেশ পরিচালনায় অভূতপূর্ব সাফল্য কামনা করে বিশেষ প্রার্থনা করা হয়, যেন তিনি দেশকে এক সমৃদ্ধ ও আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন। সর্বশক্তিমান আল্লাহর নিকট আবেদন জানানো হয় যেন এ দেশ থেকে সকল অন্যায়, বৈষম্য ও কলুষতা দূর হয়ে শান্তি ও সমৃদ্ধির সুবাতাস বইতে থাকে।

​প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রতিটি আয়োজনে আজ কিশোরগঞ্জে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ঐক্যের সুদৃঢ় প্রাচীর। প্রবীণদের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা আর তরুণদের অদম্য প্রাণশক্তির মিশেলে কিশোরগঞ্জ বিএনপি আজ নতুন এক শক্তিতে বলীয়ান।

​৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনটি শুধু অতীতে ফিরে তাকানোর কিংবা উদযাপনের দিন ছিল না; বরং এটি ছিল আগামীর বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ার শপথ নেওয়ার দিন। কিশোরগঞ্জের ধমনীতে আজ যে উদ্দীপনার ঢেউ খেলে গেছে, তা প্রমাণ করে এ দেশের মানুষের হৃদয়ে জাতীয়তাবাদী চেতনার শিকড় কতটা গভীরে প্রোথিত। সকল প্রতিকূলতা জয় করে, ঐক্যের এই অটুট বন্ধনকে পাথেয় করে বিএনপি আগামী দিনের একটি আলোকময়, স্বনির্ভর ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের অভিমুখে যাত্রা অব্যাহত রাখবে—আজকের এই ঐতিহাসিক দিনে এটাই কিশোরগঞ্জবাসীর একমাত্র অঙ্গীকার।

আপনার মতামত লিখুন

দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬


কিশোরগঞ্জে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে জনসমুদ্র: বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা ও দোয়া মাহফিলের মধ্য দিয়ে উদযাপিত।

প্রকাশের তারিখ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

শুভাদয় আর প্রত্যয়ের দীপশিখা জ্বেলে আজ ইতিহাসের পাতায় যোগ হলো এক অনবদ্য অধ্যায়। আজ ঐতিহাসিক ১ সেপ্টেম্বর—বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতি, জাতীয়তাবাদ ও সার্বভৌমত্বের সুদৃঢ় অতন্দ্র প্রহরী হয়ে টিকে থাকা এই রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মটির জন্মলগ্নের স্মৃতি আজ পুরো দেশজুড়ে নতুন এক প্রাণের সঞ্চার করেছে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই মাহেন্দ্রক্ষণে কিশোরগঞ্জের রাজপথ রূপ নিয়েছিল জনসমুদ্র ও রঙিন রূপকথায়। জেলা বিএনপি ও এর সর্বস্তরের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত বিশাল শোভাযাত্রা, উদ্দীপনাঘন আলোচনা সভা এবং বিশেষ দোয়া মাহফিলের মধ্য দিয়ে অত্যন্ত সাড়ম্বরে উদযাপিত হয়েছে প্রিয় দলের এই গৌরবোজ্জ্বল জন্মদিন।

​আজকের এই শুভ দিনে স্মৃতির ক্যানভাসে ভেসে ওঠে ১৯৭৮ সালের সেই ঐতিহাসিক মাহেন্দ্রক্ষণ। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের এক নতুন চেতনাকে বুকে ধারণ করে, বহুদলীয় গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র লালন করে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি। স্বাধীন বাংলাদেশ যখন দিকনির্দেশনাহীন এক রাজনৈতিক ট্রানজিশনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল, তখন জিয়াউর রহমান এ দেশের মানুষের মেধা, শ্রম, স্বকীয়তা ও মাটির সোঁদা গন্ধকে একসুতোয় বেঁধে উপহার দিয়েছিলেন এক নতুন দর্শন। উৎপাদনমুখী রাজনীতি, কৃষি বিপ্লব, আর স্বাবলম্বী বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে যে বীজ রোপণ করেছিলেন তিনি, তা আজ সাড়ে চার দশকের পরিক্রমায় এক মহীরুহে পরিণত হয়েছে।

প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই বিশেষ দিনে এক বাণীতে বিএনপি চেয়ারম্যান ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের সর্বস্তরের নেতাকর্মী, সমর্থক, শুভানুধ্যায়ী এবং দেশবাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। বাণীতে তিনি জাতীয়তাবাদী চেতনার আলোয় দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা, জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার সুসংহত করা এবং এক আধুনিক ও উন্নত বাংলাদেশ গড়ার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

​সকাল থেকেই কিশোরগঞ্জের আবহাওয়া যেন এক উৎসবের পসরা সাজিয়ে বসেছিল। ভোরের আলো ফোটার পরপরই জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে নেতাকর্মীরা ব্যানার, ফেস্টুন, আর প্লেকার্ড হাতে নিয়ে ছোট ছোট মিছিল নিয়ে জমায়েত হতে থাকেন জেলা বিএনপির কার্যালয় প্রাঙ্গণে। মুহূর্তের মধ্যেই সেই ছোট ছোট জলধারা এসে মিশে যায় এক মহাসমুদ্রে। ড্রামের তাল, স্লোগানের তোড় আর জাতীয় ও দলীয় পতাকার পতপত শব্দে মুখরিত হয়ে ওঠে প্রাক-শরতের আকাশ-বাতাস। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আয়োজিত হয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মূল আকর্ষণ—বিশাল ও বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রার শুভ সূচনা হতেই কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক রাজপথ যেন রূপ নেয় এক বর্ণিল ক্যানভাসে। মিছিলে অংশ নেন হাজার হাজার উন্মুখ সমর্থক ও দলীয় কর্মী। 'জিয়া তোর মনে পড়ে, 'জাতীয়তাবাদ জিন্দাবাদ', 'তারেক রহমানের সালাম নিন'—এসব স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে পুরো শহর। ​উচ্ছ্বসিত এই শোভাযাত্রায় অগ্রভাগে থেকে নেতৃত্ব দেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও কিশোরগঞ্জ-১ আসনের জনপ্রিয় সংসদ সদস্য মো: মাজহারুল ইসলাম। তাঁর সঙ্গে শোভাযাত্রায় পা মেলান জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ খান সোহেল এবং জেলা বিএনপির শীর্ষ সারির নেতৃবৃন্দ। প্রবীণদের সুচিন্তিত দিকনির্দেশনা আর নবীনদের উদ্যমী পদচারণায় পুরো শোভাযাত্রাটি এক অপূর্ব মেলবন্ধনে পরিণত হয়।

জেলা যুবদল, ছাত্রদল, কৃষকদল, শ্রমিকদল ও মৎস্যজীবী দলসহ বিএনপির প্রতিটি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের হাজার হাজার নেতাকর্মী তাঁদের সুনির্দিষ্ট ব্যানার ও সাজসজ্জা নিয়ে মিছিলে নতুন মাত্রা যোগ করেন। মিছিলটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলো প্রদক্ষিণ করে। রাজপথের দু'পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আপামর জনসাধারণ হাত নেড়ে ও অভিবাদন জানিয়ে এই বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রাকে স্বাগত জানায়। উৎসবের এই জোয়ারে যেন ভেসে যায় শহরের চেনা কোলাহল। দীর্ঘ পথ পরিক্রমা শেষে মহাসমুদ্রসম মিছিলটি পুনরায় জেলা বিএনপির কার্যালয় প্রাঙ্গণে এসে সমাপ্ত হয়।

​শোভাযাত্রা শেষে জেলা কার্যালয়ের উন্মুক্ত মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় এক ভাবগম্ভীর অথচ প্রাণবন্ত আলোচনা সভা। সভার শুরুতেই বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিটের নীরবতা পালন করা হয়। ​আলোচনা সভায় প্রধান বক্তা ও সভাপতির বক্তব্য দিতে গিয়ে জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো: মাজহারুল ইসলাম আবেগপ্লুত কণ্ঠে বলেন- ​"বিএনপি শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নাম নয়; বিএনপি এ দেশের ১৭ কোটি মানুষের আবেগ, অস্তিত্ব আর সংগ্রামের অন্য এক প্রতিচ্ছবি। সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন আমাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। আজ তাঁরই সুযোগ্য উত্তরসূরি, দলের চেয়ারম্যান ও আমাদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের গতিশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে চলেছে। দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রাম আর ত্যাগের বিনিময়ে আমরা যে অর্জনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছি, তাকে রক্ষা করাই আজ আমাদের মূল দায়িত্ব।" তিনি আরও জোর দিয়ে বলেন, কিশোরগঞ্জের মাটি চিরকালই জাতীয়তাবাদী চেতনার উর্বর ঘাঁটি। দলের যেকোনো ক্রান্তিলগ্নে এখানকার নেতাকর্মীরা যেভাবে বুক চিতিয়ে লড়াই করেছেন, আগামী দিনেও এ দেশের সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখতে কিশোরগঞ্জ বিএনপি একইভাবে অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।

আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ খান সোহেল বলেন—​"৪৮ বছরের এই দীর্ঘ যাত্রাপথ মোটেও মসৃণ ছিল না। রাজপথের রক্ত, ত্যাগ আর সহস্র নেতাকর্মীর আত্মদানের বিনিময়ে বিএনপি আজকের এই শক্তিশালী অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে। আমাদের মূল শক্তি হলো সাধারণ জনগণ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে কিশোরগঞ্জের সর্বস্তরের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আমরা এক বৈষম্যহীন, উন্নত ও মানবিক কিশোরগঞ্জ গড়ে তুলব।"


​আলোচনা সভায় জেলা যুবদল, ছাত্রদল, কৃষকদল, শ্রমিকদল ও অন্যান্য অঙ্গ-সংগঠনের শীর্ষ নেতারা বক্তব্য রাখেন। বক্তারা তুলে ধরেন দলের চার দশকের দীর্ঘ পথচলার ইতিহাস, বিগত দিনগুলোর আত্মত্যাগ এবং একটি স্বাবলম্বী বাংলাদেশ নির্মাণের ভবিষ্যৎ রূপরেখা। নতুন প্রজন্মের তরুণদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করে কীভাবে জাতীয় সমৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা যায়, সে বিষয়েও আলোকপাত করা হয়।

​আলোচনা পর্বের সমাপ্তিতে আয়োজিত হয় এক আবেগঘন দোয়া ও মোনাজাত। সমগ্র কার্যালয় প্রাঙ্গণজুড়ে নেমে আসে এক অপার্থিব নীরবতা ও পরম পবিত্র পরিবেশ। হাত তোলেন উপস্থিত হাজারো সাধারণ মানুষ ও নেতাকর্মীরা। মোনাজাতে দেশ, জাতি ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ কামনায় পরম করুণাময় আল্লাহর দরবারে আকুল প্রার্থনা জানানো হয়। বিশেষ মোনাজাতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আত্মার মাগফিরাত ও শান্তি কামনা করা হয়। একই সাথে, দলের দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিক্রমায় যে সকল দেশপ্রেমিক নেতাকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন, আত্মত্যাগ করেছেন, তাঁদের বিদেহী আত্মার চিরশান্তি প্রার্থনা করা হয়। মোনাজাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু ও দেশ পরিচালনায় অভূতপূর্ব সাফল্য কামনা করে বিশেষ প্রার্থনা করা হয়, যেন তিনি দেশকে এক সমৃদ্ধ ও আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন। সর্বশক্তিমান আল্লাহর নিকট আবেদন জানানো হয় যেন এ দেশ থেকে সকল অন্যায়, বৈষম্য ও কলুষতা দূর হয়ে শান্তি ও সমৃদ্ধির সুবাতাস বইতে থাকে।

​প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রতিটি আয়োজনে আজ কিশোরগঞ্জে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ঐক্যের সুদৃঢ় প্রাচীর। প্রবীণদের দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা আর তরুণদের অদম্য প্রাণশক্তির মিশেলে কিশোরগঞ্জ বিএনপি আজ নতুন এক শক্তিতে বলীয়ান।


​৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনটি শুধু অতীতে ফিরে তাকানোর কিংবা উদযাপনের দিন ছিল না; বরং এটি ছিল আগামীর বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ার শপথ নেওয়ার দিন। কিশোরগঞ্জের ধমনীতে আজ যে উদ্দীপনার ঢেউ খেলে গেছে, তা প্রমাণ করে এ দেশের মানুষের হৃদয়ে জাতীয়তাবাদী চেতনার শিকড় কতটা গভীরে প্রোথিত। সকল প্রতিকূলতা জয় করে, ঐক্যের এই অটুট বন্ধনকে পাথেয় করে বিএনপি আগামী দিনের একটি আলোকময়, স্বনির্ভর ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের অভিমুখে যাত্রা অব্যাহত রাখবে—আজকের এই ঐতিহাসিক দিনে এটাই কিশোরগঞ্জবাসীর একমাত্র অঙ্গীকার।


দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ফয়সাল আলম , মোবাইল- ০১৯১৬৫৫৭০১৭
  প্রধান সম্পাদক: মো: আতাউর রহমান, মোবাইল: ০২৪১০৯১৭৩০

কপিরাইট © ২০২৫ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ