টেকসই উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতাকে একটি শক্তিশালী ও রূপান্তরমুখী মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। বিশ্বজুড়ে বিভাজন, সংঘাত ও ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা বৈশ্বিক সংহতি পুনরুজ্জীবিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
১২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা দিবস উপলক্ষে দেওয়া এক বার্তায় গুতেরেস এসব কথা বলেন। ২০২৬ সালে দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে—‘সংহতির উত্থান: অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উদ্ভাবনী উন্নয়নের জন্য বৈশ্বিক জোট’।
জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, এ বছরের প্রতিপাদ্য মনে করিয়ে দেয় যে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো প্রতিদিন নিজেদের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন সমাধান তৈরি করছে। একই সঙ্গে এসব সমাধান অন্য দেশের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমে অভিন্ন সমস্যা মোকাবিলা এবং উন্নয়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করছে।
দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার বাস্তব সুফল তুলে ধরে গুতেরেস বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে কৃষকেরা একে অপরের অভিজ্ঞতা থেকে শিখছেন। উদ্যোক্তারা পরিবেশবান্ধব ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সুযোগ সম্প্রসারণে নতুন প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী ধারণা বিনিময় করছেন। পাশাপাশি সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে স্বাস্থ্যকর্মীরা পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে আরও দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করছেন।
তিনি বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে জ্ঞান, দক্ষতা, প্রযুক্তি ও সফল উদ্যোগ বিনিময়ের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে উদ্ভাবিত সমাধান বৃহত্তর পরিসরে কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে। এতে এক দেশের অভিজ্ঞতা অন্য দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে।
গুতেরেস বলেন, ‘গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর সাউথ-সাউথ অ্যান্ড ট্রায়াঙ্গুলার কো-অপারেশন’ চালুর মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতায় একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। এই বৈশ্বিক জোট সরকার, উন্নয়ন ব্যাংক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বেসরকারি খাতকে একই প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসবে।
জাতীয় উন্নয়ন অগ্রাধিকারের সঙ্গে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন ও কারিগরি দক্ষতার সমন্বয় ঘটানো এই জোটের অন্যতম উদ্দেশ্য বলে জানান জাতিসংঘ মহাসচিব। এর মাধ্যমে কার্যকর ধারণাকে বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত করা এবং উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তব উদ্যোগে রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
গুতেরেসের মতে, দক্ষিণ-দক্ষিণ ও ত্রিমুখী সহযোগিতার এই কাঠামো বিভিন্ন দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী উপযুক্ত অংশীদার, অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও বিশেষজ্ঞ সহায়তা খুঁজে পেতে ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে সফল উন্নয়ন উদ্যোগগুলো আরও বেশি দেশ ও জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে।
তবে দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার অগ্রগতি উন্নত দেশগুলোর দায়িত্ব কমিয়ে দেয় না বলে সতর্ক করেন তিনি। উত্তর-দক্ষিণ সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়া, উন্নয়নশীল দেশগুলোকে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া এবং বিশ্বব্যাপী বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে উন্নত দেশগুলোকে তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে বলে উল্লেখ করেন গুতেরেস।
তিনি বলেন, দক্ষিণের দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা উন্নয়নের শক্তিশালী চালিকাশক্তি হলেও এটি প্রচলিত আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহায়তার বিকল্প নয়। বরং উত্তর-দক্ষিণ, দক্ষিণ-দক্ষিণ ও ত্রিমুখী সহযোগিতার সমন্বিত প্রয়োগের মাধ্যমেই অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব।
বর্তমান বিশ্বের বিভাজন ও সংঘাতের প্রসঙ্গ তুলে ধরে জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, এমন সময়ে দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা বৈশ্বিক সংহতি ফিরিয়ে আনার অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে। এটি দেশগুলোর সামনে আবারও প্রমাণ করে যে বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার তুলনায় সম্মিলিত উদ্যোগ অনেক বেশি কার্যকর ও শক্তিশালী।
গুতেরেস বলেন, বিশ্বের যেখানেই কার্যকর কোনো সমাধান তৈরি হোক না কেন, তা যেন অন্য দেশের মানুষের জীবনমান উন্নয়নেও ব্যবহৃত হতে পারে। জ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনকে সীমান্তের মধ্যে আটকে না রেখে মানুষের কল্যাণে ছড়িয়ে দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
সমতা, সমৃদ্ধি ও শান্তির লক্ষ্যে দেশগুলোকে সীমান্ত অতিক্রম করে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, সহযোগিতা ও অংশীদারত্বের ভিত্তিতে এগিয়ে গেলে অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সহজ হবে। একই সঙ্গে বিশ্বের সব অঞ্চলের মানুষ উন্নয়নের সুফল পাওয়ার সুযোগ পাবে।








