স্বাস্থ্য

কিশোরগঞ্জে ড্যাবের উদ্যোগে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে জনসচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত।

হাসপাতাল নয়, প্রজননস্থল ধ্বংস ও নাগরিক সচেতনতাই মূল চাবিকাঠি।

প্রিন্ট
কিশোরগঞ্জে ড্যাবের উদ্যোগে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে জনসচেতনতামূলক সভা অনুষ্ঠিত।
কিশোরগঞ্জে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে জনসচেতনতামূলক আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখছেন বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো্ঃ শরীফুল আলম।
⌖ কিশোরগঞ্জ সদর
কিশোরগঞ্জে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এক প্রাণবন্ত ও সময়োপযোগী আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ‘ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে করণীয়’ শীর্ষক এই বিশেষ আলোচনা সভায় চিকিৎসাবিদ, জনপ্রতিনিধি ও বিশিষ্টজনেরা একসুরে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে, কেবল চিকিৎসাকেন্দ্র কিংবা স্বাস্থ্য বিভাগের ওপর ভরসা করে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো মারাত্মক মশাবাহিত রোগ প্রতিহত করা সম্ভব নয়; প্রয়োজন সর্বস্তরের সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং প্রজননস্থল ধ্বংসের সমন্বিত প্রয়াস।​শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টায় কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজের কনফারেন্স রুমে এ সভার আয়োজন করে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব), শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল শাখা।​​আলোচনা সভায় চিকিৎসকেরা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন যে, আক্রান্ত হওয়ার পর হাসপাতালে শয্যা খোঁজা বা চিকিৎসার ওপর নির্ভর করার চেয়ে প্রাক-প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। ​সভায় বলা হয়, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার ভয়াবহ বিস্তার রূখে দিতে এডিস মশার বংশবৃদ্ধি প্রতিহত করাই প্রধান চাবিকাঠি। বাসা-বাড়ির ছাদ, বারান্দা, ফুলের টব, পরিত্যক্ত প্লাস্টিক পাত্র, টায়ার ও ডাবের খোসায় যেন কোনোভাবেই তিন দিনের বেশি পানি জমে না থাকে, সে বিষয়ে সর্বস্তরের মানুষকে সচেতন হতে হবে। জমে থাকা পানি অতি দ্রুত অপসারণ করে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ থেকে নিস্তার পাওয়া প্রায় অসম্ভব।​সভায় বক্তারা স্পষ্ট করেন যে, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া কেবল স্বাস্থ্য খাতের একক সমস্যা নয়, এটি একটি সামগ্রিক সামাজিক সংকট। তাই ব্যক্তি ও পারিবারিক সচেতনতার পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, পৌরসভা ও স্থানীয় সরকার কাঠামোর সমন্বিত ও ধারাবাহিক পদক্ষেপ প্রয়োজন।​জনসচেতনতার প্রচার-প্রচারণার পাশাপাশি মশা নিধনে নিয়মিত ওষুধ ছিটানো এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযানকে প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় একযোগে জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন উপস্থিত অতিথিরা।​অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ড্যাব, শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল শাখার প্রবীণ ও সম্মানিত আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মো. মজিবর রহমান।​আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের মাননীয় প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, “স্বাস্থ্যসুরক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। আমাদের সরকার ও প্রশাসন পরিচ্ছন্ন পরিবেশ গঠনে বদ্ধপরিকর, তবে এতে সাধারণ জনগণের প্রত্যক্ষ সামাজিক অংশগ্রহণ ছাড়া শতভাগ সফলতা অর্জন করা সম্ভব নয়।”​বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মাজহারুল ইসলাম এবং কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট মো. জালাল উদ্দিন। জনপ্রতিনিধিদ্বয় নিজ নিজ এলাকায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালনায় সর্বাত্মক সহায়তার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।​এ ছাড়া আলোচনা সভায় বিশেষ বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন ও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর অধ্যাপক ডাঃ মোঃ একরাম আহসান, শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডাঃ মোঃ একরাম আহসান এবং ড্যাব কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার সাবেক সভাপতি ডাঃ মোঃ আতিকুল সারোয়ার।​অনুষ্ঠানে চিকিৎসকদের সংগঠন ড্যাবের কেন্দ্র ও স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দ, মেডিকেল কলেজের শিক্ষক, চিকিৎসক, রেসিডেন্ট সার্জন ও স্বাস্থ্য খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী অংশ নেন।​​আলোচনা সভায় বিষয়ভিত্তিক তথ্যবহুল ও অত্যন্ত আকর্ষণীয় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ আতাউর রহমান। ​তিনি ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক দিক বিস্তারিত তুলে ধরে জানান, এ দুটি মারাত্মক রোগের প্রধান বাহক একই—অর্থাৎ এডিস মশা। তাঁর উপস্থাপিত মূল বিষয়সমূহ তুলে ধরে তিনি বলেন, ডেঙ্গুতে তীব্র জ্বর, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর ও মাংসপেশিতে তীব্র যন্ত্রণা এবং রক্তে প্লাটিলেট কমে যাওয়ার মারাত্মক ঝুঁকি থাকে। অন্যদিকে, চিকুনগুনিয়ায় জ্বরের সাথে সাথে তীব্র জয়েন্টে বা গিটসমূহে হাড় ভাঙার মতো যন্ত্রণা দেখা দেয়, যা রোগীকে দীর্ঘকাল ভোগাতে পারে। তাছাড়া ডাব, ডাবের পানি, খাবার স্যালাইন ও প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। যেকোনো প্রকার তীব্র জ্বর দেখা দিলে নিজে নিজে কোনো অ্যান্টিবায়োটিক বা যথেচ্ছ পেইনকিলার খাওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে এবং অবিলম্বে নিকটস্থ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। এছাড়া ফুলহাতা পোশাক পরিধান করা, দিনে ও রাতে ঘুমানোর সময় আবশ্যিকভাবে মশারি ব্যবহার করা এবং এডিস মশার লার্ভা ধ্বংস করতে বাসাবাড়ির চারপাশে জমা পানি নিষ্কাশন করা।​​সমগ্র আলোচনা সভাটি অত্যন্ত সাবলীল ও দৃষ্টিনন্দনভাবে সঞ্চালনা করেন ড্যাব, শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. মীর নূর উস সাদ।​অনুষ্ঠানের শেষাংশে আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে বলা হয়, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া নিয়ন্ত্রণে শুধু হাসপাতালগুলোর ওপর চাপ বাড়িয়ে বা চিকিৎসাসেবা দিয়ে সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। আমাদের প্রতিটি পরিবার ও ঘরকে সচেতনতার একেকটি দুর্গে পরিণত করতে হবে। সচেতন নাগরিক হিসেবে নিজ নিজ বাসাবাড়ি ও চারপাশের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করাই হোক আজকের দিনের প্রধান অঙ্গীকার। নিবিড় জনসচেতনতা, ব্যক্তিগত দায়িত্ববোধ এবং সবার সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই কিশোরগঞ্জকে মশাবাহিত এই রোগ মুক্ত করা সম্ভব।

সম্পর্কিত সংবাদ