ঢাকা    শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
দৈনিক উন্নয়নে বাংলাদেশ

বন ও পরিবেশ

নিয়ম ভেঙে পরিষদের গাছ কাটালেন আওয়ামী লীগ নেতা চেয়ারম্যান

​কিশোরগঞ্জের হাওরবেষ্টিত অষ্টগ্রাম উপজেলার আদমপুর ইউনিয়ন পরিষদের সীমানা প্রাচীরের ভেতর থেকে গভীর রাতে একের পর এক মূল্যবান গাছ কেটে নিয়ে যাওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও নিষিদ্ধ ঘোষিত উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মন্নাফের বিরুদ্ধে। পরিষদের কোনো সদস্য কিংবা প্যানেল চেয়ারম্যানকে বিন্দুমাত্র না জানিয়ে সম্পূর্ণ আড়ালে এই কাজ পরিচালনা করায় স্থানীয় সাধারণ মানুষের মাঝে চরম ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে কোটি টাকার সরকারি সম্পদের অংশীদার এসব পুরোনো মেহগনি ও একাছিয়া গাছ কেটে করাতকলে পাঠানোর সত্যতা মেলায় ইতোমধ্যেই সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যানকে কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।​​স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, গত কয়েক দিনে আদমপুর ইউনিয়ন পরিষদ প্রাঙ্গণ থেকে গোপনে ছয়টি বিশালাকায় মেহগনি ও একাছিয়া জাতের গাছ কেটে সাবাড় করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শী ও পরিষদের আশপাশের বাসিন্দাদের দাবি, দিনের আলোয় নয়, বরং মানুষের নজর এড়াতে গভীর রাতের সুযোগ নিয়েই গাছগুলো কেটে সড়িয়ে নেওয়া হয়। পরে সেগুলোকে সোজা পাঠিয়ে দেওয়া হয় এক স্থানীয় করাতকলে। কাটা পড়া প্রতিটি গাছের বাজারমূল্য আনুমানিক ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা, যার মোট অংক লাখ টাকার ঘর ছাড়িয়ে যায়। দীর্ঘদিন ধরে পরিষদের শোভা বর্ধন করে আসা এই প্রাকৃতিক সম্পদ চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ায় ইউনিয়নজুড়ে গুঞ্জন ও নানা প্রশ্ন ডালপালা মেলতে শুরু করেছে।​এক সেশনে বা দু’এক দিনে সরকারি বা আধাসরকারি প্রাঙ্গণের কোনো সম্পদ সরাতে হলে যেখানে রেজুলেশন ও পুরো কার্যনির্বাহী কমিটির সম্মতির আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেখানে পরিষদের নির্বাচিত অন্যান্য প্রতিনিধিরাও এ বিষয়ে সম্পূর্ণ অন্ধকারে ছিলেন।​আদমপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার ও প্যানেল চেয়ারম্যান পলাশ মিয়া চরম অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, “পরিষদের অভ্যন্তর থেকে এমনভাবে ছয়-ছয়টি মূল্যবান বৃক্ষ কেটে নেওয়া হলো, অথচ প্রশাসনিকভাবে আমাদের কিছুই জানানো হয়নি। চেয়ারম্যান সাহেব এ ব্যাপারে আমার সাথে কোনো আলোচনা করেননি। এমনকি পরিষদের অন্য সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেও দেখেছি, তাঁরাও চরম বিষ্ময় প্রকাশ করেছেন। সাধারণ মানুষের টাকা ও সরকারি প্রাঙ্গণের সম্পদ এভাবে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে উধাও হয়ে যাওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”​এদিকে ব্যাপক বিতর্কের মুখে পড়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন অভিযুক্ত ইউপি চেয়ারম্যান ও আদমপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মন্নাফ। টানা চারবারের এই চেয়ারম্যান স্বীকার করেছেন গাছ কাটার বিষয়টি, তবে রাতের আঁধারে কিংবা বিক্রির উদ্দেশ্যে গাছ কাটার অভিযোগ পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন তিনি। চেয়ারম্যান আবদুল মন্নাফ বলেন, “আমি পরিষদের সম্পদ বিক্রি করিনি, সব গাছ করাতকলেই রক্ষিত আছে। পরিষদের সীমানার ভেতরে থাকা তিনটি গাছ মরে গিয়ে জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছিল, যা পরিষদের ভবন এবং সংলগ্ন স্থানীয় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য মারাত্মক বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল। যে কোনো মুহূর্তে বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা ছিল। বিষয়টি তৎকালীন বিদায়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সিলভিয়া স্নিগ্ধাকে জানানো হলে তিনি মৌখিকভাবে গাছগুলো কেটে ফেলার অনুমতি দিয়েছিলেন। তবে লিখিত অনুমতি না নেওয়াটা আমার একটি প্রশাসনিক ভুল হয়েছে।” ​রাতের আঁধারে গাছ কাটার অভিযোগকে ‘মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচার’ দাবি করে চেয়ারম্যান আরও যোগ করেন, “গাছগুলো কাটার ঘটনাটি ঘটেছে অন্তত ২০-২৫ দিন আগে। সম্প্রতি এলাকায় একটি মারামারির রাজনৈতিক জটলা তৈরি হয়, যেখানে আমাকে জড়িয়ে থানায় মিথ্যা অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। সেই রাজনৈতিক বিরোধ থেকেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার পলাশ মিয়া এই পুরোনো বিষয়টি নতুন করে উস্কে দিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছেন।”​​চেয়ারম্যানের দাবিকৃত ‘মৌখিক অনুমতি’র কোনো আইনি ভিত্তি নেই বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, কোনো পরিষদের বৃক্ষ কর্তন করতে হলে বন বিভাগের মূল্যায়ন, সঠিক প্রক্রিয়ায় টেন্ডার আহ্বান এবং উপজেলা পরিষদ থেকে লিখিত অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।​অষ্টগ্রামের ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল আহাদ সরাসরি চেয়ারম্যানের দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, “সরকারি প্রাঙ্গণ থেকে গাছ কাটার বিষয়ে আমাদের উপজেলা প্রশাসন থেকে কোনো ধরনের অনুমতি প্রদান করা হয়নি। মৌখিক অনুমতির কোনো আইনি সুযোগ নেই। বিধি লঙ্ঘন করে গাছ কাটার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার পর ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল মন্নাফকে বৃহস্পতিবার কারণ দর্শানোর নোটিশ (শোকজ) পাঠানো হয়েছে। নোটিশের জবাব পাওয়ার পর আইনানুযায়ী কঠোর পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।”​​স্থানীয় সাধারণ নাগরিক ও সচেতন মহলের মতে, সরকারি পরিষদের প্রাঙ্গণ থেকে রাতে কিংবা দিনে—যেভাবেই হোক, অনুমোদনহীনভাবে লাখ টাকার গাছ সাবাড় করা চরম প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটের শামিল। তারা অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে কাটা গাছের সঠিক মূল্য নির্ধারণ, করাতকলে থাকা কাঠের সরকারি হিফজ নিশ্চিতকরণ এবং দায়ী ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জোরালো দাবি জানিয়েছেন।​তৃণমূলের ক্ষোভ ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতার এই লড়াইয়ে আদমপুর ইউনিয়ন পরিষদের পরিস্থিতি এখন থমথমে। শোকজের নোটিশে ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল মন্নাফ কী জবাব দেন, আর উপজেলা প্রশাসন জলঘোলা প্রশাসনিক এই জট খুলতে কী আইনি পদক্ষেপ নেয়—এখন সেটাই দেখার বিষয়।

নিয়ম ভেঙে পরিষদের গাছ কাটালেন আওয়ামী লীগ নেতা চেয়ারম্যান